ফ্রান্সজুড়ে চলমান ছাত্র আন্দোলন। এই আন্দোলন বর্তমানে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা পড়ুয়াদের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই।এটি দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সেবাস্তিয়া লেকর্নর সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়সড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। গত মাস থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ফরাসি সমাজের গভীর কাঠামোগত সংকট, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার এক বিস্ফোরক বহিঃপ্রকাশ।
এই গণবিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফরাসি শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা এবং সরকারি নীতির প্রতি তরুণ প্রজন্মের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। আন্দোলনকারীদের প্রধান অভিযোগগুলি হলো- জাতীয় প্রতিরক্ষায় সরকারের বাজেট বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ক্রমশ কমানো হচ্ছে। বিশেষ করে দরিদ্র শহরতলি ও সেন-সাঁ-দেনি অঞ্চলের স্কুলগুলোর পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর এবং ক্লাসরুমে গ্রীষ্মকালীন পর্যাপ্ত ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সে স্কুল চালুর সময় সবচেয়ে বেশি। সপ্তাহে ৩৬ ঘণ্টা স্কুল এবং সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্লাসের চাপ পড়ুয়াদের মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিতর্কিত ‘পারকুরগুপ’ (Parcoursup) অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ব্যবস্থা নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে৷

পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে সরকারের দমনমূলক নীতির কারণে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাজার হাজার পড়ুয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার একটি বড় অংশ নাবালক। আন্দোলন দমাতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও স্টান গ্রেনেডের মতো অস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ। একটি স্টান গ্রেনেডের বিস্ফোরণে ১৫ বছরের এক পড়ুয়ার হাত হারানোর ঘটনা এবং রাবার বুলেটে অন্য এক পড়ুয়ার চোয়াল ভাঙার খবর শোনা যায়৷ যা ফরাসি জনসাধারণকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
এই নির্বিচার পুলিশি হিংসার পরেই শিক্ষক, অভিভাবকসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোও এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। এমনকি ফ্রান্সের গণ্ডি পেরিয়ে বেলজিয়ামের মতো প্রতিবেশী দেশেও এই আন্দোলনের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়া লেকর্নর সরকারের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ফরাসি সংবিধানের মূল মন্ত্র—’সাম্য,মৈত্রী, স্বাধীনতা’—আজ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছে। এই আন্দোলন কেবল কিছু শিক্ষাগত সংস্কারের দাবি নয়, এটি ফরাসি সরকারি পরিষেবাগুলোর চরম সংকট, বাড়তে থাকা সামাজিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রের প্রতি তরুণ প্রজন্মের গভীর অনাস্থার প্রতীক।
যদি লেকর্নর সরকার দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়, তবে ফরাসি রাজনীতিতে বর্তমান প্রশাসনের পতন অবধারিত হয়ে উঠতে পারে।হয়তো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে ফরাসি রাজপথ আবারও রাজনৈতিক পালাবদলের চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।

