কলকাতা শহরের বুকে সাধারণ যেকোনো দশজন লোকের মধ্যে অন্তত আটজন লোকের কাছে সুন্দরবন মানেই একটা উন্মাদনায় ভরা নৌকাযাত্রা, যার বুকে বাজবে কানফাটানো গান আর চিংড়ি-ইলিশের মহোৎসব—উপরি পাওনা বাঘ দেখা। এর বাইরে সুন্দরবনকে দেখা বা সুন্দরবন নিয়ে ভাবার মানুষ খুবই কম পেয়েছি। যদিও বা খুঁজে খুঁজে হাতে গোনা কিছু মানুষ পাওয়া যায়, তাঁদের মধ্যে একটা বড় অংশের ধারণা হলো সুন্দরবন এমন একটি অঞ্চল যেখানে বারবার ঝড়-ঝাপটা হয়, অনেকগুলো বাড়ি ভেঙে পড়ে যায়। শহর থেকে পালা করে তখন খাবারের প্যাকেট কিংবা পুরনো জামাকাপড় ত্রাণ হিসেবে বিলি করতে যেতে হয়। এটুকুই।
যে সুন্দরবন তার বিপুল পরিমাণ জীববৈচিত্র্যের রসদ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে কলকাতা শহরকে, এই বাংলাকে বাঁচিয়ে রেখেছে, সেখানকার প্রাণ-প্রকৃতি কেমন আছে, সেখানকার মানুষ কেমন আছে তা নিয়ে জানার বালাই খুবই কম মানুষের। একটা ঝড় কিংবা বন্যা হলে আমরা অনেকেই জানতেই পারি না যে বাঁধ ভেঙে গিয়ে ঠিক কতজন মানুষ গৃহহীন হয়। গৃহহীন হলে ঠিক কী দুর্গতি হয়। কতখানি মনের ক্ষতি হয় তাতে! শিশু ও মহিলাদের জীবন তখন কেমন হয়! যে বাঘ দেখার তাড়না নিয়ে শহুরে জীবন ছুটে যায় বারবার, সেই বাঘ সেখানকার মানুষের মনে কতখানি দাগ ফেলে, কতখানি ভয়ের উদ্রেক ঘটায় তা শহুরে জীবনের অধিকাংশেরই অজানা থেকে যায়। থাকবে নাই বা কেন—আকাশ কালো করে ঘন মেঘ এলে সেই মেঘের সাথে ছাদে উঠে সেলফি তোলার মতো আভিজাত্যের সুযোগ তো সেই জীবনে আছে। ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সব থেকে খারাপ দিক হলো বোধহয় এটাই, যা সহনাগরিকের ব্যথার কথা উপলব্ধি করার মতো পরিসর তৈরি করে না।
কলকাতা থেকে মাত্র একশো কিলোমিটার দূরে ঘোড়ামারা একটি দ্বীপ, যা শেষ দুই-তিন দশকে ভাঙতে ভাঙতে তার ৫০%-এর বেশি জায়গা জলের তলায় চলে গেছে। খুব সামান্যই বসবাসযোগ্য অংশ এখনও টিকে আছে। শহরের সাথে সেই দ্বীপের যোগাযোগ সারাদিনে মাত্র চারটি (কখনও পাঁচটি) নৌকা দিয়ে। সেই নৌকা যখন পাড়ে গিয়ে পৌঁছায়, তাকে বাঁধার জন্য কোনো জেটিঘাট নেই। কারণ যে জেটিঘাট ছিল, তা ভাঙনের ফলে জলের তলায় চলে গেছে। কোনো জেটিঘাট না থাকার ফলে মানুষজনকে অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে একটি বাঁশের ওপর দিয়ে কোনোমতে পা রেখে যেতে হয়। এই পথ যথেষ্ট দুর্গম। বর্ষার সময় সে এক দুর্বিষহ বিষয় হয়ে ওঠে বটে। এই সময় কোনো অসুস্থ রোগী কিংবা কোনো গর্ভবতী মহিলাকে যদি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়, তা যে কী যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তা শুধু সেখানকার মানুষই জানেন।
নতুন করে জেটিঘাট বানানোর উদ্যোগ তেমন নেই, বানিয়েও যে লাভ নেই তা স্থানীয়রা খুব ভালো করেই জানেন। এমন পরিস্থিতিতে ঘোড়ামারার অনেক বয়স্ক মানুষের মুখেই অস্বস্তির কথা শোনা যায় যে তাঁদের বাড়ির ছেলের বিয়ে হচ্ছে না— “এই পোড়া, ভাঙা দ্বীপে কেউ মেয়ে পাঠাতে চায়?!”
