পেটের টানে জেব্রা ক্রসিয়ে রং লেপা পাটেকরের “নানা” হয়ে হয়ে ওঠা, যেন এক জীবন্ত সিনেমা

২০ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​চলচ্চিত্র জগতের প্রাঙ্গণে কিছু মানুষ আসেন যাঁরা কেবল চরিত্র রূপায়ন করেন না, বরং সেলুলয়েডের ফিতায় নিজের রক্ত-মাংসের অস্তিত্ব খোদাই করে যান। বিশ্বনাথ পাটেকর—যাঁকে আমরা এক ডাকে চিনি ‘নানা’ নামে—আজ নিঃশব্দে পাড়ি দিলেন সেই অনন্ত দেশে, যেখান থেকে আর ফেরা যায় না। বোম্বাইয়ের চলচ্চিত্র জগৎ তথা ভারতীয় সংস্কৃতির এক বর্ণময় অধ্যায়ের আকস্মিক যবনিকা পতন ঘটল। অথচ বিশ্বাস করতে মন চায় না যে, ওই গমগমে কণ্ঠস্বর, চোখের ওই দ্যুতিময় তীব্রতা কেবলই স্মৃতি।


​নানা পাটেকরের জীবনপঞ্জি সাধারণ কোনো তারকার পথ চলা নয়; এ যেন রূঢ় বাস্তবের বিরুদ্ধে এক আজীবন জেহাদ। মুম্বইয়ের নামী স্যার জে. জে. ইনস্টিটিউট অফ অ্যাপ্লায়েড আর্ট থেকে ডিগ্রি অর্জনের পরেও নিয়তির নিষ্ঠুর আঘাতে যখন তাঁর পরিবার চরম আর্থিক সঙ্কটের মুখোমুখি হয়, তখন শিল্পের তুলিকেই তিনি বানিয়েছিলেন বেঁচে থাকার একমাত্র অস্ত্র। পেটের টানে মুম্বইয়ের রাস্তায় রাস্তায় সিনেমার বড় বড় হোর্ডিং বা পোস্টার আঁকা কিংবা ট্রাফিকের জেব্রা ক্রসিং এঁকে তাকে দিনাতিপাত করতে হয়েছিল।রূপোলি পর্দার আলো তাঁকে সহজে ধরা দেয়নি। কিন্তু সেই বঞ্চনা আর অভাবই তাঁকে শিখিয়েছিল জীবনের সবচেয়ে বড় পাঠ—ক্ষুধা আর অপমানের ভেতর থেকেই জন্ম নেয় আসল শিল্পের খিদে।

নানা পাটেকর


​তাঁর অভিনয় জীবন যেন এক অদ্ভুত আশ্চর্যের মেলা। ‘প্রহার’ ছবির জন্য টানা তিন বছরের কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন তিনি। কেবল অভিনয়ের স্বার্থে নয়—চরিত্রের প্রতি নিখাদ ন্যায়বিচার করতে। পর্দায় ফুটিয়ে তোলা সেই দেশপ্রেম কেবল মেকআপ রুমের গণ্ডিতে আটকে থাকেনি। ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় তিনি প্রকৃত অর্থেই মারঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং টেরিটোরিয়াল আর্মি থেকে লেফট্যানেন্ট কর্নেল পদ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নেন। সেলুলয়েডের নায়ক আর বাস্তবের সৈনিকের এই দুর্লভ মেলবন্ধন নানা পাটেকরকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল।


​’পরিিন্দা’র আন্না শেঠি থেকে শুরু করে ‘ক্রান্তিবীর’-এর প্রতাপ তিলক কিংবা ‘নটসম্রাট’-এর আ আপ্পা সাহেবের ট্র্যাজেডি—নানা মানেই ছিল এক বিস্ফোরক সত্য। তিনি যখন ডায়ালগ বলতেন, মনে হতো কোনো চিত্রনাট্য পড়া হচ্ছে না, বরং চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠছে কোনো দগ্ধ মানুষের আত্মরক্তিম দলিল। চরিত্রের চামড়ার নিচে ঢুকে যাওয়ার এই অদ্ভুত ক্ষমতা খুব কম অভিনেতারই থাকে। তিনি কখনও প্রচলিত বাণিজ্যিক নায়কের ছাঁচে নিজেকে বাঁধতে চাননি, বরং বেছে নিয়েছিলেন এমন সব চরিত্র যা দর্শকের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে।


​পর্দার বাইরেও তিনি ছিলেন এক অন্য মানুষ। খ্যাতির অহংকার তাঁকে কখনও স্পর্শ করতে পারেনি। নাম ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে খরা-পীড়িত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো হোক কিংবা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে থাকা—নানা সবসময় ছিলেন মাটির কাছাকাছি। গ্ল্যামারের ধুলোবালি তাঁকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি, বরং তিনি ভালোবেসেছিলেন জীবনের রূঢ় ও সহজ সত্যগুলোকে।


​আজ নানা পাটেকর নেই। গোয়ার মাটিতে নিঃশব্দে থেমে গেছে এক চিরযুবা হৃদয়ের স্পন্দন। কিন্তু বাংলা বা হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন সেই জ্বলন্ত প্রদীপের মতো, যা ঝড়ের মধ্যেও নিজের শিখাকে নিভতে দেয়নি। বিদায়, নানা ভাই। আপনার ওই শাণিত কণ্ঠস্বর আর দীপ্ত ব্যক্তিত্ব আমাদের সংস্কৃতির জানাজায় চিরকাল প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.