বুকস্টলে ফতোয়া : সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডর তো লাগবেই

২১৯ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন


ইতিহাস এক মজার জিনিস। নিজেকে পুনরাবৃত্ত করার প্রক্রিয়ায় ট্র্যাজেডি থেকে পরিহাসের বিষয় হয়ে ওঠে অনায়াসে। দু’শো বছর আগে এক দাড়িওয়ালা বুড়ো রিফিউজি ইতিহাসের এই ছক খোলসা করে দিয়েছিলেন আমাদের সামনে। বর্তমান বঙ্গের কুনাট্য রঙ্গ দেখতে দেখতে সেই রিফিউজির কথাই মনে পড়ছে বারবার। আরও এক মজা দেখুন, দু’শো বছর পরে পশ্চিমবঙ্গের বহু দশকের শারদোৎসব (শাসকরা যাই বলুন, বাঙালির ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ এটাই বলতে শিখিয়েছেন, তাই শারদোৎসব-ই লিখলাম) রীতি মেনে বুকস্টলের ওপর অধুনা শাসকদের ফরমানের লক্ষ্যবস্তুও সেই অনাদি রিফিউজির লেখালিখি।


 বামপন্থী দলগুলির বুকস্টলের বিরুদ্ধে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের মুখনিঃসৃত অমৃতবাণীর প্রত্যক্ষ পালন শুরু হয়েছে রাজ্যজুড়ে। কাঁচড়াপাড়া থেকে ঢাকুরিয়া, বেহালা থেকে বি-গার্ডেন, বামপন্থীদের বুকস্টল ভাঙার অভিযানে সামিল দ্বেষপ্রেমীরা।

বামপন্থীদের বুকস্টলে ভাঙচুর চালানো হয়েছে


  বুকস্টল ভাঙা প্রসঙ্গে শুরুটা ইতিহাস দিয়ে করলাম কেন? তিন সেকেন্ডে রিল স্ক্রল করা পাঠক নিশ্চিত এতক্ষণে বিজৃম্ভণে আবিষ্ট হয়েছেন। হে পাঠক, ধৈর্যং রহু। দেশ ও দশের (অবশ্য দশ কেন, এগারো-বারো হলেও ক্ষতি নেই; দুর্গা প্রতিমার হাতের মতোই এটাও ক্রমবর্ধমান) কথা বলতে গেলে একটু ভণিতা করাই তো আমাদের আদি সাহিত্যের অকৃত্রিমতা। তাই সহৃদয় পাঠককুলের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী (সাভারকর হিসেবে দাগিয়ে দেবেন না, তার থেকে প্রাণ খুলে গালি দিন, মেনে নেব)।
 ইতিহাসে ফিরি তাহলে। ১৯৩২ সালে জার্মানির সংসদীয় নির্বাচনে ৩২ শতাংশ ভোট পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হয় হিটলারের নাৎসি পার্টি। কাট টু ১৯৩৩ সাল। ৩০ জানুয়ারির হাড় কাঁপানো শীতে দুনিয়ার বুক কাঁপিয়ে জার্মানির চ্যান্সেলার নিযুক্ত হলেন ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা অ্যাডলফ হিটলার। পাঁচ দিনের মাথায় ৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি ফন হিন্ডেনবার্গ একটি অধ্যাদেশ জারি করেন। এই অধ্যাদেশের একটি অধ্যায়জুড়ে মুদ্রণ প্রকাশনাগুলির জন্য নির্দেশিকা তৈরি হয়, এবং ঠিক করে দেওয়া হবে কী ধরণের বই থাকবে বা থাকবে না (এনসিইআরটির ইতিহাস বিনির্মাণের জন্য মুঘল থেকে রবীন্দ্রনাথ সব বাদ, এরকমটা অদেশেও হয়েছিল সেই সময়)। মোদ্দা কথা সেখানে বলা হয়, যেসব প্রকাশনার বিষয়বস্তু জননিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে অথবা শৃঙ্খলাভঙ্গ করবে, সেগুলিকে বাজেয়াপ্ত, ধ্বংস বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে।  


