এনকাউন্টারকে কাউন্টার প্রহ্লাদ দাসের মা এর, কোথায় দাঁড়িয়ে বঙ্গ কানুন?

১৪ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরপর ঘটে যাওয়া এনকাউন্টার বা পুলিশের গুলিতে অভিযুক্তের মৃত্যুর ঘটনা রাজ্য রাজনীতিতে এক তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে প্রল্লাদ দাসের এনকাউন্টারকে কেন্দ্র করে শাসক-বিরোধী তরজা, মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের কবিতা লেখা এবং মুখ্যমন্ত্রীর ‘জমা খরচের হিসাব’ সংক্রান্ত মন্তব্য এই বিতর্ককে এক নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। একটি সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অপরাধ দমনের নামে এই বিচারবহির্ভূত পদক্ষেপ বা এনকাউন্টার সংস্কৃতি কি আদৌ কোনো সুস্থ সমাজের পরিচায়ক? নাকি এর নেপথ্য রয়েছে এক গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট?

​রাজ্যের মাটিতে পরপর ঘটে যাওয়া এই এনকাউন্টারগুলি কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রশ্নকেই উসকে দেয়নি, বরং রাজনৈতিক অঙ্গনকে দু’ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। প্রহ্লাদ দাসের মৃত্যুর পর প্রাথমিক পর্যায়ে তার বাবার মুখ থেকে ‘যা হয়েছে ঠিক হয়েছে’ জাতীয় স্বস্তিবাক্য শোনা যাওয়া এবং সাধারণ মানুষের একটি অংশের এই ঘটনাকে সমর্থন করা প্রমাণ করে যে অপরাধের দ্রুত ও চরম মীমাংসা দেখতে চাওয়ার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, প্রহ্লাদ দাসের মায়ের জোরালো প্রশ্ন—হাত বাঁধা থাকা সত্ত্বেও সে কীভাবে পুলিশের রিভলভার ছিনিয়ে নিল?—এই এনকাউন্টারের সত্যতা এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। তিনি এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ক্ষতিপূরণের দাবি তুলেছেন।

মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের এই এনকাউন্টার নিয়ে কবিতা লেখা এবং অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রীর ‘জমা খরচের হিসাব’ দেওয়ার মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে এই ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। একদল যখন একে অপরাধ দমনের মোক্ষম অস্ত্র বলছে, অন্য দল একে বিচারব্যবস্থার উপর সরাসরি আক্রমণ ও এনকাউন্টার সংস্কৃতির বিপজ্জনক বিস্তার বলে অভিহিত করছে।

সংবিধান অনুযায়ী পুলিশের কাজ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আদালতের বিচারাধীন করা এবং বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেন বারবার এই শর্টকাট বা এনকাউন্টার সংস্কৃতির পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে?
ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় মামলার জট এবং রায়দানে বিলম্ব সাধারণ মানুষের মনে বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত হতাশাজনক করে তুলেছে। বছরের পর বছর ধরে বিচার না পাওয়ার ফলে তাৎক্ষণিক বা ‘স্পট জাস্টিস’-এর চাহিদা তৈরি হচ্ছে।

অনেক সময় অপরাধ দমনের নামে পুলিশি বা রাষ্ট্রীয় শক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারকে একধরনের অদৃশ্য সুরক্ষাকবচ দেওয়া হয়, যা ভবিষ্যতে এই ধরনের সংস্কৃতিকে আরও বেশি প্রশ্রয় দেয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রহ্লাদ দাসের বাবার প্রাথমিক মন্তব্যের মতো সমাজের একটি বড় অংশ এই ধরনের এনকাউন্টারকে সমর্থন করছে।

এর পেছনে রয়েছে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট৷ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যদি অপরাধীর চরম শাস্তি বা মৃত্যু সংবাদ আসে, তবে তা সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতাকে সাময়িকভাবে প্রশমিত করে। মানুষ ভাবে, অপরাধী আর কখনো সমাজকে ক্ষতি করতে পারবে না।
সমাজে যখন খুন, ধর্ষণ বা অপরাধের গ্রাফ ঊর্ধমুখী হয়, তখন সাধারণ মানুষ প্রচলিত আইনের চেয়ে দমনমূলক ও কঠোর শক্তির ওপর বেশি ভরসা করতে শুরু করে। তারা আইনের সুরক্ষার চেয়ে ক্ষমতার ভয়কে বেশি কার্যকর বলে মনে করে।
​আজকের বঙ্গ রাজনীতি এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে আইন, নীতি এবং নৈতিকতার সীমাগুলো ক্রমশ ধূসর হয়ে গেছে। একদিকে রয়েছে নাগরিক অধিকার রক্ষা ও আইনের শাসনের তাগিদ, আর অন্যদিকে রয়েছে জনগণের আবেগ ও ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে তৈরি হওয়া এক বিপজ্জনক ধারা।

​যদি কোনো সভ্য সমাজে পুলিশই বিচারক ও জল্লাদের ভূমিকা পালন করতে শুরু করে, তবে তা গণতন্ত্রের স্তম্ভগুলিকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। প্রহ্লাদ দাসের মায়ের তোলা প্রশ্নটি কেবল একটি পরিবারের আকুতি নয়, এটি সমগ্র বিচারব্যবস্থা এবং সংবিধানের প্রতি এক গভীর নৈতিক প্রশ্ন।

এনকাউন্টার সংস্কৃতি কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। এটি সাময়িকভাবে ক্ষোভ প্রশমিত করলেও দীর্ঘমেয়াদে সমাজকে আরও বেশি হিংসাত্মক করে তোলে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই প্রবণতার বিস্তার প্রমাণ করে যে প্রশাসনিক সংস্কার এবং বিচারব্যবস্থার দ্রুত ও নিরপেক্ষ রূপায়ণ আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সাধারণ মানুষ যখন আইনি ব্যবস্থার ওপর পূর্ণ ভরসা ফিরে পাবে এবং অপরাধী রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের কড়া শাস্তির মুখোমুখি হবে, ঠিক তখনই এই এনকাউন্টার সংস্কৃতির শেকড় আলগা হয়ে যাবে। নতুবা, এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি একদিন গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই গ্রাস করবে।

নির্ভীক ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পাশে থাকুন

সত্যকে স্বাধীন রাখতে আমাদের পাশে থাকুন। অনুদান দিতে QR কোড স্ক্যান করুন অথবা আমাদের UPI ID ব্যবহার করুন।

UPI ID 8240214079@okaxis

অন্যান্য প্রতিবেদন.