এইরকম একটা যন্ত্রণাময় দ্বীপে এই মুহূর্তে কোনো সরকারি ডাক্তার নেই। আছেন কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী, আশা কর্মী ও একজন কমিউনিটি হেলথ অফিসার, যিনি আদতে একজন নার্স। এই কয়েকজন মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমে চলে ঘোড়ামারার স্বাস্থ্য পরিষেবা। কিন্তু গ্রামের মানুষের এখনও জানা নেই তাঁদের কাছে ডাক্তার কেন আসেন না। কমিউনিটি অফিসারকেই সমস্ত দিক সামাল দিতে হয়।
কিন্তু লাগাতার ঝড়-ঝাপটা, বন্যা থেকে শুরু করে বাসস্থান হারানোর এই নানান সমস্যাগুলি সেখানকার মানুষের মনে ভীষণ প্রভাব ফেলে। Post Traumatic Stress Disorder (PTSD), ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি—এরকম গুরুগম্ভীর নামের নানান মানসিক সমস্যা শুধু ঘোড়ামারা নয়, বঙ্গোপসাগর উপকূলের নানান অঞ্চলে এখন ভীষণভাবে প্রকট।
২০০৯ সালে সুন্দরবনের বুকে আসে বিধ্বংসী আয়লা। তার ঠিক ১১ বছর বাদে ২০২০ সালে আছড়ে পড়ে আম্ফান। এই দুই ঝড়ের দুঃসহ স্মৃতি আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি সুন্দরবনবাসী। আম্ফানের জলোচ্ছ্বাসে কার্যত ভেসে যায় ঘোড়ামারা। একই পরিস্থিতি হয় ইয়াসের সময়। লাগাতার এই সমস্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভাঙন, নোনা জল ঢুকে যাওয়া এবং দুর্যোগের ফলে লোকজনের বাড়িঘর ভেঙে যাওয়া—এই সবকিছুর মিলিত প্রভাবে মানসিক স্বাস্থ্য সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে চূড়ান্তভাবে বিধ্বস্ত।
একবার লবণাক্ত জল কৃষি জমিতে প্রবেশ করলে সেই জমি বহুদিনের জন্য হয়ে ওঠে চাষের অযোগ্য। ফলত, স্বাভাবিকভাবেই খাদ্যের সংকট দেখা দেয়। মানুষকে পেটের দায়ে অন্যত্র কাজ করতে যেতে হয়। এক্ষেত্রেও পুরুষ মানুষের সুযোগ থাকে বাইরে যাওয়ার, কিন্তু মহিলা ও শিশুরা সেই হতাশাময় দ্বীপেই দিনের পর দিন থেকে যায়। আবারও লিখছি, এই চূড়ান্ত হতাশাময় জীবন থেকে উদ্ধার করতে পারে যে চিকিৎসা পরিষেবা, অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদী সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা, তার কোনো নামগন্ধই নেই।
মানসিক স্বাস্থ্য এমন একটা বিষয় যা জ্বর-সর্দি-কাশির মত তীব্রতা নিয়ে ধরা দেয় না। শহুরে শিক্ষিত সমাজেই মানসিক সমস্যার চিকিৎসা করাতে কতজন মানুষ ছুটে যান সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। সেখানে গ্রামের মানুষ যারা প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বাঁচে, তারা যে আলাদা করে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকারের দাবি তুলবে না সেটাই স্বাভাবিক। যেহেতু দাবি ওঠে না, তাই তা সমাধানের কোনো বালাই নেই।
এই সমস্যা কিন্তু শুধু ঘোড়ামারার একার নয়, এই সমস্যা সুন্দরবনের উপকূলীয় জীবনের সার্বজনীন সমস্যা। ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত NHS Foundation Trust-এর গবেষক মনোবিদ ডঃ অরবিন্দ নারায়ণ চৌধুরী তাঁর গবেষণার জন্য একটি সমীক্ষা চালান, যে সমীক্ষায় তিনি উল্লেখ করেন সুন্দরবন অঞ্চলে মানুষের মধ্যে অনিদ্রা, উদ্বেগজনিত সমস্যা ও অবসাদ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে এর প্রবণতা বেশ ভয়াবহ।
সুন্দরবনের অন্যান্য অঞ্চলের হাসপাতালের উপস্থিতি ঘোড়ামারার মতো অস্বস্তিকর না হলেও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজের পরিবেশ কোথাও নেই। ফলত, এই সমস্ত সমস্যার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের অনেকে অবগত হলেও সমাধানের কোনো পরিবেশ নেই।
