মহালয়ার আগে অব্দি বন্ধ রেড রোড! বিজ্ঞপ্তি জারি লালবাজারের

৮ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

পশ্চিমবঙ্গে উৎসব মানেই রাজনীতির নতুন সমীকরণ। সম্প্রতি ইডেন গার্ডেন্সে মহালয়ার একটি বড় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কলকাতার ব্যস্ততম রেড রোড চার দিন প্রয়োজনে বন্ধ রাখার বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে লালবাজার। কলকাতার তরফে জারী করা এই নির্দেশিকাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। একদিকে শারদোৎসবের প্রাক্কালে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগ এবং প্রশাসনিক নীতির দ্বিচারিতা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনেই এখন উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি।


​লালবাজারের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাত থেকে রবিবার ভোর পর্যন্ত প্রয়োজন সাপেক্ষে রেড রোড বন্ধ রাখা হবে। মহালয়ার এই অনুষ্ঠানে ড্রোন শো-সহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় পরিবেশনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। শনিবারের আগে পর্যন্ত অফিস, আদালত, স্কুল ও ব্যাঙ্কগুলি খোলা থাকবে। ফলে রেড রোড বন্ধ থাকলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে পার্শ্ববর্তী রানি রাসমণি অ্যাভিনিউ, জওহরলাল নেহরু রোড, খিদিরপুর রোড এবং ডোরিনা ক্রসিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ চত্বরগুলিতে। ট্র্যাফিক পুলিশ বিকল্প হিসেবে ডাফরিন রোড, উট্রাম রোড বা মেয়ো রোড দিয়ে গাড়ি ঘোরানোর পরিকল্পনা নিলেও, ব্যস্ত কর্মদিবসে অতিরিক্ত গাড়ির চাপ সামলানো যে বড় চ্যালেঞ্জ হবে, তা বলাই বাহুল্য। যদিও প্রশাসনের দাবি, যানজট এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে এবং পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে রেড রোড আংশিক খোলাও রাখা হতে পারে।


​এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিকটি হলো প্রশাসনের নীতিগত দ্বৈততা নিয়ে প্রশ্ন। গত কয়েক মাস ধরে রাজ্যে হকার উচ্ছেদ, ফুটপাতবাসী নিগ্রহ এবং রাস্তার ওপর অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন। রাজ্য সরকারের তরফে বারবার যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধা এবং যানজটমুক্ত পথ সুনিশ্চিত করতেই ফুটপাত ও রাস্তা দখলমুক্ত করা জরুরি। এমনকি, অতীতে ঈদের দিনে রেড রোডে নামাজ পাঠের অনুমতি না দিয়ে ময়দানে স্থানান্তরিত করার নেপথ্যেও যান চলাচলের অসুবিধার কথাই প্রধানত তুলে ধরা হয়েছিল।


​সেখানে দাঁড়িয়ে মহালয়ার অনুষ্ঠানের মতো একটি ইভেন্টের জন্য কলকাতার অন্যতম প্রধান প্রাণকেন্দ্র রেড রোড টানা চার দিন আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তকে অনেকে পক্ষপাতমূলক বলে সমালোচনা করছেন। সমালোচকদের প্রশ্ন, সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির লড়াই বা ধর্মীয় উৎসবের ক্ষেত্রে যদি ‘যান চলাচলের সুবিধা’ প্রধান মাপকাঠি হতে পারে, তবে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মেগা ইভেন্টের ক্ষেত্রে কেন সেই নিয়ম শিথিল হবে? এই ধরনের ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে প্রশাসনিক নীতির নিরপেক্ষতা নিয়ে বড়ো প্রশ্নচিহ্ন তুলছে।


​পরিশেষে বলা যায়, মহালয়া উপলক্ষে রেড রোড বন্ধ রাখার এই ঘটনা নিছকই একটি ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়, বরং এটি প্রশাসনিক অগ্রাধিকার এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক প্রতিচ্ছবি। একদিকে শারদোৎসবের আনন্দ ও সাংস্কৃতিক আড়ম্বর, অন্যদিকে সাধারণ কর্মব্যস্ত মানুষের যন্ত্রণাময় ট্র্যাফিক জ্যাম—এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা প্রশাসনের সামনে এক বড়ো পরীক্ষা। কিন্তু নীতি ও নিয়মের ক্ষেত্রে যদি আমজনতা এবং বিশেষ মহলের জন্য আলাদা মাপকাঠি তৈরি হয়, তবে তা গণতন্ত্র ও সুশাসনের ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। উৎসবের আলোয় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা যেন ঢাকা না পড়ে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

অন্যান্য প্রতিবেদন.