জীবনের গান: জীবনানন্দের কবিতায় মৃত্যু ও রূপান্তর

৩৮ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

কোনো বস্তুর প্রকৃত সত্তা কী তা আমরা জানি না৷ আমরা যা প্রত্যক্ষ করি তা কেবল রূপান্তরের ধারাপাত ৷ আর এই রূপান্তরের যাত্রাই আমাদের নিয়ে যায় ‘অনন্ত রৌদ্রের’ থেকে ‘শাশ্বত রাত্রির’ দিকে৷ আর এই শাশ্বত রাত্রির বুকে ঘটে যায় যে অনন্ত সূর্যোদয় – সেই আবছায়া কুয়াশার কবি জীবনানন্দ দাশ৷ বিক্ষুব্ধ এ পৃথিবীতে জন্মে তিনি বুঝেছিলেন আসলে অধিকাংশ মানব এসেছে পৃথিবীর বীজক্ষেত থেকে, জন্ম দেবে বলে৷ তাই মৃত্যু ছাড়া সৃষ্টি হয়ে ওঠে অর্থহীন৷ জীবনকে আলোড়িত করে আসলে মৃত্যুচেতনা৷ মৃত্যুর নীলাভ মেঘ না থাকলে ফুটে ওঠে না জীবনের কস্তুরি আভার চাঁদ৷

কবি জীবনানন্দ দাশ


১৮৯৯ থেকে ১৯৫৪৷ দীর্ঘ পঞ্চান্ন বছরের জীবনকাল কবিকে দিয়ে গেছে পরাধীনতা, স্বাধীনতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ, উদ্বাস্তু গ্লানি, কর্মসংস্থানহীনতা- “যতদূর দেখা যায় চোখে নির্জন খেতের দিকে চেয়ে দেখি দাঁড়ায়াছে অভিভূত চাষা;”।
জীবনানন্দের কাব্যজগতে তাই বারংবার ফিরে এসেছে মৃত্যু, অবসাদ, ক্লান্তি এবং রাত্রির অন্ধকার। কিন্তু এই মৃত্যুচেতনা কোনো স্থবির নৈরাশ্যবাদ বা পলায়নী প্রবৃত্তিকে ডেকে আনেনি৷ বরং এর ঠিক বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে থেকেছে এক তীব্র, অদম্য জীবনতৃষ্ণা। ​জীবনানন্দের কবিতায় মৃত্যুচেতনা একটি বহুমাত্রিক রূপ লাভ করেছে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত পৃথিবীতে তাই পরিচিত জগতের মধ্যে থেকেই জেগে উঠেছে অস্তিত্বের সংকট৷ কিন্তু, সেই অস্তিত্বের সংকটের গহন থেকেই তিনি তুলে আনলেন জীবনচেতার স্বরুপ৷ জীবনানন্দ লিখলেন-
​”ভালোবাসা দিতে গিয়ে তবু,
দেখেছি আমারই হাতে হয়তো নিহত
ভাই বোন বন্ধু পরিজন পড়ে আছে;
পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন ;.
মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।”

যে জীবনকে পাওয়া যায় ধুলোকাদাময় ভালোবাসায়, সেই ভালোবাসাতেই আবার অশ্বত্থের প্যাঁচার মতন ডুবে যায় আত্মহননকারী বেনো বুড়ির জীবন৷ জীবন-মৃত্যুর এই টানাপোড়েনের মাঝে রয়ে যান কবি৷ মানুষের এই ভ্রান্তির মধ্যেও তিনি দেখতে পান এক করুণ নিঃসঙ্গতা ও ট্র্যাজেডি, যা আদতে মানবজীবনেরই অঙ্গ।


​দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে সভ্যতার সংকটে কবি উপলব্ধি করেছিলেন যে, পৃথিবীর এই ক্ষত কেবল ভৌগোলিক নয়, তা নৈতিক ও আত্মিক। সভ্যতার অমানবিকতা পরতে পরতে মূর্ত করছিল জীবনের ক্ষয়।একদিকে জীবনের গতিজাড্য, অপরদিকে মৃত্যু অবরোধ৷ চেতনার সাথে চেতনার আত্মদ্বন্দ্বের মাঝেই জন্ম নেয় জীবনানন্দের জীবনচেতনা। আত্মহননকে স্বীকৃতি দিয়েও শেষতক কবি বলেন-
“তবুও তো পেঁচা জাগে
গলিত স্থবির ব্যাঙ
আরও দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে”


আসলে পরিস্থিতি মানুষকে যতই পঙ্কিল করুক না কেন, পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ এবং প্রকৃতির আলো-হাওয়ার কাছে সে চিরঋণী। মৃত্যুর হাতছানি সত্ত্বেও এই ঋণ স্বীকার করার মাঝেই রয়ে যায় জীবনের গান৷ কবি প্রশ্ন করেন- “আমাকে কেন জাগাতে চাও?”
জীবনানন্দের লেখায় জীবনের স্বরূপ মূর্ত হয়েছে বিপন্নতায়৷ কখনো বা বিস্ময়ে৷ কিন্তু কখনো তা ব্যর্থ নয়৷ সমস্ত পৃথিবীময় ছড়িয়ে আছে জীবনের ব্যপ্ত অর্থ৷ এই অর্থ অনুসন্ধানই কবির লেখায় জন্ম দেয় মৃত্যুর দৃশ্যকল্প- desire of the instinct possession. জীবনের মজলিশ ক্লান্ত করে৷ মৃত্যুর ছায়াময় বাস্তব এনে দেয় আত্ম আবিষ্কারের অবসর৷ কবি লিখছেন-
” এ কোন সিন্ধুর সুর:
মরণের জীবনের?
এ কি ভোর?
অনন্ত রাত্রির মতো মনে হয় তবু।”

জীবনানন্দ দাশের লেখা পান্ডুলিপির একটি খসড়া

মৃত্যুর ধারাপাত বয়ে নিয়ে চলে মানবজীবন। নীলিমার সীমানা পেরিয়ে এসে থামে জীবনের পথে৷ রয়ে যায় প্রেম স্নেহ ভালোবাসা। কবিও তাই শেষতক কামনা করেছেন এই রূপসী বাংলাকেই৷ দুঃখ, বেদনা ও সংগ্রামের ভেতর দিয়েই জীবনের প্রকৃত রূপ উদ্ভাসিত হয়েছে। মৃত্যুচেতনা রূপান্তরিত হয়েছে জীবনচেতনায়।জীবনানন্দ দাশের কবিতায় মৃত্যু একটি ধ্রুব সত্য হিসেবে উপস্থিত হলেও তা কখনোই শেষ সত্য নয়। অন্ধকার রাত্রি, কুয়াশা, অবসাদ এবং মৃত্যুর মায়াজাল পেরিয়ে জীবনানন্দ এসে বসেছেন সাতটি তারার তিমিরে৷ মৃত মুনিয়া পাখির রক্তলালে মিশে গেছে কিশোরীর আলতা পায়ের ঘুঙুর৷ রোদ্দুরের আলো, ধানসিঁড়ি নদী, বাংলার শস্যক্ষেত পার করে এ জীবন এসে থেমেছে আপামর বাংলার নবান্নের দাওয়ায়, ধান ছড়ানো শিশুর কাছে। আর আমরা সমর্পন করেছি নিজেদের খণ্ড জীবন, এক আশ্চর্য সমগ্রতায়…

​

​

অন্যান্য প্রতিবেদন.