আম আদমির কিস্তি বনাম শিল্পপতির হাজার কোটি টাকা মকুব: সুভাষ চন্দ্রের রায়ে প্রশ্নবিদ্ধ করপোরেট নীতি ক্রেনশক্তিতে উপড়ে গেলো নেহেরু মূর্তি;কংগ্রেস-বিজেপি-তৃণমূলের ত্রিমুখী তরজা ভারতের শেষ গ্রামে দুর্বিষহ জীবন, পদ্মা নদীর ছন্দেই বাঁচে ওরা! নেই হাসপাতাল, স্কুল, রোজগার! ভাতের বদলে কাফন? ১৯৫৯ সালের যে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে কেঁপেছিল রাইটার্স! আহমেদাবাদের স্টাডি সার্কেলে হামলা; নিষিদ্ধ আনা ফ্রাঙ্ক,মালালা ইউসুফজার! কেন বুদ্ধবাবু পারেননি তসলিমাকে নিরাপত্তা দিতে? কেন বিজেপি ফেরাল? কার দখলে বাংলার বিরোধী রাজনীতি? তৃণমূলের শেষে আশার আলো দেখছে CPIM? কার দখলে বাংলার বিরোধী রাজনীতি? তৃণমূলের শেষে আশার আলো দেখছে CPIM? ককরোচদের (CJP) আন্দোলনে জেরবার BJP! কোন পথে ঐতিহাসিক জয় প্রশান্ত কিশোরের?

ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা শুধু একজন মন্ত্রী বিদায় নয়, RSS শিক্ষা-স্বপ্নেও বড় ধাক্কা

৩৭ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

রাজনীতিতে মন্ত্রী আসে, মন্ত্রী যায়। কিন্তু সব মন্ত্রীর বিদায় সমান গুরুত্ব বহন করে না। বিশেষ করে যখন সেই মন্ত্রী এমন একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকেন, যা আগামী প্রজন্মের চিন্তা, ইতিহাসবোধ এবং আদর্শ গঠনের কারখানা। সেই কারণেই ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার গল্প নয়, বরং আরএসএসের বহু দশকের শিক্ষা-রাজনীতির প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর প্রশ্ন।

NEET কেলেঙ্কারি, প্রশ্নফাঁস, NTA-র বিশ্বাসযোগ্যতা, ছাত্রদের ক্ষোভ, নিয়োগে অনিশ্চয়তা। এই সবকিছুই হয়তো ছিল দৃশ্যমান আগুন। কিন্তু সেই আগুনের নিচে আরও বড় এক রাজনৈতিক লড়াই জ্বলছিল, যার কেন্দ্রবিন্দু শিক্ষা। আরএসএস বহু আগেই বুঝেছিল, রাজনৈতিক ক্ষমতা পাঁচ বছরের জন্য হতে পারে, কিন্তু পাঠ্যবইয়ের ক্ষমতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকে। তাই ১৯৬৭ সালে জনসংঘ প্রথমবার সরকারে অংশ নেওয়ার পর থেকেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের কাছে ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলোর একটি। কারণ, যে ইতিহাস পড়ানো হয়, যে মূল্যবোধ শেখানো হয়, যে জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলা হয়, শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রও সেই অনুযায়ী বদলে যায়।

ধর্মেন্দ্র প্রধান

এই কারণেই স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদের শিক্ষা-ভাবনা এবং সংঘ পরিবারের কল্পিত শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে আদর্শগত দূরত্ব বরাবরই স্পষ্ট ছিল।

এই সংঘাত নতুন নয়। ২০০২ সালে মুরলী মনোহর যোশীর পাঠ্যক্রম পরিবর্তনকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত পৌঁছেছিল। সেই সময় যেমন শিক্ষা নিয়ে মতাদর্শের প্রশ্ন উঠেছিল, আজও সেই প্রশ্নই অন্য রূপে ফিরে এসেছে।

ধর্মেন্দ্র প্রধান সেই দীর্ঘ প্রকল্পের অন্যতম মুখ ছিলেন। তিনি শুধু একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন একজন রাজনৈতিক সংগঠক, যার উপর আরএসএস ও বিজেপি আস্থা রেখেছিল নতুন শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য। NEP 2020 থেকে শুরু করে শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রীকরণ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপর বাড়তি নিয়ন্ত্রণ, ভারতীয় জ্ঞানব্যবস্থার উপর জোর, সব ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু এখানেই শুরু হয়েছে সবচেয়ে বড় বিতর্ক।

