ইন্টারনেট বন্ধ, ৪৫ টি এক্সপ্রেস বাতিলককরোচ সমাগম রুখতে কড়া সতর্কতা দিল্লিতে

১৩ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (SIR) প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার অভিযোগে আগামীকাল শনিবার রাজধানীতে এক মেগা ‘ককরোচ-প্রতিবাদ’-এর ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (CJP) ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শুক্রবার রাত থেকেই কার্যত এক নজিরবিহীন সুরক্ষাবলয়ে মুড়ে ফেলা হয়েছে দিল্লির এক বিস্তীর্ণ অংশ। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার যুক্তি দেখিয়ে আন্দোলনস্থল যন্তর মন্তরের চারপাশে ৪ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ জুড়ে সমস্ত মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা ২৪ ঘণ্টার জন্য বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। শুক্রবার রাত ১০টা থেকে শুরু হওয়া এই ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটে অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। পুরো নিউ দিল্লি জেলা জুড়ে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে এবং আন্দোলনকারীদের পূর্বানুমতি না থাকা সত্ত্বেও দিল্লির সীমানায় ২০ হাজারেরও বেশি পুলিশকর্মী ও বিএসএফ জওয়ান মোতায়েন করা হয়েছে।

এই প্রতিবাদ কর্মসূচির ঠিক আগে সাধারণ মানুষের যাতায়াত রুখতে প্রশাসন যে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিল, তা নিয়ে আজ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। পুলিশের আবেদনে সাড়া দিয়ে ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করা এবং দূরপাল্লার বেশ কিছু ট্রেন বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ কড়া মন্তব্য করে বলেন, “মাছি মারতে কেউ হাতুড়ি চালায় না”! শীর্ষ আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানায় যে, নিরাপত্তার নামে আমজনতাকে তাদের মৌলিক যাতায়াত ও যাতায়াতের প্রাথমিক অধিকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করা যায় না। আদালতের এই কড়া বার্তার পর প্রশাসন তার আগের সিদ্ধান্ত কিছুটা শিথিল করে অন্তত ৪৫টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও প্রস্থান পথ আংশিক বন্ধ রেখে বাকি ব্যবস্থা স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রিত রাখার আশ্বাস দিয়েছে, যদিও কনট প্লেস ও চাঁদনি চকের মতো মূল বাণিজ্যিক বাজারগুলি বন্ধই থাকছে।

শুধু তাই নয়, ভোর ৪টা থেকে দুপুর ২টোর মধ্যে প্রায় 45 টি রাজধানী এক্সপ্রেস বাতিল করা হয়েছে। পুরো দিল্লি জুড়ে সমস্ত মদের দোকান বন্ধ থাকার কথাও বলা হয়েছে। দিল্লি পুলিশের সাথে কাল যোগদান করতে চলেছে ২৩,০০০ কেন্দ্রীয় পুলিশকর্মী। পুরো যন্তর মন্তর এলাকা জুড়ে ৩০০ টি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে এবং পুলিশেরা নিজেরাও দেহে ক্যামেরা লাগিয়ে ঘুরতে পারেন তার সম্ভবনাও রয়েছে। নানা মন্দির, মসজিদ থেকে পুলিশ সতর্কতা জারি করে নাগরিকদের প্রতিবাদে সামিল না হওয়ার জন্যে বলবেন দিল্লি পুলিশ। প্রতিবাদ কর্মসূচির আগেই সারা দিল্লি জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এক থমথমে পরিবেশ।

এই ব্যাপক কড়াকড়ি ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্র নেতাদের ওপর নজরদারি চালানো নিয়ে সরব হয়েছে বিরোধী দলগুলি। কংগ্রেসসহ অন্যান্য দল ও এনডিএ জোটের শরিক লোক জনশক্তি পার্টির সাংসদ চিরাগ পাসোয়ানও প্রশ্ন তুলেছেন যে, এভাবে যুবসমাজকে কতদিন পথ আটকে রাখা সম্ভব? নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন যখন রাজপথে আছড়ে পড়ার অপেক্ষায়, তখন সরকারের এই সর্বাত্মক প্রতিরোধ ব্যবস্থা এক বড় রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

একটি সচল ও সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার স্বাধীনতা নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের অংশ। নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা তরুণ প্রজন্মকে আলোচনার টেবিলে না ডেকে, উলটে পুরো রাজধানী অবরুদ্ধ করে ফেলা এবং আধুনিক আইনের অপব্যবহার করে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া এক ভয়াবহ স্বৈরাচারী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

নিরাপত্তার অজুহাতে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের যাতায়াত স্তব্ধ করা এবং ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটের মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদান রুখে দেওয়া আসলে ভিন্নমতকে সম্পূর্ণ গলা টিপে মারার এক সুপরিকল্পিত কৌশল। সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত সময়োপযোগী হস্তক্ষেপ করে রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, ক্ষমতার আস্ফালনে আমজনতার অধিকার হরণ করা যায় না। আমরা কি সাক্ষী হতে চলেছি এক ঐতিহাসিক আন্দোলনের? আগামীই জানাবে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.