সল্টলেক সেক্টর ফাইভ, কর্পোরেট মজদুরদের অফিস পাড়া। রোজ এখানে রাজ্যের কত শত জেলা থেকে আসা ছেলেমেয়েরা মিলে যায় রকমারি উঁচু উঁচু অফিসে। টান টান ইস্ত্রী করা জামা আর প্যান্ট গুঁজে ছড়িয়ে যায় রকমারি ‘প্রাইভেট লিমিটেডে’। সকলের কাজ, কোম্পানি, কাজের চাপ আলাদা। চিংড়িহাটার লম্বা জ্যাম ঠেলে রোজ তারা রুটিন করে অফিস আসে আবার ফিরে যায় সময় হলে। আর ওই কাঁচের ঘরে দমবন্ধ লাগলেই দল বেঁধে ওরা নেমে আসতো অফিসের নিচের ছোট ছোট ঝুপড়ি দোকানগুলোতে। ছোট্ট একটা সিগারেট ব্রেকে চা খেতে খেতেই আলোচনা হয়ে যেত দেশ দুনিয়ার।
অফিস পাড়া গমগম করতো হরেক কিসিমের খাওয়ারের স্টল, চায়ের দোকান, ভাতের হোটেল, লস্যির দোকানে। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে গোটা সেক্টর ফাইভের প্রাণ হয়ে উঠেছিল ওই ‘ঝুপস’গুলো।

রাজ্যে পালা বদলের পর, সরকারি জায়গায় অস্থায়ী ভাবে ব্যবসা ফেঁদে বসার রাস্তায় রাশ টানা হয়েছে। উচ্ছেদ অভিযান চলছে স্টেশনে স্টেশনে। খালি করা হচ্ছে ফুটপাথ। কেউ নোটিস পাচ্ছেন কেউ বা পাচ্ছেনও না। নির্দেশ একটাই উঠে যেতে হবে, অন্যথায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে বুলডোজারে। এর আগেও প্রায় সব সরকারই হকারদের উপর কড়াকড়ি এনেছে। কিন্তু বিজেপি সরকার প্রথম থেকেই বেআইনি নির্মাণ এবং ফুটপাথ দখল করে ব্যবসার বিপক্ষে।

দমদম, শিয়ালদা, নৈহাটি স্টেশনের অস্থায়ী দোকানগুলোর মতোই সেক্টর ফাইভের চেনা ঝুপসের আলোও একেবারে নিভে গিয়েছে। রোববার থেকেই শুরু হয়েছে ফুটপাথ থেকে দোকান সরানোর কাজ। চেনা চায়ের ঠেক, বেঞ্চ খাঁখাঁ করছে ভরা উইক ডেজ’এর বাজারে। ভাতের দোকান থেকে হাঁক আসছে না মাংস ভাত, ভেজ ভাত, মাছ ভাতের। নেই জোট বেঁধে জ্যুস খেতে যাওয়ার দোকানটাও।
একটি ভিডিও ঘুরছে সোশ্যাল মিডিয়াতেই। এক ফুটপাথ দোকানি বলছেন, “এখানে তো এতগুলো দোকান চলত। কেন চলত? কাস্টমার হতো, তাই? সেই কাস্টমারগুলোর কী হবে বলুন তো? আমাদের তো যা গেল, গেল। আমাদের না হয় আরেকটু মারবে। তাতে আর কী হবে? আমরা আধমরা হয়েই ফুটপাথে ব্যবসা করতাম। কিন্তু যারা এখানে খেত, তারা কোথায় যাবে? এখানে আপনারা দেখছেন, এত হাইরাইজ বিল্ডিং, এত ট্যাক্স, এত আগডুম বাগডুম অফিস, কিন্তু ক’টা মানুষের স্যালারি ভালো বলুন তো? ওপরের জামা-কাপড়টাই চিকন-চাকন, কিন্তু কত মাইনে পান? তাঁদের তো দামি রেস্তোরাঁতে গিয়ে বা আনিয়ে খাওয়ার সামর্থ্য নেই। তাঁদের আমরা বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। তাঁদের কী হবে? আমাদের তাঁরা বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, তাঁদের আমরা বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। সবই গেল!”

সত্যিই নিভে গেল প্রায় ১২০০ দোকানের আলো। কর্পোরেটের টানটান জামা পরা এই হাজার হাজার ছেলে মেয়েদের ভাত দিত ওই ঝুপড়ির দোকানিরাই। তারা জানতেন কে কোন মাছের পিসটা ভাল খায়, কার কবার ভাত লাগে, কে ডাল খায় কে চিকেন। বাকি থাকলে বলে উঠতেন, ‘কাল দিও’। কিন্তু আর সেই বাকির শোধ করার উপায় আর রইল না।

থমথমে অফিস পাড়ায় নিয়ম জারি, আগুন জ্বালানো যাবে না। অর্থাৎ কিছু বানিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। ছাতা নিয়ে জিনিস বসা যেতে পারে। অস্থায়ী নির্মাণ সরিয়ে ফেলতে হবে। এনডিআইটি সূত্রে জানা গিয়েছে, কাউকে উচ্ছেদ করা হয়নি। আইন মোতাবেক কিছু গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে। কলেজ মোড়, গোদরেজ ওয়াটার সাইড, টেকনো ইন্ডিয়া মোড় থেকে স্বাস্থ্যভবনের রাস্তায় কিছু ছাতা চোখে পড়লেও হাসি নেই দোকানিদের মুখে।