সমালোচকদের অভিযোগ, নতুন শিক্ষানীতির আড়ালে শিক্ষা ধীরে ধীরে মতাদর্শের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞানমনস্কতার পরিবর্তে প্রতীকী অতীতচর্চা, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতার বদলে রাজনৈতিক প্রভাব, ছাত্র রাজনীতির জায়গায় একমুখী সাংগঠনিক উপস্থিতি, রাজ্যগুলোর উপর কেন্দ্রের চাপ, সব মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার চরিত্র বদলানোর চেষ্টা স্পষ্ট হয়েছে।

একই সময়ে সরকারি শিক্ষা খাতে ব্যয় কমেছে, সংখ্যালঘু ও দলিত শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বৃত্তি সংকুচিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, গবেষণা ও বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগগুলিও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা এবং দীর্ঘদিনের নিয়োগ সংকট।

এই সমালোচনাকে আরও জোরালো করে সরকারি ব্যয়ের পরিসংখ্যান। অর্থনীতি বিশ্লেষক উদিত মিশ্র দেখিয়েছেন, গত এক দশকে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয়ের অগ্রাধিকারের তালিকায় শিক্ষা ক্রমশ নিচের দিকে নেমে গেছে। নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে কেন্দ্রীয় বাজেটে শিক্ষা মন্ত্রকের অংশ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষে যেখানে মোট বাজেটের ৪.৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল, ২০২৫-২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২.৫ শতাংশে। সমালোচকদের মতে, এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারেরই প্রতিফলন। একদিকে নতুন শিক্ষানীতি ও আদর্শগত পরিবর্তনের উপর জোর, অন্যদিকে সরকারি শিক্ষা, গবেষণা, বৃত্তি এবং শিক্ষার অবকাঠামোয় ধারাবাহিক বিনিয়োগ হ্রাস, এই দুইয়ের মধ্যে বৈপরীত্যই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

ফলে ছাত্রদের ক্ষোভ আর কেবল একটি পরীক্ষা বা একটি মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার উপর। এই কারণেই ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিদায়কে শুধুমাত্র প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। যদি তিনি সত্যিই এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান স্থপতি হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর প্রস্থান আরএসএসের জন্য রাজনৈতিক ও আদর্শগত, দুই ক্ষেত্রেই বড় ধাক্কা।

প্রহ্লাদ যোশী

তবে ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিদায়ের পর শিক্ষা মন্ত্রকের দায়িত্ব পেয়েছেন প্রহ্লাদ যোশী, যিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এই মন্ত্রক সামলাবেন। তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু NEET-সহ পরীক্ষাব্যবস্থার প্রতি ছাত্র-অভিভাবকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা নয়, বরং নতুন শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন নিয়ে যে বিতর্ক ও রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তারও মোকাবিলা করা। তিনি কি আগের নীতির ধারাবাহিকতাই বজায় রাখবেন, নাকি শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন বার্তা দেবেন, সেটাই এখন দেশের ছাত্রসমাজ, শিক্ষক মহল এবং শিক্ষাবিদদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

কারণ, নীতি তৈরি করা যত কঠিন, তার চেয়েও কঠিন সেই নীতিকে সমাজে গ্রহণযোগ্য করে তোলা। আর যখন দেশের তরুণ প্রজন্মই সেই নীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে, তখন শুধু একজন মন্ত্রীকে সরিয়ে সংকট থামানো যায় না।

আজকের ভারতীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ হয়তো সংসদে নয়, আদালতেও নয়। সেই যুদ্ধ চলছে শ্রেণিকক্ষে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তরুণদের মননে। শিক্ষা নিয়ে এই সংঘাত তাই কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের নয়, বরং ভারতের ভবিষ্যৎ কোন মূল্যবোধের উপর দাঁড়াবে, সেই লড়াই।

ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিদায় যদি সত্যিই একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়, তবে আগামী অধ্যায়ে প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে উঠবে। ভারতের শিক্ষা কি জ্ঞানচর্চার স্বাধীন ক্ষেত্র হয়ে উঠবে, নাকি মতাদর্শ নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবেই থেকে যাবে? সেই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো আগামী দিনের ভারতীয় রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.