ফের উত্তপ্ত SRFTI, কাঠগড়ায় হিন্দু জাগরণ মঞ্চ

১০ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ ক্রমাগত চড়ছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই কলকাতার স্বনামধন্য কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট’ (SRFTI)-চত্বরে চরম বিশৃঙ্খলা ও সংঘর্ষের পরিস্থিতি আমরা দেখেছি ক’দিন আগেই৷ গতকাল ফের বহিরাগত হামলার শিকার হলো SRFTI।


গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে অল ইন্ডিয়া কনজিউমার পঞ্চায়েত (ABGP) নামক একটি ডানপন্থী সংগঠনের আয়োজিত অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এসআরএফটিআই ক্যাম্পাসের ভেতর প্রথম উত্তেজনা ছড়ায়। ওই সংস্থার দাবি ছিল, তারা বৈধ প্রক্রিয়া মেনেই ইনস্টিটিউটের মূল অডিটোরিয়াম বুক করে অনুষ্ঠান করছিল। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসের ভেতরে বহিরাগতদের এনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি পোস্টার-ব্যানার ছেঁড়া এবং প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে আপত্তিকর স্লোগান দেওয়া হয়। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র মারপিট ও পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীরা মূল গেটে তালা ঝুলিয়ে প্রতিবাদে বসেন।


গত রবিবারের ঘটনার প্রতিবাদে ৪ঠা অক্টোবর প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দেয় “হিন্দু জাগরণ মঞ্চ “৷ অজয়নগর থেকে শুরু হয় মিছিল৷ মিছিল SRFTI এর সামনে এলে ‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চের’ সদস্যেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধ গেট বলপূর্বক খুলে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করে৷ ‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চের’ সদস্যদের সরাসরি বক্তব্য- “রাষ্ট্রবাদীদের শক্তি কেমন, পড়ুয়াদের বুঝিয়ে দিলাম।” পড়ুয়াদের অভিযোগ, ছিঁড়ে ফেলা হয় গেটে টাঙানো অম্বেডকরের পোস্টার । ছোড়া হয় পাথর, ঢিল, বোতল৷ সেখান দিয়ে পেরনোর সময় হিন্দু জাগরণ মঞ্চের হাতে গুরুতর আহত হন প্রেসিডেন্সির এক ছাত্র৷ চলে মারধর৷ বেশ কিছুক্ষণ ধরে অশান্তি চলার পর পরিস্থিতি খানিক নিয়ন্ত্রণে আসে৷ গেটের বাইরে এখনও মোতায়েন রয়েছে পুলিশ।


এই পুরো ঘটনাকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিজেপি এবং সংঘ পরিবারের বিভিন্ন শাখা সংগঠন একে ‘জাতীয়তাবাদী শক্তির অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করার বামপন্থী ও ইসলামীয় চক্রান্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, রাজ্যে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে এবং শিক্ষাঙ্গনগুলিতে ভারতবিরোধী ও অনুদার শক্তির প্রাবল্য বাড়ছে। অন্যদিকে, বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি (যেমন এসএফআই) একে গণতান্ত্রিক ও স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির ওপর রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হিন্দুত্ববাদী শক্তির সুপরিকল্পিত আক্রমণ বলে চিহ্নিত করেছে। তাদের মতে, যাদবপুরের পর এবার সত্যজিৎ রায়ের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে এবং সেখানে গৈরিক মতাদর্শ জোর করে চাপিয়ে দিতে এই ধরণের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে।


অতীতে এসআরএফটিআই এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলিতে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত বিতর্ক থাকলেও, সরাসরি ডানপন্থী বা কট্টর রাজনৈতিক সংগঠনের এই ধরণের আধিপত্য বিস্তার ও তার জেরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের নজির কম।
এসআরএফটিআই-এর গেটের বাইরের এই বিশৃঙ্খলা এবং উত্তপ্ত পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে পশ্চিমবঙ্গ তথা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি আজ রাজনৈতিক ল্যাবরেটরিতে পরিণত হয়েছে। শিল্পের উৎকর্ষ সাধন ও মুক্তচিন্তার চর্চার জন্য পরিচিত এই ধরনের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রবেশ তরুণ প্রজন্মের মেধা ও সৃজনশীলতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা নিয়েও উভয় পক্ষ থেকে প্রশ্ন উঠেছে। যদি এই ধরনের অসহিষ্ণুতা এবং হিংসাত্মক সংস্কৃতি চলতে থাকে, তবে তা কেবল পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থার ভাবমূর্তিকেই ক্ষুণ্ণ করবে না, বরং দেশের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত স্বাধীনতাকেও দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.