বন্দে মাতরম্ অর্থাৎ মা, তোমাকে প্রণাম। ১৮৭৫ সালে প্রকাশিত হওয়া ‘ বঙ্গদর্শন ‘ পত্রিকায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ বন্দে মাতরম্ ‘ প্রথম কবিতা হিসেবে প্রকাশিত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি একটি কবিতা ছিল যা স্বাধীনভাবে প্রকাশিত হয়। ১৮৮২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র এই কবিতা ওনারই নব্য মুক্তি পাওয়া ‘ আনন্দমঠ ‘ উপন্যাসে একটি গান হিসেবে ব্যবহৃত করেন এবং পূর্বের ১২ লাইন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে সেটি দাড়াঁয় ৩৩ লাইন ও ৬ পংক্তির। উল্লিখিত সময়কালে এই গানের কোনো রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল না।
সময় গড়ায়। জনগণের ক্ষোভ ক্রমশ বৃদ্ধি পায় ইংরেজ সরকারের ক্রমবর্ধান দৌরত্যের ওপরে। মানুষ হাতের কাছে যা কিছু পায়, তাই আঁকড়ে ধরে। রাজনৈতিক পটভূমিতে এই গানের প্রয়োগ বাড়ে। ১৮৯৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কলকাতায়, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের ১২ তম অধিবেশনে গানটি প্রথমবার গান, যা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হয়ে দাঁড়ায়। সেইদিন প্রথমবার বন্দে মাতরম আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক জায়গা করে নেয়। এরপরে ১৯০৫ সালে স্বদেশী আন্দোলনে বঙ্কিমচন্দ্র রচিত এই গানকে প্রথমবার একটি রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সেই বছরেই ন্যাশনাল কংগ্রেসের বারাণসী অধিবেশনে এই গানকে দলের সমস্ত অধিবেশনের জন্যে বাধ্যতামুলক করে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, এই সমস্ত ক্ষেত্রে বন্দে মাতরমে’র প্রথম দুটি পংক্তিই জনসমক্ষে জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
দেশ জোট স্বাধীনতার তরফে অগ্রসর হয়, বাংলায় সম্রদায়িক হিংসা ও রোষের ঘটনা উঠে আসতে থাকে। জনগণের নজর পড়ে বন্দে মাতরম এর সম্পূর্ণ পংক্তির ওপরে। ১৯৩৭ সালে, রাজেন্দ্র প্রসাদ বল্লভ ভাই প্যাটেলকে চিঠিতে জানান, জাতীয় কংগ্রেসকে এবার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত এবং কলকাতার অধিবেশনে দল বন্দে মাতরম এর ব্যবহার বিষয়ে পুনর্নির্বাচন করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মহাত্মা গান্ধীর উপদেশে গানের প্রথম দুটি পংক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে জাতীয় কংগ্রেস এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় শুধুমাত্র গানের সেই দুটি পংক্তিই যেকোনো রাজনৈতিক সমাবেশে গাওয়া হবে।
ভারত স্বাধীনতার আগে থেকেই নিজেদের বিচারে অনড় ছিল। ধর্মনিরপেক্ষ ভারত। কিন্তু সম্পূর্ণ বন্দে মাতরম গান সেই বিচারের সমর্থনে ছিল না। বঙ্কিমচন্দ্র কবিতা স্বরূপ বন্দে মাতরম এর জন্ম দিলেও পরবর্তীকালে তিনি উপন্যাসে গানটির ব্যাবহার করেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ভঙ্গিতে। এই প্রসঙ্গে আসতে হয় ‘ আনন্দমঠ ‘এর পটভূমি নিয়ে। ১৮০০ শতকে দুর্ভিক্ষের সময় বাংলায় সংগঠিত হয় ‘ ফকির সন্ন্যাসী ‘ বিদ্রোহ। সেই প্রেক্ষাপটেই বঙ্কিমচন্দ্র রচনা করেন আনন্দমঠ উপন্যাস। কিন্তু যেই বিদ্রোহে হিন্দু মুসলিম সমানভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন সেখানে তাঁর উপন্যাসে তিনি হিন্দুদের মুসলিমবিরোধী হিসেবে তুলে ধরেন। বাংলার হিন্দু সন্ন্যাসীরা বিদ্রোহে