Shopping cart

  • Home
  • ফিচার
  • পৃথিবীর সব কমিউনিস্টের নাম রবি দাস হোক!
ফিচার

পৃথিবীর সব কমিউনিস্টের নাম রবি দাস হোক!

3454

“সেইসব মানুষদের ধন্যবাদ, যারা বোধশক্তিহীন মানুষদের সামনে পুড়িয়ে মারল নিজেকে।”
আন্দ্রেই তারকোভস্কির সেই বিখ্যাত শব্দবন্ধ বইয়ের পাতা, ইন্টারনেট হয়ে আমাদের সমাজে প্রতিদিন ফুটে ওঠে। উত্তম-শর্মিলার আনন্দ আশ্রমে শ্যামল বাবু গেয়ে শোনান, ধূপ চিরদিন গন্ধ বিলায়, সে তো নীরবে জ্বলে মরে! সেইসব ধূপেরা, যারা অষ্টমীর সন্ধ্যায় কুমোরটুলি স্ট্রিটে কালীপুজোর কাঠামোর প্রস্তুতি নেন। ট্রামলাইনের মাইক থেকে সেই শ্যামল মিত্রের গান পৌঁছয় তাদের কানে, তবু হলদে আলো গায়ে লাগে না। আমি সেইসব ধূপের কথা বলছি যাদের কাজ হাওড়া – শিয়ালদহে প্রথম বনগাঁ – মেছেদা লোকালের আগেই শেষ হয়ে যায়। কিংবা যাদের নিয়ে লেখা হয়েছিল ‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’।
একটা প্রীতিলতা, একটা কানাইলাল দত্ত, একটা ভগৎ সিং, একটা ক্ষুদিরাম কিংবা সেই ঝাড়ুদার, যাকে ‘মুন্না’ বুকে টেনে নিয়েছিল বলে প্রথমবারের জন্য সে নিজের পরিচয় পেয়েছিল।

এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা রোজ রোজ আমাদের মতো বোধশক্তিহীন মানুষদের সামনে নিজেদের পুড়িয়ে মারছেন। আর মারছেন বলেই আমরা সুরক্ষিত। আমরা যারা অফিস ফেরত সন্ধ্যায় মুড়ি চানাচুর আর টিভি সিরিয়ালে কাটিয়ে দিচ্ছি শনি – মঙ্গলবার আর ভাবছি, ‘যা হচ্ছে হোক, আমার সঙ্গে তো কিছু হয়নি’ কিংবা ‘উনি তো কাজের জন্য পারিশ্রমিক পাচ্ছেন!’ তারা জানতেই পারিনি ফিশফ্রাই তে ভেটকি ছিল নাকি বাসা।
এই প্রশ্নের মাঝেই সেই বিয়েবাড়ির সিকিউরিটি গার্ডের কথা- যাঁর অনুমতি ছিল না জমকালো বিয়েবাড়িতে যাবার, যাঁর কাছে ভেটকি, বাসার কোনো তফাৎ নেই, ত্যালাপিয়া জুটলেই অনেক!
হ্যাঁ, তিনি পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন রাত জাগার। হ্যাঁ, তিনি পারিশ্রমিক পান বিয়ের রাতে এয়ারপোর্ট থেকে মধ্যমগ্রাম হেঁটে বাড়ি ফেরার। কিন্তু কত টাকা?
‘পাঁচশ, মেরেকেটে ছয়শ! কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই।’
বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় একটা চিন কাগজ পকেটে রাখেন মেয়ের জন্য দুটো ফিশফ্রাই, কটা মিষ্টি আনবেন বলে। সেই মনসা বস্ত্রালয়ের চিন কাগজ কখনো ভরে আসে, কখনো ফাঁকাই। তবু সেইসব মানুষকে, আমরা যারা বোধশক্তিহীন হয়েই মরে যাব একদিন, তারা কি একটা ধন্যবাদ টুকুও দিতে পারি না?


আমি প্রতীক উর রহমানকে সামনাসামনি কম চিনি। বেশি চিনি ফেসবুকের দৌলতে। ওর একরোখা মনোভাব, মেঠো শরীর আমায় সেই ঝাড়খণ্ডের প্রত্যন্ত গ্রামের আদিবাসী ছেলেটার কথা মনে করিয়েছিল, যে চিড়ে যাওয়া গলায় গাইতে জানে, ‘গাঁও ছোড়াব নেহি, হাম জঙ্গল ছোড়াব নেহি। মা এ-মাটি ছোড়াব নেহি, লড়াই ছোড়াব নেহি!’ যে কয়েকবার দেখা হয়েছে মৃদু হেসেছেন। ঘোলাটে হলুদ আলোয় মঞ্চে বক্তৃতা করবার ছবি আমায় ক্যাপশনে লিখতে শিখিয়েছে, ‘রেখো মাটির পরে দুটি পা, রেখো মাটির সাথে দোস্তি’..


