৪৫০ বছরের প্রাচীন গুসকরার জমিদার বাড়ির বনেদি পূজোর গল্প।

৭৬ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

দুর্গাপুজোর ইতিহাস বহু প্রাচীন। সেই ইতিহাসের হাত ধরে বহু চমকপ্রদ কাহিনির ছোঁয়া থেকে যায় আজকের দিনেও। সে তালিকায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ৪৫০ বছরের পুরোনো গুসকরা চোংদার বাড়ির দুর্গাপূজা।

গুসকরা চোংদার বাড়ির দুর্গাপুজো

পূর্ব বর্ধমান জেলার ছোট্ট শহর গুসকরা। আউশগ্রামের দীর্ঘ জঙ্গলমহল অঞ্চলের ছোট্ট একটি সুন্দর মফস্বল। এখানকার ঐতিহ্যবাহী চোংদার বাড়ির দুর্গাপুজো বাংলার প্রাচীন দুর্গাপূজা গুলোর মধ্যে একটি। পূজোর হাতে বাকি মাত্র কয়েকটা দিন,শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি তুঙ্গে। গুসকরা, যার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কুনুর নদী। কথিত আছে সম্রাট শের শাহের আমলে গুসকরার এই জমিদার বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু হয়। প্রায় ৪৫০ বছর ধরে মহাসমারোহে বেশ রাজকীয়ভাবেই সম্পন্ন হয় এই বাড়ির পুজো। বর্তমানে সময়ের সাথে জৌলুস কিছুটা কমলেও পরিবারের বর্তমান সদস্যরা ঐতিহ্য ও পরম্পরাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। আজও এই প্রাচীন জমিদার বাড়ির বনেদি পুজো দেখতে ভীড় জমান বিভিন্ন পর্যটকেরা। চোংদার বাড়ির দুর্গাপুজোর কথা উঠলেই মনে পড়ে যায় এখানকার রীতি ও প্রথার ছবি। এই জমিদার বাড়ির পুজোতে ঘট বিসর্জন হয় না, ঘট আহ্বান করা হয়।নিঃসন্দেহে এই প্রথা অন্যরকম একটি দিক। জমিদার চতুর্ভুজ চোংদারের হাত ধরেই এই পুজো শুরু হয়েছিল বলে জানা যায়। সে সময় জমিদার বাড়ির কেন্দ্রস্থলেই তৈরি হয় বিরাট দুর্গা মন্দির। শোনা যায়, একসময় কলকাতার নামী কোম্পানির নট্টবাবুরা গুসকরার এই বাড়িতে গিয়ে যাত্রাপালার আসর জমাতেন। বারান্দার পলেস্তারা এখন প্রায় খসে পড়েছে। তবুও ধুমধাম করেই পুজোর চারটে দিন মেতে ওঠেন বাড়ির বড়ো থেকে ছোটো সদস্যরা। যে সমস্ত সদস্যরা বাইরে থাকেন, পুজোর সময় মোটামুটি সবাই একজোট হন। প্রথা মেনে দশমীতে ঘট বিসর্জন না করে, ঘট প্রতিষ্ঠা করা হয় এখানে। এই পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব দশমীর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। জানা যায় এক দশমীতে পুজো চলাকালীন মারা যান পরিবারের পূর্বপুরুষ চতুর্ভুজ চোংদার। তার পর তাঁর স্ত্রী বিদ্যাসুন্দরী দেবী দুর্গামন্দিরে স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করেন। সেই ঘটনার স্মৃতিতেই দশমীর দিনে দুর্গামন্দিরে তাঁদের দু’জনের শ্রাদ্ধ দেওয়ার রীতি চালু হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে আজও সেই রীতি অটুট। ইতিহাসে চোখ দিলে জানা যায় চোংদারদের পূর্বপুরুষদের পদবি ছিল চট্টোপাধ্যায়। পরে তাঁরা চোংদার উপাধি পান। একসময় তাঁদের জমিদারি বিস্তৃত ছিল সাতটি গ্রাম জুড়ে। পুজোর দিনগুলিতে সেই সাত গ্রামের বাসিন্দাদের আনাগোনায় জমজমাট হয়ে উঠত জমিদারবাড়ি। ভোগ খাওয়ার পরে পালাগান, যাত্রা – সবমিলিয়ে উৎসব চলত রাত পর্যন্ত।সেই অতীতের সাক্ষী হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশাল দুর্গাদালান। তার পাশে ভোগঘর। এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে শতাধিক উনুনের ভগ্নাংশ। জমিদারি আমলে সেই উনুনেই তৈরি হত অন্নভোগ। এখন অবশ্য পরিকাঠামো অনেকটা জীর্ণ। কিন্তু পুজোর চার দিন পরিবারের সদস্যদের বড় একটা সময় কাটে ওই দুর্গাদালানে। চোংদার বাড়ির পুজোয় আরও রয়েছে একাধিক বিশেষত্ব। পুজোর ঘট পরিবর্তন করা হয় না। সপ্তমী থেকে দশমী – চারদিনই জ্বলে প্রদীপ। চলে হোম-যজ্ঞ। নবমীতে হয় কুমারী পুজো। অষ্টমীর দিন অঞ্জলি তে ভিড় উপচে পড়ে এই বাড়িতে। নতুন প্রজন্ম বিশেষত তরুণ- তরুণীদের কাছে এই বনেদি বাড়ি পুজোর চারদিন নস্টালজিয়ার সাথে সময় কাটানোর জায়গা। বনেদি বাড়ির পরিবেশেই পুজোর প্রেম জমে ওঠে এখান থেকে।

কথিত আছে, এ পুজোয় একসময় কামান দাগা হত। এখন তা বন্ধ হয়ে গেছে। তবে এখন বন্দুকে ফায়ার করে সন্ধি পুজো শুরু হয় বলে শোনা যায়। শাক্ত মতে পুজো হয় এই বাড়িতে। ১৯৭৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় মারা যায় প্রচুর গবাদিপশু। সেই থেকে এখানে মোষ ও ছাগ বলি বন্ধ হয়ে যায়। তারপর থেকে চালকুমড়ো বলির প্রথা চালু রয়েছে। ভোগ রান্না হয় প্রায় ৫১ থালার। বাড়ির মহিলারাই সাধারণত ভোগ রান্না করেন। এছাড়াও থাকে এলাকাবাসীদের পাত পেড়ে খাওয়ানো। প্রায় ৪৫০ বছরের প্রাচীন এই পুজো নিঃশব্দে বলে দেয় ইতিহাসের কত কত কথা। পুজোর চারটে দিন তাই সমস্ত শব্দের বুনট ঘুরে বেড়ায় ঢাকের আওয়াজে আর উলু-শঙ্খধ্বনিতে। এই পুজোতে গ্রাম বাংলার অন্যরকম বনেদি পূজোর সাক্ষী থাকতে চলে আসতেই পারেন বাংলার অন্যতম জঙ্গলমহল অঞ্চলের এই জমিদার বাড়ির পুজোয়।

অন্যান্য প্রতিবেদন.