Mein Vaapas Aaunga: ইমতিয়াজ পারলেন, বিবেক হারলেন! “ওরা ভেবেছিল গান্ধীকে মারলেই ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হবে”, মোলাকাতের প্রথম পর্বে মুখোমুখি গান্ধীবাদী শিক্ষাবিদ মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায় One Nation, One Law: এক দেশ, এক আইন প্রজেক্টের নাম “হিন্দি হিন্দু- হিন্দুস্তান” অশান্ত মণিপুরের নেপথ্যে অবৈধ মাদক কারবার? প্রশাসনের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা ‘বাঙালির সন্তান থাকবে রাজমা চাওলে’, নিরামিষ বাংলা গড়ার প্রথম পদক্ষেপ? Gym Jihad: বাজারে নতুন ট্রেন্ড ‘জিম জিহাদ’, ফের ‘খাত্রে মে’ হিন্দুরা? রাজনৈতিক হিংসার দুই অধ্যায় বাজেটে পার্শ্বশিক্ষকদের নামমাত্র বেতন বৃদ্ধি, যোগ্যতার অমর্যাদা ও আর্থিক বঞ্চনার চালচিত্র!

সরকারি জমি দখলমুক্ত বনাম সাধারণের অন্নসংস্থান: কোন পথে সমাধান?

৩ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

রেলস্টেশন চত্বর কিংবা তৎসংলগ্ন এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দোকানপাটগুলোর ওপর বুলডোজার চলছে। রাজ্যের নানা প্রান্তে এমন অভিযান হয়েছে, এখনও হচ্ছে। এক পক্ষ বলছে, আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলেছে। অন্য পক্ষের প্রশ্ন, যাঁদের জীবিকা মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেল, তাঁদের ভবিষ্যতের দায় কে নেবে? বিষয়টিকে আবেগ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানের চশমা দিয়ে দেখলে হয়তো সহজ উত্তর পাওয়া যায়, কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। কারণ এখানে একদিকে রয়েছে আইনের শাসন, অন্যদিকে মানুষের অন্নসংস্থানের প্রশ্ন। দুটিকেই অস্বীকার করা যায় না।

প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন। সরকারি বা রেলওয়ের জমি দখল করে গড়ে ওঠা কোনো নির্মাণকে বৈধ বলা যায় না। রাষ্ট্রের সম্পত্তি রাষ্ট্রেরই, এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে অবৈধ দখলমুক্তকরণ জরুরি। যে নির্মাণ নিয়মের বাইরে, তার বিরুদ্ধে একদিন না একদিন ব্যবস্থা নেওয়া হবেই— এটাই স্বাভাবিক। সেই অর্থে উচ্ছেদ অভিযানকে অপ্রত্যাশিত বা অন্যায় বলা কঠিন। আইন যদি সত্যিই সবার জন্য সমান হয়, তবে অবৈধতার বিরুদ্ধে তার অবস্থানও সমান। কিন্তু মানুষের জীবন কেবল আইনের ধারায় প্রবাহিত হয় না। সেখানে জড়িয়ে থাকে অভাব, প্রয়োজন, সংগ্রাম এবং বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াই। যে দোকানটি আজ বুলডোজারের আঘাতে ভেঙে পড়ল, সেটি হয়তো কোনো পরিবারের কাছে ছিল একমাত্র আয়ের উৎস। হয়তো সেই দোকানের দৈনিক আয়েই চলত সংসারের চুলো, সন্তানের পড়াশোনা, বৃদ্ধ পিতা-মাতার চিকিৎসা কিংবা জীবনের ন্যূনতম চাহিদাগুলি। তাই একটি দোকান ভাঙার ঘটনাকে কেবল একটি অবৈধ কাঠামোর অপসারণ বলে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। এই ঘটনার আরেকটি দিকও আমাদের ভাবায়। বছরের পর বছর ধরে যখন এসব দোকান গড়ে উঠছিল, ব্যবসা চলছিল, তখন প্রশাসনের চোখ কোথায় ছিল? যদি নির্মাণ সত্যিই বেআইনি হয়ে থাকে, তবে তার সূচনাতেই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি কেন? দীর্ঘদিন ধরে নীরব থাকা প্রশাসন হঠাৎ একদিন কঠোরতার মুখ দেখালে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে। আইন যদি প্রয়োজনীয় হয়, তবে তার প্রয়োগও হওয়া উচিত ধারাবাহিক, সময়োপযোগী এবং স্বচ্ছ।

