ক্যাম্পাসে গ্রাফিতিতে চুনকাম ও রাষ্ট্রের ছায়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়?

একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কয়েকটি অস্বীকার

১৩১ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

আপনি কখনও ভেবে দেখেছেন, বিজেপি ও আরএসএস যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে আক্রমণের কেন্দ্র বস্তু হিসেবে মাঝেমধ্যে বেছে নেয় কেন? যাদবপুর ক্যাম্পাসে কোনও ঘটনা ঘটলেই দক্ষিণপন্থী নেতারা কেন ছাত্রছাত্রীদের দিকে ‘দেশবিরোধী’, ‘মাওবাদী’, ‘দেশদ্রোহী’ কিংবা ‘আরবান নকশাল’ শব্দগুলি ছুড়ে দেন? আবার এবিভিপি কোনও সংঘর্ষে জড়ালেই বিজেপি নেতৃত্ব কেন তৎক্ষণাৎ জানিয়ে দেয়, এবিভিপি তাদের ছাত্রসংগঠন নয়? এমনকি বিজেপি এবিভিপির দায় নিতে ও অস্বীকার করে। সুতরাং এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজলেই যাদবপুর কে ঘিরে সঙ্ঘ পরিবারের রাজনৈতিক কৌশল স্পষ্ট হয়ে যায়।

১৯ আগস্ট রাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র সংসদ ফেটসু একটি সাধারণ সভা ডাকে। এবিভিপি সেই সভার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। প্রথমে বচসা, পরে সংঘর্ষ শুরু হয়। ক্যাম্পাসে ইট-পাথর ছোড়া, আগুন জ্বালানো এবং ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। কয়েকজন ছাত্রকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। এবিভিপি দাবি করে, বামপন্থী ছাত্ররা তাদের সদস্যদের আক্রমণ করেছে এবং জাতপাত তুলে অপমান করেছে। বামপন্থী সংগঠন গুলি পাল্টা অভিযোগ করে, এবিভিপি বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকে হামলা চালিয়েছে।

সিপিএম নেতা সৃজন ভট্টাচার্য দাবি করেন, ফেটসুর সাধারণ সভায় এসএফআইয়ের কোনও সদস্য উপস্থিত ছিলেন না; ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্ররা নিজেদের মধ্যে সভা করছিলেন। তাঁর অভিযোগ, এবিভিপির সদস্যরা প্রথমে সভায় বাধা দেন, পরে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ বহিরাগতদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকেন। এবিভিপি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অতএব রাজনৈতিক প্রচার নয়, তদন্তই সত্য নির্ধারণ করুক। পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করুক, আহতদের চিকিৎসার নথি সংগ্রহ করুক, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নিক এবং বহিরাগতেরা ঢুকে থাকলে তাদের পরিচয় প্রকাশ করুক।

পরদিন এবিভিপি ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি পৃথক কর্মসূচি নেয়। বিক্ষোভ কারীদের একাংশ পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করলে পুলিশ ও র‍্যাফ তাদের সরিয়ে দেয়। সহকারী উপাচার্যের অনুরোধে পুলিশ ক্যাম্পাসে ঢুকে বহিরাগতদের বাইরে পাঠায়। এক ছাত্র এগারো জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান এবং তফসিলি জাতি ও জন জাতির মানুষের বিরুদ্ধে অত্যাচার প্রতিরোধ আইনের ধারা প্রয়োগের আবেদন করেন। তদন্ত এই অভিযোগেরও সত্যতা যাচাই করুক।

এই ঘটনার পরে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ বিজেপির ছাত্রসংগঠন নয়।” সাংগঠনিক সংজ্ঞার বিচারে তিনি ভুল বলেননি। আসল গল্পটিও ঠিক এখানেই লুকিয়ে রয়েছে। এবিভিপি বিজেপির আনুষ্ঠানিক ছাত্রশাখা নয়; সে আরএসএস-অনুপ্রাণিত ছাত্র সংগঠন। বিজেপিও আরএসএস অনুপ্রাণিত রাজনৈতিক দল। অর্থাৎ বিজেপি ও এবিভিপি একই প্রতিষ্ঠান নয়, কিন্তু তারা একই সঙ্ঘ পরিবারের সদস্য এবং একই মতাদর্শের ভিত্তিতে কাজ করে।আরএসএস ছাত্রসমাজে কাজ করার জন্য পৃথক সংগঠন গড়ে তোলে।