  কাট টু মে মাস। হিটলার ক্ষমতাসীন হওয়ার তিন মাস হয়ে গিয়েছে। নাৎসি মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ ছাত্র সংগঠন ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান স্টুডেন্টস লিগ (এরাই ব্রাউন শার্টস নামে কুখ্যাত) ঘোষণা করল, “রাষ্ট্র দখল হয়ে গিয়েছে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যাল্যগুলি নয়”। আর সেগুলি দখল করার জন্য আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে বই। ঘোষণা করা হয় ‘অ-জার্মান’ সমস্ত রচনাকে ধ্বংস করা হবে। জার্মানি জুড়ে শুরু হলো বহ্নুৎসব।


  ৪ মে বার্লিনে সংগঠিতভাবে শুরু হয় বই পোড়ানো। বই পোড়ানোর নেশায় মাতোয়ারা হয়ে ওঠে নাৎসিরা। বাছাই চলতে থাকে ‘অ-জার্মান’ বই, তৈরি হয় তালিকা। বিভিন্ন গ্রন্থাগার থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত সংরক্ষণে থাকা বই, সবকিছু আহুতি দেওয়া হতে থাকে খাঁটি আর্য রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষায়। ৪ মে বার্লিনে পোড়ানো হয় কার্ল মার্ক্স, ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস, হেলেন কেলার, কাফকার বই। এরপর তালিকা লম্বা হতে শুরু করে। যুক্ত হয়, এইচ জি ওয়েলস, টমাস মান, আইনস্টাইন, জ্যাক লন্ডন, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, অগাস্ট বেবেল, লেনিন, ব্রেখট, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, এরিখ মারিয়া রেমার্ক, এরিখ মুহসাম, কার্ট টুচোলস্কি, কার্ল ফন ওসিয়েৎস্কি, স্টেফান জুইগ, ফ্র্যাঞ্জ ওয়ারফেল, ম্যাক্স ব্রড, লায়ন ফিউখটওয়াঙ্গার প্রমুখ। এঁদের সবাইকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করা হয়।

বার্নিলে বই পোড়ানো হচ্ছে, নাৎসিদের দ্বারা


   ১০ মে সন্ধেটা ছিল মনোরম। সন্ধের ফুরফুরে হাওয়ায়, ফুরফুরে মেজাজেই বার্লিনের অপেরা স্কোয়ারে (বর্তমান বেবেল স্কোয়ার) এক-দুই করে প্রায় চল্লিশ হাজার মানুষ জড়ো হলেন। মশাল হাতে জড়ো হলো ব্রাউন শার্ট পরা স্টুডেন্টস লিগের পাঁচ হাজার কর্মী। সেই সমবেত জনতার বিপুল হু-হুঙ্কারের মধ্যে, সবার মাঝে আলো করে উঠে দাঁড়ায় ঋজু একটি দেহ, যার নাম অল্প কয়েক দিনেই জার্মানি ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে। আড়ালে-আবডালে অনেকেই বলেন, হিটলারের এমন সুহৃদ দ্বিতীয় আর কেউ নেই, আসল মাথাটাও নাকি আদতে তিনিই। প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলস উঠে দাঁড়ালেন, মাইকের সামনে এসে বলে উঠলেন, “অতিরঞ্জিত ইহুদি বুদ্ধিবৃত্তির দিন শেষ। তোমরা ছাত্ররা যদি এই আবর্জনা আগুনে নিক্ষেপ করার অধিকার রাখো, তাহলে এই আবর্জনা সরিয়ে প্রকৃত অর্থে জার্মান সাহিত্যকর্মের জন্য পথ সুগম করার দায়িত্বও তোমাদেরই নিতে হবে।” বিপুল উল্লাসে তৎক্ষণাৎ জ্বালানো হয় আগুন। কুড়ি হাজার বই সেদিন পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল বার্লিনের মাটিতে।

