বই হল সময়ের দলিল। যুদ্ধ, আগুন, বন্যা, নিষেধাজ্ঞা কিংবা সময়ের ক্ষয়—সব বাধা পেরিয়েও বই টিকে থাকে। বেঁচে থাকে তার অক্ষর, জ্ঞান তথ্য থেকে সভ্যতা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বই আমাদের কাছে পৌঁছে দেয় বহু আগেই হারিয়ে যাওয়া লেখকদের কণ্ঠস্বর। দেশ ও সময়ের সীমানা পেরিয়ে বই বাঁচিয়ে রাখে নানা ভাষা, সংস্কৃতি। যা চিরতরে হারিয়ে গেছে তাও যত্ন করে তোলা থাকে বইয়ের পাতায়। কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তির বাড়বাড়ন্তে কোপ পড়তে শুরু করেছে সেই বইয়ের উপরেই।
রে ব্র্যাডবেরির Fahrenheit 451 একটি বিখ্যাত ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস। এর মূল বিষয় বই নিষিদ্ধকরণ, সেন্সরশিপ, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীন চিন্তার দমন। গল্পটি এমন এক ভবিষ্যতের সমাজে আবর্তিত, যেখানে বই রাখা বা পড়া অপরাধ। বইটির নামকরণ করা হয়েছে ৪৫১ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা থেকে, যা উপন্যাসে কাগজের আগুন ধরার তাপমাত্রা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৫৩ এর সেই উপন্যাসে লেখা ‘ভবিষ্যৎ’-এ বোধহয় এখন দাঁড়িয়ে রয়েছি আমরাই।

সম্প্রতি AI-প্রযুক্তিকে আরও শক্তিশালী করতে বিপুল পরিমাণ ছাপা বই সংগ্রহ করে সেগুলির মলাট ও বাঁধাই কেটে আলাদা করা হচ্ছে। এরপর প্রতিটি পৃষ্ঠা স্ক্যান করে এআই প্রশিক্ষণে কাজে লাগিয়ে কার্যত ফেলে দেওয়া হচ্ছে বইগুলি। প্রথম এই বিষয়টি প্রকাশ্যে আনে টেক নির্ভর সংবাদমাধ্যম 404 Media। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক এআই সংস্থা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ বই সংগ্রহ করা হচ্ছে।
https://www.instagram.com/p/DbbO5BklV6z
প্রগতি না ধ্বংস?
মানুষের হাতে লেখা বই দিনের পর দিন তথ্য সংগ্রহ করার পর তৈরি হয়। তাতে জড়িয়ে থাকে লেখকের লেখনীর নিজস্বতা। কিন্তু এইভাবে বই স্ক্যানিং এর মাধ্যমে লেখকের নিজস্বতা কার্যত শেষ হয়ে যেতে চলেছে। সমালোচকদের মতে, এআই সংস্থাগুলির এই তৎপরতার অন্যতম কারণ হল, মানুষের লেখা নির্ভরযোগ্য জ্ঞান যত দ্রুত সম্ভব সংরক্ষণ করা। কারণ, ইন্টারনেটে এখন ক্রমশ বাড়ছে এআই-তৈরি নিম্নমানের লেখার স্রোত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও বেশি নির্ভরযোগ্য করতেই এই পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে। এই পদ্ধতির সঙ্গে মিল রয়েছে এআই সংস্থা Anthropic-এর বহুল আলোচিত ‘Project Panama’-র, যেখানে লক্ষ লক্ষ বই কেটে স্ক্যান করে ডিজিটাল রূপ দেওয়া হয়েছিল।
404 Media-কে একজন বই বিক্রেতা জানান। আগের থেকে বই বিক্রির সংখ্যা বেড়েছে তাঁদের। সাময়িকভাবে এই ব্যবসা তাঁদের কাছে লাভজনক মনে হলেও দুষ্প্রাপ্য ও মুদ্রণবিহীন বহু বই চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। লেখকদের জন্যও এই ঘটনা উদ্বেগের কেননা তাঁদের অজান্তেই লেখা ‘চুরি’ হয়ে যাচ্ছে। এইভাবে চলতে থাকলে লেখকদের অমূল্য নির্ভরযোগ্য বই বাজার থেকে ক্রমেই গায়েব হয়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সেই দেশের শিক্ষা সংস্কৃতিতে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর বিশ্বে ক্রমেই হারিয়ে যেতে থাকবে ভাষা, সংস্কৃতি এবং লেখকের নিজস্ব শৈলী।