এবিভিপি ১৯৪৮ সালে কাজ শুরু করে এবং ১৯৪৯ সালের ৯ জুলাই আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন লাভ করে। পরে আরএসএস-অনুপ্রাণিত কর্মীরা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। ভারতীয় জনসঙ্ঘ নির্বাচনী রাজনীতিতে, ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘ শ্রমিকদের মধ্যে, বিদ্যাভারতী শিক্ষাক্ষেত্রে এবং বনবাসী কল্যাণ আশ্রম আদিবাসী অঞ্চলে কাজ শুরু করে। ভারতীয় জনসঙ্ঘ পরে বিজেপির পূর্বসূরি হয়ে ওঠে।এই ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে? বিজেপি নির্বাচন লড়ে এবং সরকার চালায়। এবিভিপি ছাত্রদের সংগঠিত করে। ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘ শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করে। বিদ্যাভারতী শিক্ষাক্ষেত্রে মতাদর্শ ছড়ায়। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ধর্মীয় পরিসরে সক্রিয় থাকে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আলাদা নাম, নেতৃত্ব ও সদস্যপদ রয়েছে; আরএসএস তাদের মধ্যে মতাদর্শগত সংযোগ ও সমন্বয় গড়ে তোলে।

এই কাঠামো বা এই কৌশল বর্তমানে সঙ্ঘ পরিবারকে ভারতীয় রাজনীতিতে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। এবিভিপির বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ উঠলে বিজেপি বলে, এবিভিপি তাদের সংগঠন নয়। কোনও ধর্মীয় নেতা বিদ্বেষমূলক ভাষণ দিলে বিজেপি জানায়, বক্তা দলের সদস্য নন। কোনও স্বঘোষিত গো-রক্ষক কাউকে আক্রমণ করলে সরকার তাকে বিচ্ছিন্ন অপরাধী বলে চিহ্নিত করে। কোনও সাংস্কৃতিক সংগঠন বই, চলচ্চিত্র বা নাটক বন্ধ করতে চাইলে সরকার বলে, তারা কোনও নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি। সঙ্ঘের বিভিন্ন সংগঠন বিজেপির রাজনৈতিক শক্তি বাড়ায়; কিন্তু অভিযোগ উঠলেই বিজেপি আনুষ্ঠানিক দূরত্ব দেখিয়ে নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা করে।

সঙ্ঘ পরিবারের প্রতিষ্ঠান গুলি নিজেদের কর্মক্ষেত্রে কিছুটা স্বাধীনতা বজায় রাখে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা সাংগঠনিক সম্পর্কহীনতা কে প্রমাণ করে না। আরএসএস ও বিজেপির নেতারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন; আবার সংঘ পরিবার ও তার নিয়ন্ত্রিত অন্যান্য সংগঠনও সরকার এবং, মন্ত্রী ও প্রশাসনের মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখে। তাই ‘আলাদা সংগঠন’ আর ‘সম্পর্কহীন সংগঠন’ এক কথা নয়। প্রথমটিসাংগঠনিক সত্য, দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক অস্বীকার।

এই কৌশল ভারতীয় ফ্যাসিবাদী রাজনীতিকে ইউরোপের ধ্রুপদি ফ্যাসিবাদ থেকে আলাদা চরিত্র দেয়। মুসোলিনির ইতালি এবং হিটলারের জার্মানি দল, নেতা, আধাসামরিক বাহিনী ও রাষ্ট্রকে একটি দৃশ্যমান কেন্দ্রে জড়ো করেছিল। তারা বিরোধী দল নিষিদ্ধ করেছিল, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়েছিল এবং স্বাধীন শ্রমিক সংগঠন ভেঙে দিয়েছিল। ফলে ক্ষমতার কেন্দ্র চিনতে মানুষের অসুবিধা হয়নি।

ভারতে কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি একই পথ হুবহু অনুসরণ করে না। সে সরাসরি সংবিধান বাতিল না করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের চরিত্র বদলায়। নির্বাচন বন্ধ না করে অর্থ, প্রচার ও প্রশাসনিক প্রভাব দিয়ে প্রতিযোগিতাকে অসম করে। সংবাদমাধ্যম বন্ধ না করে সরকারি বিজ্ঞাপন, কর্পোরেট মালিকানা, মামলা ও তদন্তের চাপ ব্যবহার করে। বিরোধী সংগঠন নিষিদ্ধ না করে তাদের ‘দেশবিরোধী’ অথবা ‘জাতীয়তাবিরোধী’ বলে জনসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়। ছাত্র, শ্রমিক, ধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতির জন্য সে পৃথক সংগঠন ব্যবহার করে। এই ব্যবস্থা একদিকে ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করে, অন্যদিকে রাজনৈতিক দায়কে বহু সংগঠনের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়।