তারপর থেকে জার্মানির প্রায় চৌত্রিশটি শহরে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বই পোড়ানো কর্মসূচি চলতে থাকে। এই কর্মসূচির মূল আয়োজক স্টুডেন্টস লিগ হলেও, সর্বত্র নাৎসি কারিয়াকর্তারাও সামিল হতেন। লম্বা-চওড়া ভাষণ দিতেন বই পোড়ানোর কার্যকারিতা নিয়ে। তারপর জ্বালানো হতো আগুন, আর প্যাপিরাসের উত্তরসূরিরা কয়েক মুহূর্তে ছাই হয়ে যেত।
  ইতিহাসচর্চার এই একঘেয়েমিতে যারা আবারও তিন সেকেন্ডের রিলে ফেরার তোরজোড় করছেন, একটু দাঁড়ান, কিছু রিয়েল কথা বলে নেওয়া যাক। এই যে এত বই পোড়ানোর কথা বললাম, এর থেকে কী প্রমাণ হয়? মূল কথায় আসছি।
 প্রায় একশো বছর আগে যারা বই পুড়িয়েছিল, তাদের দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল আমাদের দেশেও একশো বছর আগে তৈরি হওয়া একটি সংগঠন। হিটলার আর মুসোলিনির নামে জয়ধ্বনি দিয়ে, তারা এদেশেও তাদের সংগঠনকে সাজাতে শুরু করল। হিটলার-মুসোলিনিদের আদর্শকে সেদিন ওরা বাহবা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, সেটাকেই ঘুরিয়ে ভারতীয় মশলা দিয়ে রান্না করে দেশের মানুষকে গিলিয়ে দেওয়ার সংকল্প নিয়েছিল। ব্রাউন শার্টস, ব্ল্যাক শার্টসের আদলে তৈরি করেছিল নিজেদের পোশাকবিধি। নাজি-ফ্যাসিস্টদের প্রশিক্ষণ শিবিরগুলিকে দেখে তৈরি করেছিল নিজেদের শাখা। এখন দেশের ক্ষমতায় বসে ওরা হাফপ্যান্ট থেকে ফুলপ্যান্ট পরতে শিখেছে।
  তারাই আজ বাংলাতেও ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করেছে। বিধানসভা থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হুঙ্কার দিয়েছেন বামপন্থীদের বুকস্টল করতে দেবেন না। আর কে না জানে, ‘রাজা যত বলে, পারিষদগণে বলে তার শতগুণ’। এখানে রাজ পারিষদরা রাজ্যজুড়ে বুকস্টল দেখলেই শুরু করছেন তাণ্ডব। যোগ্য সঙ্গত করছে পুলিশ-প্রশাসন।


  কিন্তু বুকস্টলের ওপর এই আক্রমণ কি নিছকই শাসকের আক্রোশ? মনে হয় না। শাসক তার মতাদর্শিক শত্রুদের বিরুদ্ধে নিজেদের ক্ষমতার অনুশীলনে নেমেছে। তাই বার বার মনে রাখতে হবে, এই উস্কানি এসেছিল সর্বোচ্চ প্রাশাসনিক স্তর থেকে। দশকের পর দশক ধরে বাংলার শারদোৎসবের সঙ্গে সমার্থক হয়ে যাওয়া বুকস্টল রক্ষার লড়াই চলছে শাসক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। একদিকে রাস্তায় ফলে দেওয়া হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতা এমনকী বিবেকানন্দ সম্বন্ধীয় বইপত্র, অন্যদিকে সেগুলো গুছিয়ে আবারও চেষ্টা চলছে বাংলার যা একান্ত, যা তার চিরন্তন, সেই সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার।


  এই প্রসঙ্গেই শুরুটা করেছিলাম প্রায় এক শতক আগে জার্মানির বই পোড়ানোর ইতিহাস দিয়ে। শেষটা করব আরেকজন জার্মান নাট্যকারের লেখা একটি নাটকের সংলাপ দিয়ে। জার্মানিতে যখন বই পোড়াচ্ছে নাৎসিরা, তারও একশো বারো বছর আগে হেইনরিখ হাইনে লিখেছিলেন ‘আলমানসর’ নামে একটি নাটক। সেখানে একটি সংলাপ আছে, “আজ যারা বই পোড়াচ্ছে, একদিন তারা মানুষকেও পোড়াবে”। হাইনের জন্মভূমিতেই বাস্তব হয়ে উঠেছিল এই সংলাপের যথার্থতা। আজ আমার স্বদেশেও কি সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলবে?

অন্যান্য প্রতিবেদন.