এই তো দুদিন আগেও দেখলাম নিজের ফেসবুকে, প্রতীক উড়ের ফেসবুক বায়োতে লেখা, ‘সভ্যতার বুকে শোষিত মানুষের পদাঘাত রেখে যেতে চাই’!


এই শোষিত মানুষ কে? কারা? যাঁরা দিনের পর দিন আধপেটা খেয়ে সারদা, রোজ ভ্যালি-তে টাকা রেখেছিলেন মেয়ের বিয়েটা ভালো করে দেবেন বলে, যে বাবা-মা রক্ত জল করে মেয়েকে ডাক্তারি পড়িয়ে আরজি করে পাঠিয়েছিলেন, যাঁরা আজও প্রতিদিন গোটা শহর ঘুরে পেন বিক্রি করে দৈনিক ১৫০ টাকা রোজগার করেন, যে চাষী বউ সারাদিন ধান পুঁতে পেলেন আড়াইশো টাকা – যাঁর ছেলেটা টাকার অভাবে লেখাপড়া ছাড়ল, সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামে ১৩ বছরের সেই মেয়ে যাঁকে বিক্রি করে দিয়েছিল শাসকদলের মদতপুষ্ট লোক, আপনি এই সমস্ত শোষিতদের পক্ষে দাঁড়িয়ে সারাজীবন কথা বলতে পারবেন? বলা সম্ভব যে দলে যোগ দিলেন?


একটা ইলা মিত্র, একটা মানিক সান্যাল, একটা চারু মজুমদার, একটা মণিকুন্তলা সেন, একটা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য, একটা জসিমউদ্দিন মণ্ডলের উত্তরসূরি ছিলেন আপনি। এরপর থেকে আর কখনো আপ ডায়মন্ড হারবার লোকালে চড়বেন তো? দেখা হবে আপনার সেই পেন ওয়ালার সঙ্গে, যাঁর কাছে একদিন ভোট দেওয়া মানে ১৫০ টাকা রোজগারে বাধা? জানি না। শুধু জানি আপনি আন্দ্রেই তারকোভস্কির লেখা সেই বোধশক্তিহীন মানুষের দলে নাম লেখালেন। আপনি ভুলে গেলেন একটা রবি দাস, শালকু সোরেন, দিবাকর হাঁসদা, প্রদীপ তা-দের যাঁরা নিজেকে পুড়িয়ে মেরেছিল আপনার জন্য। আপনাদের জন্য। যাঁরা টেলিভিশন মিডিয়ার জল মাপেন। ঘণ্টাখানেক ঠাণ্ডা ঘরে বসে ভাবেন বয়সকালে গাড়ির পেট্রোলের দাম পাবেন কিনা! আপনি ধন্যবাদ দিন সেই বিয়েবাড়ি ফেরত সিকিউরিটি গার্ডকে যিনি সারাদিনের রোজগার বাঁচিয়ে আপনাকে নেতা বানিয়েছিলেন। শ্বেত পতাকার দাম দিয়েছিলেন।


রবি দাস কে আপনার আর মনে পড়ে ‘রহমান’?


যিনি হালিশহর থেকে হালতু, হাত সাইকেলে পার করেছিলেন কতশত কিলোমিটার। কলেজ স্ট্রিটের ভিড়ে, ব্রিগেড মাঠে গোটা রাত জেগে নিজের বাঁকা হাত দুটো চাপড়ে বলেছিলেন, ‘আগার কাহি হ্যায় সোয়ার্গ তো, উতার লা জামিন পার..’


আপনি সেই সোয়ার্গ (স্বর্গ) মাটিতে নামিয়ে আনতে পারেন কিনা ভবিষ্যৎ বলবে। আপনি ক্ষুধা, অনাহারহীন এক পৃথিবীর জন্ম দিতে পারেন কিনা সেটাও জানা নেই বিলকুল। শুধু জানি, রবি দাসেরা কোনোদিন বয়সকালে গাড়ির পেট্রোল, দলীয় পদের কথা ভাবেনি। এই বোধশক্তিহীন পৃথিবীতে রোজ পুড়িয়ে মেরে আপনাকে, আমাকে বানিয়েছে। যে আমরা আপনার তৃণমূলে যোগ দেওয়ার খবরটা (পড়ুন সিরিয়ালটা) গিলছি চানাচুর, মুড়ির সহযোগে। দুটো ফেসবুক কমেন্ট, পাঁচটা ‘আনন্দ’ রিলস-এ ভুলে যাচ্ছি, সবটা পাওয়ার মানে, সবহারাদের মহড়া!

সম্পর্কিত খবর