নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের মধ্যেই বুধবার দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে জড়ো হলেন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র নেতারা। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলা এই বৈঠকে উপস্থিত ছিল কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিএম-সহ মোট ১৯টি দল। তবে লক্ষণীয় বিষয়, এমকে স্ট্যালিনের ডিএমকে এবং অরবিন্দ কেজরীওয়ালের আপ, এই দুই গুরুত্বপূর্ণ দল বৈঠকে ছিল না। সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদবও সশরীরে ছিলেন না, তবে রাজ্যসভা ভোটের ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে দুই সাংসদকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। শিবসেনা (ইউবিটি)-র উদ্ধব ঠাকরে ও ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন অনলাইনে যোগ দেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে জানান, আগামী ২ থেকে ৮ অক্টোবর দেশজুড়ে জেলা পর্যায়ে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ পদযাত্রা হবে, আর ৬ অক্টোবর সব বিরোধী সাংসদ মিলে নির্বাচন কমিশনের দফতর পর্যন্ত মিছিল করবেন। তাঁর অভিযোগ ছিল স্পষ্ট। নির্বাচন কমিশনকে প্রধানমন্ত্রী মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করছেন, আর কমিশনের ভেতরে দুই-তিনজন আধিকারিক তাঁদের হাতের পুতুলের মতো কাজ করছেন। এছাড়া অক্টোবর-নভেম্বরে পাঁচটি বড় জনসভা এবং ১লা জানুয়ারি দিল্লিতে একটি বড় কর্মসূচির কথাও জানান তিনি। সুপ্রিম কোর্টে চলা এসআইআর সংক্রান্ত মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির আর্জিও জানানো হবে বলে জানান খড়্গে, আর গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগ জানাতে রাষ্ট্রপতির কাছেও সময় চাওয়া হবে।
এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেশ আক্রমণাত্মক ভাষাতেই জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করেন, তাঁকে সরাসরি ‘চোর’ বলে আখ্যা দিয়ে, অবিলম্বে পদত্যাগের দাবি করেন। রাহুল গান্ধী বলেন, গণতন্ত্র কোনো একজন ব্যক্তির চেয়ে অনেক বড়, আর প্রশ্ন তোলেন জ্ঞানেশ কুমার কেন এমন সর্বাত্মক আইনি সুরক্ষা পাচ্ছেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, তিনি নিজে অভিযোগ করছেন না, বরং কমিশনের ভেতরের দুই কমিশনারই অভিযোগ তুলেছেন, তাই তা অর্থহীন হতে পারেনা।
চার দফা দাবিও উঠে এসেছে বৈঠক থেকে – এসআইআরের আগেকার ভোটার তালিকা মেনে ভোট করানো, নাম বাদ দেওয়ার আগে নোটিস দেওয়া, প্রশাসনিক ভুলে বাদ পড়া ভোটারদের আইনি সুরক্ষা, আর ইভিএমের বদলে ব্যালটে ভোট।
এই বৈঠকের ঠিক আগের দিনই কংগ্রেসের ভেতরে একটা অন্য গল্প সামনে আসে। কংগ্রেস কার্যকরী কমিটির বৈঠকে দিগ্বিজয় সিং মন্তব্য করেন, নীতীশ কুমারকে জোট ছাড়তে দেওয়াটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল, তিনি থাকলে হয়তো রাজনৈতিক সমীকরণ অন্যরকম হত। দলের একাংশের মতে, এটা আসলে ভেতরের অনেকেরই মনের কথা। কিন্তু সোনিয়া গান্ধী এই মতের সঙ্গে একমত হননি। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, নীতীশ সঠিক সময়েই জোট ছেড়েছেন, কারণ তিনি বরাবরই বিজেপি-শিবিরের দিকে ঝুঁকে ছিলেন।
পুরো ঘটনাটা দেখে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়, বিরোধীরা এবার সত্যিই একসাথে রাস্তায় নামার চেষ্টা করছে, আর সেটা নেহাত রুটিন প্রতিবাদ নয়, রীতিমতো পরিকল্পিত, দীর্ঘমেয়াদি একটা আন্দোলনের ছক। তবে দুটো জিনিস একটু চোখে লাগছে। প্রথমত, ডিএমকে আর আপের অনুপস্থিতি বলে দেয়, এই ঐক্য এখনও পুরোপুরি নিরেট নয় এবং সবাই একই তালে নাচছে না। দ্বিতীয়ত, কংগ্রেসের ভেতরেই যখন নীতীশ-প্রশ্নে এত ফারাক থেকে যাচ্ছে, তখন প্রশ্ন ওঠে, ২০২৪-এর ভুল থেকে দলটা আদৌ কতটা শিখেছে। আর নির্বাচন কমিশন নিয়ে যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ ঠিকই, কিন্তু শুধু একজন কমিশনারকে সরানোর দাবিতে আটকে থাকলে হয়তো বড় ছবিটা অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার প্রশ্নটা, আড়ালে চলে যেতে পারে।
আর সবচাইতে বড় প্রশ্ন উঠছে এই বিষয়ে, যে আদতেই সমস্ত বিরোধী দলেরা রাহুল গান্ধীকে তাদের সর্বোপরি নেতা বলে মনে করেন কিনা। আজকের বৈঠকেও এটি স্পষ্ট ছিল যে রাহুল গান্ধী পুরো জোটকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিরোধী শিবিরের কতজন এটি চোখ বন্ধ করে মেনে নেবেন? পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি ভিন্ন। সার্বিক ক্ষেত্রে মমতা – রাহুল জোটবদ্ধ হলেও রাজ্যের রাজনীতিতে দুটি দল এক অপরের বিরোধী। এই অসম সমীকরণ বাস্তবের মাটিতে কীভাবে কার্যকর হবে, তা দেখার অপেক্ষায় পুরো দেশ রইল।

