সম্প্রতি একটি সিনেমা ঝড় তুলেছিল। ছবির নাম ‘Assi’। সেখানে ২০ মিনিট অন্তর অন্তর একটি রিমাইন্ডার আসছিল। কেন? কারণ পরিসংখ্যান বলছে আমাদের দেশে প্রতি ২০ মিনিট অন্তর একটি করে ধর্ষণের রিপোর্ট নথিভুক্ত হয়। আইনের আওতায় এলে তার বিচারের দাবি তবুও করা যায়, কিন্তু এই পোড়া দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এফ.আই.আর-টুকুও নেওয়া হয় না। নির্যাতিতার যেমন কোনও জাত ধর্ম হতে পারে না, অপরাধীরও হতে পারে না৷ এক্ষেত্রে একমাত্র হতে পারে কঠোরতম দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
সময়ের স্রোতে সরকার বদলেছে একাধিকবার। বদলায়নি কেবল ধর্ষকামী মানসিকতার। লিখিত অভিযোগের সঙ্গে ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অনুপাত লজ্জাজনকই হবে। ছোট আঙারিয়া থেকে কামদুনি, আরজিকর থেকে বারুইপুর, পার্ক-স্ট্রিট থেকে বেহালা, মালদা থেকে অশোকনগর, হাথরাস থেকে রাজস্থান- রোজ প্রতিনিয়ত দেশের কোণায় কোণায় মেয়েদের সঙ্গে এই ঘটনা ঘটছে। বীভৎসতার ধরণ আলাদা হলেও অপরাধের মানসিকতা সেই একই। অন্যদিকে কোথাও নিখোঁজ হওয়ার ডায়েরি পেয়েও পুলিশ গা-ছাড়া, কোথাও বা নির্যাতিতার দেহ পুলিশের সহায়তাতেই পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা, প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা। সরকার আসে সরকার যায় ফাঁক-ফোকর থেকেই যায় পুলিশের কর্তব্যে।
রাজ্যে পালাবদলের পর ক্ষমতায় বিজেপি। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই বেহালা, বারুইপুরের মত ধর্ষণের ঘটনা। তৃণমূল আমলেও একই অবস্থা ছিল। বামেদের আমলেও বানতলার মতো ঘটনার সাক্ষী থেকেছে বাংলা। এনসিআরবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১০ সালে পশ্চিমবঙ্গে নথিভুক্ত ধর্ষণের সংখ্যা ২৩১১। তৃণমূল জমানা, অর্থাৎ ২০১২ সালে সেই সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়ায় ২০৪৬-এ। এনসিআরবির দেওয়ার তথ্য বলছে, ভারতবর্ষে প্রতিদিন ৮৬ থেকে ৮৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।
সেই ১৯৯২ সালের আজমীর সিরিয়াল রেপ কেস থেকে ২০১২ এর নির্ভয়া কাণ্ড, ২০১৩ এর শক্তিমিল গণধর্ষণ। সেই সময় কেন্দ্রে ক্ষমতায় কংগ্রেস। এরপর বিজেপির আমলের উন্নাও, হাথরাস কিংবা ব্রিজভূষণ কেস- টার্গেট সেই মেয়েরাই। দেহ নিয়ে রাজনীতি, ধর্ষিতার ধর্ম নিয়ে ছানবিন কিছুই বাদ যায় না। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর মোমবাতি মিছিল হয়। কিন্তু ঘটনা ঘটে যাওয়া আটকানো যায় না।

সমস্যা সমাজের অন্দরে। নারী স্বাধীনতার ধ্বজা উড়লেও এখনও অবধি একজন মেয়েকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকই মনে করে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। শারিরীক বলের নিরিখে একজন মেয়ের পক্ষে সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না অপরাধ প্রতিহত করা। পার্কস্ট্রিট ধর্ষণের পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ছোটো ঘটনা। আরজিকরের ক্ষেত্রে পরিবারকে সরাসরি টাকা অফার করেছিলেন তিনি৷ বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, সকালে জমা, বিকেলে খরচের কথা। তিনি চেয়ারে বসার পর প্রায় ৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে গিয়েছে। বিচারের দিকে তাকিয়ে মানুষ।
অর্থাৎ কোনও রাজনৈতিক দলের সরকারই পারেনি দেশের ১০০ ভাগ নারীর নিরাপত্তা দিতে। ধর্ষকদের শেখাতে পারেনি ‘কনসেন্টের’ মানে৷ শুধু ছুঁলেই ধর্ষণ হয় তা তো নয়। এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে, মেয়েদের ‘রেপ থ্রেট’ দেওয়া জলভাত হয়ে উঠেছে। রাগের বহিঃপ্রকাশ হয়ে উঠেছে। তাই গোড়া থেকে এই ধর্ষকামী মানসিকতার নির্মূল না হলে অপরাধ চলতেই থাকবে। মোমবাতির বিক্রি বাড়বে, ‘বিচার চাই’ স্লোগানও উঠবে, শুধু আরও একবার পৈশাচিক ঘটনা ঘটানোর আগে বুক কাঁপবে না ধর্ষকদের। নারীরা সুরক্ষা চাইছে তো সেই জন্মলগ্ন থেকেই, পাবে কবে?

