বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধ ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প৷ তীব্র অর্থ-সঙ্কটে শিক্ষক,গবেষণা, কর্মীরা

২১ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

চলতি অর্থবর্ষের সাত মাস অতিক্রান্ত। এখনো রিনিউয়াল হয়নি দেশের ২৪টি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি-র অধীনস্থ প্রান্তিক সম্প্রদায় সংক্রান্ত পঠনপাঠন ও গবেষণাভিত্তিক ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পটি। ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ সোশ্যাল ইনক্লুশন ইন ইউনিভার্সিটিস’ (CSSIU) নামক এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি বর্তমানে লাল ফিতের ফাঁসে ঝুলে থাকায় তীব্র আর্থিক সঙ্কটের মুখে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শিক্ষক, গবেষক ও অশিক্ষক কর্মীরা।


২০০৭-৮ সালে তৎকালীন পরিকল্পনা কমিশনের অধীনে চালু হওয়া এই সিএসএসআইইউ (CSSIU) প্রকল্পটি সমাজের দলিত, আদিবাসী এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, সংস্কৃতি ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ পঠনপাঠন ও গবেষণার পথ সুগম করেছিল। বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় এবং টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস (TISS)-এর মতো দেশের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এই প্রকল্পের মাধ্যমে দুই বছরের মাস্টার্স ও পাঁচ বছরের পিএইচডি কোর্স পরিচালিত হয়ে আসছে। অথচ, অর্থবর্ষের শুরুতেই যেখানে প্রকল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার কথা ছিল, সেখানে অক্টোবর মাস পর্যন্ত সরকারের তরফে সাফাই দেওয়া হয়েছে যে প্রস্তাবটি ‘প্রক্রিয়াধীন’ রয়েছে।


প্রকল্পের নবীকরণ আটকে থাকার সরাসরি কোপ পড়েছে শিক্ষক ও গবেষকদের বেতনের ওপর। নিয়মমাফিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার দেরির কারণে বিগত সাত মাস ধরে দেশের ২৪টি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক এবং গবেষক তাঁদের প্রাপ্য বেতন থেকে বঞ্চিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক বা প্রকল্প-নির্ভর পদে কর্মরত গবেষক ও শিক্ষকদের এই অনিশ্চয়তা চরম মানসিক ও আর্থিক সংকটের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। যে গবেষণা বা পঠনপাঠন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্যই ছিল সমাজের অবহেলিত ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বরকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া, সেই ব্যবস্থার সাথে যুক্ত শিক্ষক-গবেষকরাই আজ রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক উপেক্ষার শিকার হয়ে চরম প্রান্তিকতার মুখোমুখি।


সাম্প্রতিক বছরগুলিতে শিক্ষাক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বাজেটের বরাদ্দ এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের কথা বলা হলেও, না বাস্তবায়িত হয় না৷ যখনই সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ, জাতিভেদ প্রথা কিংবা উপজাতীয় জনজীবন সংক্রান্ত সমালোচনামূলক গবেষণার ক্ষেত্রগুলিকে অর্থ সঙ্কটের বেড়াজালে আটকে দেওয়া হয়, তখন তা প্রকারান্তরে সমাজের গণতান্ত্রিক পরিসরকেই সংকুচিত করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমালোচনামূলক চিন্তাধারা এবং সমাজতাত্ত্বিক অনুসন্ধিৎসাকে টিকিয়ে রাখার জন্য যে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন, তা আজ এক প্রকার মুখ থুবড়ে পড়েছে।


শিক্ষা মন্ত্রক এবং ইউজিসি-র এই মনভাব প্রমাণ করে যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং তাদের নিয়ে পঠনপাঠন আজ সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। বার্ষিক পুনর্নবীকরণের এই ত্রুটিপূর্ণ নীতি এমন এক পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে যেখানে প্রকল্পের কাজ বা গবেষণা থেমে নেই, কিন্তু তার বিপরীতে বেতন বা ফান্ডিং বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে—যা একপ্রকার অনানুষ্ঠানিক বাজেট ছেঁটে ফেলার শামিল।


​ভারতের মতো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অভ্যন্তরে এই ধরনের সংকট কেবল শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বা অব্যবস্থাপনার ফল নয়; এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারের প্রশ্নটিকে লঘু করার এক সুপ্ত রাজনৈতিক বার্তা। সিএসএসআইইউ প্রকল্পের অবিলম্বে পুনর্নবীকরণ এবং বকেয়া বেতন পরিশোধ না করলে ভারতের উচ্চশিক্ষার মানচিত্র থেকে সামাজিক অন্তর্ভুক্তির মূল স্তম্ভগুলি চিরতরে ভেঙে পড়ার উপক্রম হবে। প্রশাসনিক উদাসীনতার এই প্রাচীর ভেঙে অবিলম্বে এই সংকট দূর করা এবং শিক্ষা ও গবেষণার গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করাই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও নৈতিক দাবি।

অন্যান্য প্রতিবেদন.