তিরিশের দশকের নথি পরীক্ষা করে গবেষকেরা হিন্দু জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ইতালীয় ফ্যাসিবাদের যোগাযোগও দেখিয়েছেন। বি এস মুঞ্জে ইতালি সফর করেন, মুসোলিনির সঙ্গে দেখা করেন এবং যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা দেখে আগ্রহী হন। আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা হিসেবেও মুঞ্জে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে সাভারকর আরএসএসের নেতা ছিলেন না; তিনি হিন্দু মহাসভার সভাপতি ছিলেন। হিন্দু মহাসভা ও আরএসএস একই সংগঠন নয়, কিন্তু তাদের পৃথক পরিচয় হিন্দুত্ববাদী চিন্তার পারস্পরিক সম্পর্ক মুছে দেয় না। এবিভিপি ও বিজেপির সম্পর্ক বিচার করার সময়ও একই যুক্তি প্রযোজ্য।

ফ্যাসিবাদী রাজনীতি প্রথমে জাতির পতনের গল্প বলে। তারপর সে এক অভ্যন্তরীণ শত্রু নির্বাচন করে, পুরনো অপমানের প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং একজন শক্তিশালী নেতাকে জাতির রক্ষক হিসেবে তুলে ধরে। সব শেষে জাতীয় ঐক্যের নামে ভিন্নমত দমন করে। যাদবপুরের ক্ষেত্রে আমরা এই ছকই দেখি। দক্ষিণপন্থী প্রচার প্রথমে যাদবপুরকে ‘দেশবিরোধীদের ঘাঁটি’ বলে দাগিয়ে দেয়। তারপর ক্যাম্পাসের প্রতিটি বিরোধকে ‘জাতীয়তাবাদ বনাম রাষ্ট্রদ্রোহ’-এর লড়াই হিসেবে সাজায়। এই প্রচার যাদবপুর-বিরোধী জনরোষকে রাজনৈতিক পুঁজিতে রূপান্তর করে।

আমরা এও দেখি ফ্যাসিবাদ জাতীয় পুনর্জন্মের এক উগ্র কাহিনি জনগণের সামনে আনে হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি আমাদের শিক্ষা দেয় জাতি একসময় মহান ছিল, বিদেশি চিন্তা ও অভ্যন্তরীণ শত্রুরা তাকে দুর্বল করেছে, এখন এক শক্তিশালী নেতা হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনবেন। কমিউনিস্ট, উদারপন্থী, সংখ্যালঘু, বুদ্ধিজীবী এবং প্রশ্নকারী ছাত্ররা সেই পুনর্জন্মের পথে বাধা—এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করাই তার লক্ষ্য। যাদবপুরকে এই কথিত শত্রুদের প্রতীক বানাতে পারলে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি সহজেই রাজনৈতিক মাইলেজ পাবে। এই বিশ্বাসে সংঘ অবিচল।

এই কারণেই আধুনিক গবেষকেরা বর্তমান ভারতকে সরাসরি হিটলারের জার্মানি বলেন না; বরং বর্তমান ভারতকে অনেকে ‘জাতিসত্তাভিত্তিক গণতন্ত্র’-এর ধারণার সাথে তুলনা করেন। এই ব্যবস্থায় নির্বাচন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান থাকে, কিন্তু রাষ্ট্র সংখ্যাগুরু ধর্মীয় সম্প্রদায়কে জাতির প্রকৃত প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরে। সংখ্যালঘুরা আইনি নাগরিকত্ব বজায় রাখলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক অসমতার মুখোমুখি হন। ধর্মনিরপেক্ষ কর্মী, বুদ্ধিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্বাধীন নাগরিক প্রতিষ্ঠান তখন আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে ওঠে।

তাহলে সঙ্ঘ পরিবার যাদবপুরে কী করতে চায়? উত্তরটি সরল। তারা নিজেদের ছাত্রসংগঠনের শক্তি বাড়াতে চায়, বামপন্থীদের দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে চায় এবং যাদবপুরকে জেএনইউয়ের মতো ‘দেশবিরোধীদের ঘাঁটি’ হিসেবে চিহ্নিত করতে চায়। এই প্রচারের মাধ্যমে তারা বামপন্থী ও উদার নৈতিক চিন্তাকে সন্দেহজনক করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে এবং ক্যাম্পাসে কঠোর প্রশাসনিক ও পুলিশি নিয়ন্ত্রণের পক্ষে জনমত তৈরি করতে চায়।

২০১৯ সালে বাবুল সুপ্রিয়কে ঘিরে সংঘর্ষের পরে এই লক্ষ্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এবিভিপি তখন দাবি করেছিল, ২০১৪ সালে যাদবপুরে ইউনিট তৈরির পরে তারা প্রায় একশো সদস্যের কমিটি গড়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস যাদবপুরকে বাংলায় বিজেপির সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এবং অবশিষ্ট বাম দুর্গগুলির অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