এই প্রেক্ষাপটে কলকাতা হাইকোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আদালত উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে আইনি বিধান ও স্বাভাবিক বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে এবং আপাতত উচ্ছেদ অভিযানের ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করেছে। আদালত প্রশাসনের কাছে জানতে চেয়েছে, যথাযথ নোটিশ, শুনানির সুযোগ এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না। হাইকোর্টের এই অবস্থান অবৈধ দখলদারিকে সমর্থন করে না। বরং নিশ্চিত করতে চায় যে আইন প্রয়োগের নামে যেন নাগরিক অধিকারের মৌলিক নীতিগুলো উপেক্ষিত না হয়। আসলে আদালতের এই পর্যবেক্ষণ আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়। আইন কেবল উচ্ছেদের ক্ষমতা নয়, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তাও। রাষ্ট্রের শক্তি কেবল বুলডোজারের গর্জনে নয়, বিচার ও মানবিকতার সমন্বয়েও প্রকাশ পায়। আদালত যেন পরোক্ষে মনে করিয়ে দিয়েছে আইন প্রয়োগের আগে প্রক্রিয়াগত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অবৈধ দখলদারির পক্ষে কোনো যুক্তি দাঁড় করানো যায় না। আইনকে উপেক্ষা করে গড়ে ওঠা যেকোনো স্থাপনার ভবিষ্যৎ একদিন অনিশ্চিত হয়ে পড়বেই। কিন্তু একই সঙ্গে একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয় কেবল তার উচ্ছেদ অভিযানে নয়, তার পুনর্বাসন নীতিতেও নিহিত থাকে। রাষ্ট্র যদি মানুষের কাছ থেকে আইন মানার প্রত্যাশা করে, তবে সংকটের মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নৈতিক দায়ও রাষ্ট্রেরই।

আজ যাঁদের দোকান ভেঙে গেছে, তাঁদের মধ্যে অনেকেই হয়তো আইন ভাঙার উদ্দেশ্যে সেখানে বসেননি। জীবিকার তাগিদে, অভাবের চাপে, সুযোগের অভাবে তাঁরা সেই পথ বেছে নিয়েছিলেন। আইন তাঁদের ভুল বলতে পারে, কিন্তু সেই ভুলের পেছনের সামাজিক বাস্তবতাকেও অস্বীকার করা যায় না। কারণ ক্ষুধা ও বেকারত্বের অভিঘাত অনেক সময় মানুষকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, যা নিয়মের বইয়ে গ্রহণযোগ্য নয়। সভ্যতার অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন উন্নয়নের সঙ্গে মানবিকতারও সহাবস্থান ঘটে। একটি অবৈধ স্থাপনা ভেঙে ফেলা প্রশাসনিক সাফল্য হতে পারে, কিন্তু সেই উচ্ছেদের পরে যদি কয়েকশো পরিবার অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ডুবে যায়, তবে সেই সাফল্যের হিসাব সম্পূর্ণ হয় না। উন্নয়নের প্রকৃত মানে কেবল জমি উদ্ধার নয়, উন্নয়নের মানে মানুষের জীবনকেও নিরাপদ পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

তবে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়— এবার তারা কোথায় যাবে? কীভাবে চলবে তাদের সংসার? আগামী মাসে সন্তানের স্কুলের ফি কে দেবে? বৃদ্ধ বাবার ওষুধ কীভাবে কেনা হবে?

আইন এসব প্রশ্নের উত্তর দেয় না। আবার আবেগও আইনের বিকল্প হতে পারে না। তাই প্রয়োজন এমন এক ভারসাম্যের, যেখানে রাষ্ট্রের কঠোরতা থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে সহমর্মিতার স্পর্শও। কারণ রাষ্ট্রের শক্তি কেবল উচ্ছেদে নয়, মানুষের ভেঙে পড়া জীবনের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই প্রকৃত অর্থে প্রকাশ পায়। আইনের শাসন যে কোনো সভ্য রাষ্ট্রের ভিত্তি। অবৈধ দখলদারি বা বেআইনি নির্মাণকে বৈধতার স্বীকৃতি দেওয়া যায় না। তাই উচ্ছেদ অভিযানের সাফল্য কেবল জমি উদ্ধারেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, তার মানবিক পরিণতিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়া উচিত। আইন তার নিজস্ব পথে চলুক— এটাই কাম্য। কিন্তু সেই পথ যেন মানবিকতাকে পদদলিত না করে। রাষ্ট্র যদি অবৈধ দখলমুক্তির অধিকার রাখে, তবে জীবিকা হারানো মানুষদের পুনর্বাসনের নৈতিক দায়িত্বও রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। কারণ একটি মানবিক গণতন্ত্রের পরিচয় তার কঠোরতায় নয়, বরং কঠোরতার মধ্যেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতায়। রাষ্ট্রের হাতে বুলডোজার থাকুক, কিন্তু তার অন্য হাতে থাকুক পুনর্বাসনের আশ্বাস। তবেই আইনের জয় হবে, মানুষের পরাজয় নয়। তবেই আদালতের ন্যায়বিচার, প্রশাসনের কর্তব্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তবতা এই তিনের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন গড়ে উঠবে। আইনের জয় তখনই অর্থবহ, যখন তার ছায়াতলে মানুষও বাঁচার অধিকার খুঁজে পায়।

অন্যান্য প্রতিবেদন.