সাগরদ্বীপ অঞ্চলের বাসিন্দা বিকাশ দাস জানান যে তাঁর রাতে ভালো করে ঘুম হয় না। সমুদ্র শান্ত থাকলেও তাঁর মনের মধ্যে ভয় কাজ করে; বারবার মনে হয় এই যেন সমুদ্র অশান্ত হয়ে উঠবে এবং এক লহমায় একটা বিশাল বড় ঢেউ এসে তাঁদের জীবনটা পাখির বাসার মতো তছনছ করে দিয়ে চলে যাবে। সাগরদ্বীপের ধবলাট, মহিষমারি, বঙ্কিম নগর, সুমতি নগর, বেগুয়াখালি—এসব অঞ্চল সারাক্ষণ বিপদের ঝুঁকি নিয়ে টিকে আছে। অথচ এই সাগরের বুকেই অনতিদূরে প্রতিবছর গঙ্গাসাগর মেলা হয়। উৎসবে মেতে ওঠে চারপাশ। সরকার ব্যানার, মাইক দিয়ে সাজিয়ে দেয় চারপাশ, কিন্তু প্রদীপের তলার অন্ধকার কারো চোখে পড়ে না।
আলোচনা শুরু হয়েছিল বাঘ দেখা নিয়ে। দক্ষিণ রায় সুন্দরবনের অন্যতম ত্রাস। কুলতলী ব্লকের বাসিন্দা শংকর শী ও জ্যোৎস্না শী। আজ থেকে চার বছর আগে এই দম্পতি জঙ্গলে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণের শিকার হন। গ্রামের সাধারণ বধূ জ্যোৎস্না নিজের অসম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে আক্রমণকারী বাঘের সামনে থেকে নিজের আহত স্বামীকে উদ্ধার করে আনেন। দীর্ঘদিন জয়নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার পরে শংকর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন, কিন্তু তাঁর একটি হাত অকেজো হয়ে যায়। এখন নিজের এলাকায় একটি ছোট মুদির দোকান চালান তিনি, কিন্তু এই সীমাহীন ভয় ও অসহায়তা এখনও কুড়ে কুড়ে খায় তাঁদের।
শঙ্করের মতো ভাগ্যবান অবশ্য সবাই হতে পারেন না। একটি বেসরকারি তথ্যমতে, ১৯৯৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত সুন্দরবনে মোট ৪৩৭টি বাঘের আক্রমণের খোঁজ পাওয়া যায়, যেখানে প্রায় সকলেই মারা গেছেন। স্বামীরা যখন বাঘের আক্রমণে মারা যান, সুন্দরবনে তাঁদের স্ত্রীদের এক সীমাহীন যন্ত্রণাময় বৈধব্য নিয়ে বাকি জীবনটা কাটাতে হয়। এই বৈধব্যের মানসিক যন্ত্রণা অসীম।
বাঘের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে পরিবারপিছু কিছু টাকা-পয়সা পাওয়া যায়, কিন্তু বহু ক্ষেত্রে বহু গ্রামে তাঁদের বিধবা স্ত্রীদের হাতে কোনো টাকা-পয়সা এসে পৌঁছায় না। এরকম নানান অজানা প্রশ্ন সুন্দরবনের বুকে আসলেই অজানাই থেকে যায়। নব্বইয়ের দশকে সুন্দরবনের উন্নয়নের জন্য একটি আলাদা দপ্তর (বা মন্ত্রক) তৈরি করা হয়। আজ সেই মন্ত্রকের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কোনো ধারণাই নেই। তাঁদের উন্নয়নের জন্য কত টাকা আসছে, কোথায় বাঁধ নির্মাণ হবে, কোন খাতে সেই টাকা খরচ হবে—মানুষকে প্রশ্ন করলে তাঁদের কাছে কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। কেউ কোনোদিন এসে তাঁদের উত্তর দিয়ে আলোর পথও দেখায় না।
আসে শুধু গালভরা নাম নিয়ে গড়ে ওঠা শত-সহস্র NGO, যারা কাজকর্ম সেরে, হাতে খাবার বিলি করে সুন্দর সাজিয়ে-গুছিয়ে ছবি তুলে নিয়ে চলে যায়। আর আসে সপ্তাহের শেষে গাদা গাদা ট্যুরিস্টের দল, কাঁধে করে বড় সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে। মদ সহযোগে গান বাজিয়ে চলে উল্লাস। যে প্রান্তে ধ্বংসের পচা গন্ধ বের হয়, তারই অপর প্রান্তে বারবিকিউ আর চিংড়ি ভাজা সহযোগে চলে মদের পার্টি।
রাত শেষ হয়ে দিন হয়, তাঁরাও শহরে ফিরে যান। পেছনে অবসাদ ঘেরা সুন্দরবন হাহাকার নিয়ে পড়ে থাকে।








