আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই নতুন কিছু নয়। সেই ব্রিটিশ শাসনকাল থেকে শোষণের বিরুদ্ধে তাঁদের যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল, স্বাধীনতার পরেও তা জারি রয়েছে। এবার সবুজ ও পৈতৃকভিটেমাটি রক্ষার্থে রুখে দাঁড়িয়েছে ওড়িশার আদিবাসী সম্প্রদায়। ক্রমশই প্রশাসনের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ বাড়ছে। ওড়িশার রায়গড়া জেলা সংবিধানের পঞ্চম তফসিলভুক্ত এলাকার অন্তর্গত হওয়ায় এই অঞ্চলে জমি অধিগ্রহণের পূর্বে গ্রামসভার সম্মতি নেওয়া আইনত বাধ্যতামূলক। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রামসভাগুলিতে অনিয়ম ও জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণে সম্মতি জানানো হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রামসভা অনুষ্ঠিতও হয়নি অথবা বাইরে থেকে লোক এনে সভা দেখানো হয়েছে মাত্র। এখানেই শেষ নয়, ভোটের তালিকার কারচুপির মতো গ্রামসভার উপস্থিতির তালিকাতেও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট তালিকায় মৃতব্যক্তি, শিশুদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। যা গোটা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ওড়িশার রায়গড়া ও কালাহান্ডি জেলায় অবস্থিত সিজিমালির সুবিশাল বক্সাইট খনি। সম্প্রতি বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল সাফ করার লক্ষ্যে বিপুল সংখ্যক আধা-সামরিক বাহিনীর উপস্থিতিতে বুলডোজার চালানো হয়েছে বলেই খবর মিলেছে। বর্তমানে বুলডোজারের দাপট সর্বত্র। কখনও বনভূমি সাফ করতে, কখনও বা হকার উচ্ছেদের তাড়নায় কিংবা অবৈধ নির্মাণ ভাঙার নামে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে মধ্যবিত্তের মাথা গোজার শেষ সম্বলটুকুও।
এই সিজিমালিতেই রয়েছে দেশের বৃহত্তম বক্সাইট ভাণ্ডার, যা অ্যালুমিনিয়াম তৈরির মূল কাঁচামাল। ফলত, দীর্ঘদিন ধরেই এই খনিজ ভাণ্ডারটি সরকার ও শিল্পগোষ্ঠীদের নজরে ছিল। প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালে ওড়িশা সরকার বেদান্তা লিমিটেডকে সিজিমালি বক্সাইট ব্লকের প্রেফার্ড বিডার হিসেবে ঘোষণা করে। এরপরই সমস্যার সূত্রপাত হয়, যখন উত্তোলিত কাঁচামালের পরিবহন সহজ করতে খনি সংলগ্ন রাস্তা নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয় কোম্পানি তরফে। স্থানীয়রা এর তীব্র বিরোধিতা জানায়। তাঁদের আশঙ্কা, এই প্রকল্পের ফলে তাঁদের জীবিকা, বাসস্থান ও বনভূমির ওপর কোপ পড়বে। অন্যদিকে, পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক (MoEF&CC) রাস্তা নির্মাণের জন্য ওড়িশা সরকারকে বনভূমি সংক্রান্ত ছাড়পত্র প্রদান করে। যদিও বিষয়টি বর্তমানে জাতীয় পরিবেশ আদালতে (NGT) বিচারাধীন।
অনুমোদনের চিঠিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রক ওড়িশা সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে, যাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা গাছ কাটার জন্য নেট প্রেজেন্ট ভ্যালু (NPV) পরিশোধ এবং ৬.০৭ হেক্টর অ-বনভূমিতে ক্ষতিপূরণমূলক বনায়নের ব্যয় বহন করে। তবে স্থানীয়দেরর অভিযোগ, বনাধিকার আইন ২০০৬ (FRA Act) -কে একপ্রকার বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বনভূমি সাফ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এই সড়ক প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হল, সিজিমালি খনিকে SH-44 সড়কের সঙ্গে যুক্ত করা। যাতে খুব কম খরচে দ্রুত লাঞ্জিগড় শহরে বেদান্তর ধাতু-শোধনাগারে বক্সাইট পৌঁছানো যায়। প্রকল্পের জন্য মোট ১১.৩১৪ হেক্টর জমি প্রয়োজন। যার মধ্যে রয়েছে ৬.৪০৩ হেক্টর অ-বনভূমি। ০.১৬০ হেক্টর ব্যক্তিগত জমি এবং বাকি অংশ বনভূমি।
২০২৫ সালে এই সড়ক প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বনভূমির অনুমোদন পেতে ওড়িশা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (IDCO) কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের কাছে আবেদন জানায়। সেই বছরের ফরেস্ট অ্যাডভাইজরি কমিটির (FAC) বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, প্রকল্পের বনভূমি-সংক্রান্ত অনুমোদনের পর সড়ক প্রকল্পের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। এর আগে ২০২৪ সালে ‘খনি প্রকল্পের’ জন্য ৭০৮.২০৪ হেক্টর বনভূমি হস্তান্তরের আবেদন করেছিল বেদান্ত।
সরকারি নথির সঙ্গে বাস্তবের অমিল, অভিযোগ স্থানীয়দের। সরকারি নথি অনুযায়ী, এই বনভূমিকে “DLC Forest”- এর তকমা দেওয়া হয়েছে। নথিতে উল্লেখ রয়েছে, উদ্ভিদের ঘনত্ব ০.৪-এর কম এবং গাছের সংখ্যা মোটে ৯১টি। যদিও স্থানীয়রা গাছের এই পরিসংখ্যানকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, প্রকৃত গাছের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। শাল, বাহাড়া, জাম, আম ও আমলকির মতো গাছে ঘেরা এই বনঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল এখানকার অধিকাংশ মানুষ।
পশুপাখিদের মধ্যে সরকারি নথিতে বার্কিং ডিয়ার, বন্য শূকর, ময়ূর এবং ভারতীয় খরগোশের উপস্থিতির কথা উল্লেখ থাকলেও, পুরোদমে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে হাতি’সহ বিপন্ন কিছু প্রজাতি অস্তিত্বের বিষয়টি। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে Sanctuary Nature Foundation-এর এক গবেষণাপত্রে এই অঞ্চলে হাতি ও ছোট-নখওয়ালা ওটার-এর উপস্থিতির তথ্য উঠে আসে।
গোটা বিষয় থেকে স্পষ্ট, সবুজ কেটে শুধু কংক্রিটের জঙ্গল গড়ে এবং কয়েকজন শিল্পপতির বিকাশ ঘটিয়ে এ-দেশের বিকাশ ঘটানো সম্ভব না। প্রায় ১৪৭ কোটি জনগণের এই দেশে উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন আদিবাসী, কৃষক, শ্রমিকসহ সমাজের প্রান্তিক মানুষ সকলের মর্যাদাপূর্ণ জীবন ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হবে। তীব্র দাবদাহে দেশবাসীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করার পরামর্শ দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। অথচ বনভূমি রক্ষা ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে প্রশাসন ও সরকারের ক্ষীণ ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। তবে ভুললে চলবে না, বন সংরক্ষণ এবং নতুন গাছ লাগানোই বিশ্ব উষ্ণায়ন কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়। গাছ কাটলে শুধু গাছ মরে না, সংকটে পড়ে প্রাণীকূলও। এখন দেখার কবে এই সত্যিটা উপলব্ধি করে প্রশাসন ও সরকার!














