গরম পড়লেই বিক্রি বাড়ে ঠান্ডা পানীয়র। বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ক্যাফেতে ফ্রিজে সারি সারি সাজানো থাকে রংবেরঙের কোকা-কোলা, পেপসি, স্প্রাইট, থামস আপের মতো কার্বনেটেড সফট ড্রিঙ্ক। কিন্তু স্বাস্থ্যের পক্ষে সেগুলি যে কতটা হানিকারক তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বোতলবন্দি এই সমস্ত পানীয়র সঙ্গে কখনই পেরে ওঠেন না আখের রস, বেলের শরবত, আমপান্নার মতো ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় পানীয় বিক্রেতারা।
তবে বিদেশি পানীয়র এই একচেটিয়া বাজরেই জোরদার ধাক্কা দিয়েছে দেশের স্বাদ দেশের পানীয়। রাস্তার ধারের পরিচিত দেশি পানীয়কে আধুনিক বোতলে ভরে বাজারে এনে বিদেশি কোল্ড ড্রিংকের রমরমাকে টেক্কা দিচ্ছে লাহোরি জিরা (Lahori Zeera)। গরমের দিনে তৃষ্ণা মেটাতে এই দেশে শরবতের চল বহুদিনের। শিকাঞ্জি, লেবু, মিছরি, তেঁতুল , আমপান্নার মতো রকমারি সব সরবতের রেসিপি আছে মা-ঠাকুরমাদের। এই যত্নের কথাই মাথায় রেখে সৌরভ মুঞ্জাল, সৌরভ ভুটনা এবং নিখিল দোদা- তিন ভাই মিলে বানিয়ে ফেলেছেন লাহোরি জিরা। পাঞ্জাবে বেড়ে ওঠা এই তিন ভাইয়ের মনে হয়েছিল কালো নুন, জিরা ও লেবুর স্বাদের সোডার বিকল্প আর কোনও পানীয় হতে পারে না। সেই স্বাদকে আধুনিক, স্বাস্থ্যসম্মত বোতলে বন্দি করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন তাঁরা।

২০১৬ সালে নিখিল দোদা কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই কালো নুন, জিরা গুঁড়ো ও লেবুর রস মিশিয়ে প্রথম পরীক্ষামূলক পানীয় তৈরি করেন এবং তিন জনেই সেই স্বাদ পেয়ে ছেলেবেলায় ফিরে যান। এরপর নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে, সাধারণ মানুষকে দিয়ে সেই পানীয় টেস্ট করিয়ে দেশীয় সেই স্বাদকে বোতল বন্দি করা হয়। মশলার স্বাদ, টক ঝাঁঝ আর হালকা ফিজ—সবকিছুর নিখুঁত ভারসাম্যই এই পানীয়র মূল এক্স ফ্যাক্টর। প্রথমদিকে ১৬০ মিলিলিটারের একটি বোতলের দাম রাখা হয় মাত্র ১০ টাকা, যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই থাকে এই পানীয়।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, ভারতীয় ব্র্যান্ডের নাম ‘লাহোরি’ কেন? দেশভাগের আগে লাহোর এবং ভারতের পাঞ্জাব একই সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত ঐতিহ্যের অংশ ছিল। সেই যৌথ স্মৃতিকেই তুলে ধরতে “লাহোরি” নামটি বেছে নেওয়া হয়। আর “জিরা” নামটি ভারতীয় রান্নাঘরের উল্লেখযোগ্য উপাদান।

ধীরে ধীরে এই স্ট্রাট আপ পৌঁছে যেতে শুরু করে সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বর্তমানে লাহোরি জিরার জনপ্রিয় পানীয়গুলির মধ্যে রয়েছে Lahori Zeera, Lahori Shikanji, Lahori Nimboo, Lahori Kacha Aam, Lahori Gimboo এবং Lahori Imli Banta। Entrackr-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে সংস্থার আয় ছিল ৩১২ কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪০ কোটি টাকা। The CapTable-এর তথ্য অনুযায়ী, লাহোরি জিরা প্রস্তুতকারী সংস্থা আর্চিয়ান ফুডস ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে প্রায় ৭৭৫ কোটি টাকার ব্যবসা করেছে।
অথচ দেশের নামি নামি সেলেবরা এই পানীয়র বিজ্ঞাপন করেন না। এই পানীয়র একমাত্র লক্ষ্য উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি, খুচরো বাজারে উপস্থিতি এবং ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ। মাত্র ২০ জনের একটি দল এই মুহূর্তে ১৮০০ জনের একটি কোম্পানি। আর এই ঘটনাই আবার প্রমাণ করে ভারতীয়রা ব্যবসা করতে জানে, আর দেশের স্বাদ দেশের শিল্প মজবুত হলে তা টেক্কা দিতে পারে বিদেশের নামি দামি কোম্পানিকেও।