নামে মুসলিম ফকিরদের বিরুদ্ধে। উপন্যাসের ইঙ্গিত বোঝায় হিন্দুদের দায়িত্ব মুসলিমদের ধ্বংস করা। সমগ্র মুসলিম অপসারণ। এই কাল্পনিক প্রেক্ষাপটের জন্যেই তিনি তৈরি করেন নির্দিষ্ট রূপের মা, যাকে দুর্গা বা লক্ষ্মী হিসেবে ঠাউর করা হয়। এই মা হিন্দুদের শক্তি দেন সমগ্র মুসলিম জাতির বিনাশকার্যে। প্রথম দুটি পংক্তিতে উল্লেখ রয়েছে দেশের প্রতি ভালবাসা এবং ভারতের বৈচিত্র্য। কিন্তু পরের গুলোতে উল্লেখ রয়েছে দুর্গা অথবা লক্ষ্মী মায়ের প্রতি ভক্তির কথা।
গানের অবশিষ্ট পংক্তি অপসারণের পরে, স্বাধীনতার দিন সকালে প্রথমবার বন্দে মাতরম All India Radio তে এই গান গাওয়া হয়। এবং ১৯৫০ সালে গণপরিষদের চূড়ান্ত অধিবেশনে ‘ জন গণ মন ‘ কে জাতীয় স্তোত্র এবং ‘ বন্দে মাতরম ‘ কে জাতীয় গানের মর্যাদা দেওয়া হয়। বলা হয়, দুটিই সমানভাবে সন্মান পাবে আগামী সময়ে। ১৯৭১ সালে জাতীয় সম্মানসূচক আইনের অধীনে ‘ জন গণ মন ‘ কে জাতীয় স্তোত্র হিসেবে স্বীকৃতি ও সুরক্ষা দেওয়া হয়। বন্দে মাতরম বিরত থাকে এই সাংবিধানিক প্রাসঙ্গিকতা থেকে।

২০২৫ সালের ৭ই নভেম্বর বন্দে মাতরম রাজনৈতিক মঞ্চ অধিগ্রহণের ১৫০ বছর পূর্ণ হয়। এই বছরের জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সভায় পেশ করে National Honour Amendment Act 2026 যা বন্দে মাতরম কেও জন গণ মন ‘ র মতোই সমান সুরক্ষা প্রদানের দাবি করে। ৩০ জুলাই সংসদ এই বিল পাশ করে এটিকে আইন হিসেবে গ্রহণ করে। এবছর ১৫ই আগস্ট দিল্লির লাল কেল্লা থেকে প্রথমবার ‘ জন গণ মন ‘ র আগে বন্দে মাতরম সম্পূর্ণ গান পাঠ করা হয়। এবং দেশের সর্বাঙ্গে এটি পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
স্বাধীনতা দিবসে, দিল্লির কংগ্রেস ভবনে সোনিয়া গান্ধীর, সম্পূর্ণ বন্দে মাতরম পাঠের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে বিজেপি নেতারা। এই ঘটনা নিয়ে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কিন্তু সোনিয়া গান্ধীর এই দ্বিধা কি যথার্থ নয়? আজ বন্দে মাতরম এর সম্পূর্ণ পংক্তি পাঠ প্রশ্ন তোলে ভারতের ধর্ম নিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে। যে উপদেশ রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীরা দিয়ে গিয়েছিলেন তা কি এতটাই ফেলনা? নেহেরু, সুভাষেরা যে সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলেন তা নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠছে স্বাধীনতার এতদিন পরেও?
হিন্দুত্ববাদী সংস্থা ও নরেন্দ্র মোদী পার্টির শাসন ক্ষমতা দখলের পর থেকেই বন্দে মাতরম এর পুরো পংক্তি পাঠের উদ্দেশ্যে নানান কথা বলে। বন্দে মাতরম এর ওই উক্তি শুধুই সংবিধান বিরোধীই নয়, একটি বলপ্রয়োগ। তামিল নাড়ু সরকার ইতিমধ্যেই এর বিরুদ্ধে নিয়ম প্রয়োগ করে জানিয়েছে, আগে রাজ্যের নিজস্ব গীতি গাওয়া হবে যেকোনো সরকারি অধিবেশনে, তারপরেই জাতীয় গীতি। কেরালা সামগ্রিকভাবে এই নিয়মের খন্ডন করে স্বাধীনতা দিবসের দিন বন্দে মাতরমের পুরো পংক্তি উচ্চারণ না করে।
জাতীয় গীতি কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। যে গান্ধী সরকার তাঁর প্রচলন করেছিলেন তাঁরা আজ শাসনক্ষমতায় নেই। ঠিক কোথায় গিয়ে আমরা দাগ টেনে বলতে পারি, সংবিধান কারোর পর্যবেক্ষণের অধীনে নেই। তবে এটুকু নিশ্চিত, বন্দে মাতরম বিতর্কের শেষ এখানেই নয়। এ শুধুই এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

