“Without journalists, there is no journalism. Without journalism, there is no democracy.” — Christiane Amanpour
গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় মিডিয়াকে। সেই সংবাদ যা হবে তথ্য নির্ভর, নিরপেক্ষ, নির্ভুল, প্রমাণিত। সোমবার ধর্মতলার বুকে মিছিল করলেন বাংলার একাংশের সাংবাদিকরা। গত ২৪ জুলাই ধর্মতলায় ককরোচদের মিছিলে আক্রান্ত হন বেশ কিছুজন সাংবাদিক। যাঁদের ঘিরে ধরে ‘গদি মিডিয়া’ স্লোগান তোলা হয়, কারও ক্যামেরা ভাঙা হয় তো কারও ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। খবর করতে গিয়ে রক্তও ঝরে বেশ কিছু সাংবাদিকের। আর এর বিরুদ্ধেই পথে নেমেছিলেন বাংলার মেইনস্ট্রিম মিডিয়া সহ প্রিন্ট এবং ডিজিটাল মিডিয়ার একাংশের সাংবাদিকরা। তাঁদের দাবি গণতান্ত্রিক দেশে যেকোনও আক্রমণই নিন্দনীয়।
যদিও এই হেনস্থার পরেই টিভি নাইনের সাংবাদিক সুমন মহাপাত্র জানান, যারা আক্রমণ করেছে তারা মিছিলের কেউ নন। বাইরের দুষ্কৃতীরা এই আক্রমণ করেছে। একই কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। তিনি জানান, যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তাঁদের সঙ্গে ছাত্রদের কোনও সম্পর্ক নেই। সেই মতো অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে ইতিমধ্যেই জেলবন্দিও করা হয়েছে। তবে সেই নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে, ককরোচ জনতা পার্টি। তাঁদের অভিযোগ এক বিশেষ ধর্মের মানুষকে টার্গেট করে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সাথীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।

শুধু বাংলা নয়, দিল্লিতেও নিট আন্দোলন চলার সময় সাংবাদিকদের দেখে স্লোগান তোলা হয়। তবে না তাঁদের গায়ে কোনও হাত পড়েছে, না ব্যবহার করা হয়েছে কোনও কুশব্দ। বুম এবং ক্যামেরা ছেড়ে সেই সাংবাদিকই পরে ছাত্রদের পক্ষ নিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হল, কেন এই ঘটনা বারংবার ঘটছে আমাদের দেশে? সাংবাদিকদের সঙ্গে এই ‘গদি মিডিয়া’ শব্দবন্ধ জুড়ে জনরোষ তৈরির কারণ ঠিক কী?
রোদে জলে ভিজে যাঁরা প্রতিনিয়ত মাঠ-ঘাট থেকে খবর সংগ্রহ করেন তা পৌঁছে যায় বিভিন্ন প্রাইভেট লিমিটেডে। নীতি নির্ধারণ করে সেই খবরের ঠিক হয় অ্যাঙ্গেল, হেডলাইন, থাম্বনেল থেকে ক্যাপশন। অস্বীকার করার জায়গা নেই অনেক ক্ষেত্রেই তা পক্ষপাতদুষ্ট। প্রথম সারির বলে দাবি করা একাধিক সাংবাদিক কখনও কখনও এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেন যা প্রবলভাবে উস্কানিমূলকও। কিন্তু তাঁরা মাঠে ঘাটে থাকেন না। আর সেই রোষই কখনও সখনও এসে পড়ে রিপোর্টারদের উপর। তাঁদের হেনস্থার ছবি দেখিয়ে ফের প্রাইম টাইম সরগরম হলেও, ফাঁক থেকে যায় সংবাদমাধ্যমগুলির আত্মবিশ্লেষণের জায়গায়।
সাংবাদিকদের ওপর বাড়তে থাকা হামলা, সংবাদমাধ্যমের মালিকানার ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীকরণ এবং বহু সংবাদমাধ্যমের প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান—এই সব মিলিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা গভীর সংকটে পড়েছে। বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচক (World Press Freedom Index)- ২০২৬ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতের অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫৭তম। ২০২৫ সালে ভারতের অবস্থান ছিল ১৫১তম, অর্থাৎ এক বছরে আরও ৬ ধাপ পিছিয়েছে ভারতের গণ-মাধ্যম।
আজ এই মিছিলের উদ্দেশ্যে কোনও গলদ নেই। সংবাদকর্মীরা একে অপরের পরিবার বলে হাতে হাত ধরে মানববন্ধন করেছেন। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমে নিত্য ছাঁটাই, সিনিয়রদের জুনিয়রদের প্রতি অশালীন শব্দ প্রয়োগ, নিরপেক্ষতার প্রশ্নে এরাই একজোট হলে আশা করা যায় World Press Freedom Index-এ পরবর্তীতে ‘ভারত আবার জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে’।
বেঁচে থাকলে এই মিছিলের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিতভাবে সাহস পেতেন গৌরি লঙ্কেশ, নবীন নিশ্চল, মুকেশ চন্দ্রকারের মতো সাংবাদিকরা। যাঁদের প্রাণ গিয়েছিল রহস্যজনক ভাবে, খবর করার জন্যই।
এই মিছিল কি কোথাও তাঁরাও ছিলেন?
৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে বেঙ্গালুরুর রাজরাজেশ্বরী নগরে নিজের বাড়ির সামনে অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন গৌরী লঙ্কেশ। বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT)-এর চার্জশিটে অভিযোগ করা হয়, গৌরি লঙ্কেশকে তাঁর কথিত “হিন্দুবিরোধী” বা “অ্যান্টি-হিন্দু” মতাদর্শের কারণেই টার্গেট করা হয়েছিল।