এই রাজনীতির সাংস্কৃতিক স্ববিরোধিতাও কম কৌতূহলোদ্দীপক নয়। বিজেপি নেতা রুদ্রনীল ঘোষ তিতাস নাট্যদলের ‘অগ্নিজল’-এ অভিনয় করেন। নাটকটি গিরিশ কার্নাডের রচনা অবলম্বনে তৈরি। সেই কার্নাডই ২০১৮ সালে গৌরী লঙ্কেশ হত্যার প্রথম বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে গলায় “Me Too Urban Naxal” লেখা প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়েছিলেন। অর্থাৎ যে শিল্পীর প্রতিবাদী পরিচয়কেদক্ষিণপন্থী রাজনীতি ‘আরবান নকশাল’ বলে আক্রমণ করে, তাঁর সৃষ্টির সাংস্কৃতিক মর্যাদা গ্রহণ করতে রুদ্রনীলের আপত্তি নেই। এই দ্বিচারিতা শুধু মাত্র রাজনৈতিক সুবিধাবাদ নয়; এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, স্বাধীন সৃষ্টিশীলতার মোকাবিলা করার মতো নিজস্ব বৌদ্ধিক সম্পদ না থাকলে ক্ষমতা বিরোধীর শিল্প কে ধার করে, অথচ শিল্পীর বিবেক কে অস্বীকার করতে সে দ্বিধা করে না।

তবে বামপন্থীদেরও নিজেদের দুর্বলতা কে স্বীকার করতে হবে। বিভিন্ন বাম সংগঠন অনেক সময় আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আগে তাঁর সাংগঠনিক পরিচয় পরীক্ষা করে। আরএসএস কিন্তু আক্রমণের সময় সিপিএম, নকশালপন্থী, সমাজতন্ত্রী, নারীবাদী, দলিত আন্দোলন কারী কিংবা স্বাধীন মতের ছাত্রের মধ্যে পার্থক্য করে না। তাই বামপন্থীরা মতাদর্শগত পার্থক্য বজায় রেখেই গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক হিংসার বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁড়াক।

ভারতীয় ফ্যাসিবাদকে চিনতে গেলে শুধু স্বস্তিকা, কালো শার্ট অথবা একদলীয় রাষ্ট্র খুঁজলে চলবে না। সে বহু সংগঠন তৈরি করে, প্রত্যেককে আলাদা কাজ দেয় এবং অভিযোগ উঠলেই তাদের সঙ্গে দূরত্ব ঘোষণা করে। সে নির্বাচনে অংশ নেয়, সরকার চালায় এবং একই সঙ্গে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের সংগঠন ছড়ায়। এভাবেই সে ক্ষমতা গ্রহণ করে, অথচ কাজের দায় এড়িয়ে যায়।

অতএব শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্যের উত্তরও স্পষ্ট। এবিভিপি বিজেপির ছাত্রসংগঠন নয়; এবিভিপি আরএসএস-অনুপ্রাণিত ছাত্রসংগঠন। বিজেপিও আরএসএস-অনুপ্রাণিত রাজনৈতিক দল। তারা আলাদা সংগঠন চালায়, কিন্তু একই মতাদর্শের মধ্যে কাজ করে। সাংগঠনিক দূরত্ব রাজনৈতিক সম্পর্ককে বাতিল করে না।

যাদবপুরের ছাত্ররা অন্যায় করলে পুলিশ তদন্ত করুক, বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা নিক এবং আদালত বিচার করুক। একই নিয়ম এবিভিপি, এসএফআই এবং অন্য প্রতিটি সংগঠনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হোক। সরকার ছাত্র সংসদ নির্বাচন করুক। ছাত্ররা ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি বেছে নিন। বিজেপি, এবিভিপি এবং বামপন্থীরা যুক্তি ও নির্বাচনের মাধ্যমে সমর্থন অর্জন করুক।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কোনও একটি দলের পক্ষে দাঁড়ানোর দাবি নয়। এই প্রতিবাদ নাগরিকের সমান অধিকার, আইনের সমান প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক বিরোধিতার স্বাধীনতা দাবি করে। কোনও রাজনৈতিক দল সমগ্র জাতির একমাত্র প্রতিনিধি নয়; কোনও মতাদর্শ নাগরিকত্বের মান নির্ধারণ করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সরকারকে প্রশ্ন করবেন—এটাই গণতন্ত্র। সরকার তথ্য, নীতি ও যুক্তি দিয়ে তাঁদের উত্তর দেবে—এটাই গণতন্ত্র। এই নিয়মের বদলে যে রাজনীতি প্রশ্নকেই অপরাধ বলে, বিশ্ববিদ্যালয়কে শত্রু বলে এবং অস্বীকারকে উত্তর বলে চালায়, তার হাত থেকে যাদবপুরকে নয়—গণতন্ত্রকেই রক্ষা করতে হবে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.