মুকেশ চন্দ্রকার ছিলেন ছত্তীসগঢ়ের একজন স্বাধীন সাংবাদিক। তিনি মূলত বিজাপুর জেলার গ্রামীণ এলাকা, মাওবাদী সংঘাত, দুর্নীতি এবং সরকারি প্রকল্প নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতেন। ৩রা জানুয়ারি, ২০২৫ তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, একটি রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি নিয়ে তাঁর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের জেরেই তাঁকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ। তদন্তে দাবি করা হয়, ওই প্রতিবেদনের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত এক ঠিকাদার ও তার সহযোগীরা এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করে। এই মামলায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে ঠিকাদার সুরেশ চন্দ্রকার-সহ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়।

বিহারের সাংবাদিক নবীন নিশ্চল। বাইকে সহকর্মীর সঙ্গে যাচ্ছিলেন। অভিযোগ, একটি এসইউভি গাড়ি ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের ধাক্কা দেয়, ফলে দু’জনেরই মৃত্যু হয়। স্থানীয় এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। সাংবাদিক মহলের দাবি ছিল, তাঁদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জেরেই এই হামলা হয়।

উত্তরপ্রদেশের স্থানীয় হিন্দি দৈনিক কাম্পু মেইল (Kampu Mail)-এর সাংবাদিক শুভম মণি ত্রিপাঠী। ২০২০ সালে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে উন্নাওয়ে দু’জন বন্দুকধারী তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও তিনি মারা যান। পুলিশের তদন্তে অভিযোগ করা হয়, শুভম মণি ত্রিপাঠী অবৈধ জমি দখল, বালু মাফিয়া, অবৈধ নির্মাণ এবং স্থানীয় ভূমি মাফিয়াদের কার্যকলাপ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর প্রতিবেদনের জেরে একটি অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এরপরই তিনি প্রাণনাশের হুমকি পাচ্ছিলেন বলে অভিযোগ।

ধর্মেন্দ্র সিং চৌহান ছিলেন হরিয়ানার ঝাঝর জেলার লুহারি গ্রামের একজন সাংবাদিক। তিনি অনলাইন সংবাদমাধ্যম Fast News India-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাতের খাবার খাওয়ার পর বাড়ির কাছেই হাঁটতে বের হলে অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারীরা তাঁর মাথায় গুলি করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

সুজাত বুখারি কাশ্মীরের রাজনীতি, মানবাধিকার, সংঘাত এবং শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে লেখালেখি করতেন। তিনি ভারত-পাকিস্তান ও কাশ্মীরে শান্তির পক্ষে সরব ছিলেন। জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ তদন্তে দাবি করে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে লস্কর-ই-তইবা (LeT)-এর জঙ্গিরা জড়িত ছিল এবং এটি সীমান্তের ওপার থেকে পরিচালিত একটি ষড়যন্ত্রের অংশ। তদন্তে একাধিক সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করা হয়।

এছাড়াও দীপক ভট্টাচার্য , সুরজিৎ ঘোষালের মতো সাংবাদিক এই রাজ্যে বাম জমানায় প্রাণ হারান। সুলভ শ্রীবাস্তব, অবিনাশ ঝা, রামণ কাশ্যপের মতো সাংবাদিকদের মৃত্যুরও কিনারা হয়নি।

তাই দীর্ঘ এই তালিকা শেষ হওয়ার নয়। সংবাদকর্মীদের উপর শুধু আঘাত নয়, তাঁদের মৃত্যু অবধি হয়েছে সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে। যদিও তাঁদের নিয়ে চর্চা হয় না সচরাচর। তবু এই মিছিলেরই অংশ হিসেবে গৌরী লঙ্কেশ এবং সুজাত বুখারির একটি পোস্টার জ্বলজ্বল করে উঠল প্রেস ক্লাবের সামনে, সেই পোস্টারকে সামনে আনলেন ‘গদি মিডিয়া’ বলে দাগিয়ে দেওয়া ব্যক্তিক্রমী দুই একজন সাংবাদিকই। আশা জাগল নিশ্চিত ভাবে ছাঁটাই, নিগ্রহ, হলুদ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে এঁরা আগামীতে বেঁধে বেঁধেই থাকবেন।

