পিতৃতন্ত্র থেকে “আজাদি” স্লোগানে মুখরিত দিল্লির রাজপথ

১৭ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

খোদ দেশের রাজধানীর মসনদে মহিলা মুখ্যমন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও নারী নিরাপত্তা আজ এক বিরাট প্রশ্নচিহ্নের মুখে। সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লিতে একের পর এক নৃশংস ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসার পর ফুঁসে উঠেছে ছাত্রসমাজ। গত বুধবার দিল্লির রাজপথ কাঁপাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (SFI)-এর ডাকে আয়োজিত এক বিশাল ছাত্র মিছিল। ‘বলাৎকার কি সংস্কৃতি সে আজাদি’, ‘পিতৃতন্ত্র সে আজাদি’—এই স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠা এই আন্দোলন কেবল কিছু ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক উদাসীনতার বিরুদ্ধে এক হুঁশিয়ারি।


​চলতি মাসে রাজধানীতে একের পর এক যৌন হিংসার ঘটনা জনমনে গভীর আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। দক্ষিণ দিল্লির আস্থ কুঞ্জ পার্কে ১৭ বছরের এক কিশোরীকে পরপর ধর্ষণের নৃশংস ঘটনা, সদর বাজারের একটি দর্জির দোকানে ১১ বছরের এক ছাত্রীর ওপর নির্যাতন এবং দিল্লি-এনসিআর এলাকায় চলন্ত স্লিপার বাসে উত্তরপ্রদেশের ১৭ বছরের কিশোরীর ওপর দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলি প্রমাণ করে যে নারীদের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে রাজধানী।


​এই ঘটনার প্রতিবাদে দিল্লির কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ছাত্রীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি কলেজ ফর উইমেনের পড়ুয়ারা হাতে পোস্টার নিয়ে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। ​প্রতিবাদ সভায় এসএফআই-এর দিল্লি রাজ্য সভাপতি নাদিয়া এবং যুদ্ধ সম্পাদক মোহনা স্পষ্ট ভাষায় বর্তমান সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। দিল্লির বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে—যেখানে সরকার প্রধান একজন মহিলা—সেখানেও নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের এই চরম ব্যর্থতা রাজনৈতিক মহলে বড় প্রশ্ন তুলেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ছাত্রীদের ওপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ চাপানো, পোশাক নিয়ে পুলিশি নজরদারি চালানো কিংবা রাতে তাঁদের চলাফেরার স্বাধীনতায় কড়াকড়ি করার নীতি কোনো সমাধান নয়। বরং আসল কাজটি হলো সমাজ থেকে ‘ধর্ষণের সংস্কৃতি’ (Rape Culture) নির্মূল করা।

দিল্লির রাজপথে মেয়েদের প্রতিবাদ মিছিল


​বুধবারের এই আন্দোলনে ছাত্রীদের উপস্থিতি ছিল এক ঐতিহাসিক দৃশ্য। দিল্লির সচিবালয়ের সামনে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় বসে পড়ে৷ চালিয়ে যায় বিক্ষোভ৷ এই প্রতিবাদ প্রমাণ করে যে তরুণ প্রজন্ম এখন আর ঘরে বসে প্রতিকূলতা সহ্য করতে নারাজ।​এসএফআই-এর একটি প্রতিনিধিদল দিল্লির পুলিশ প্রধান প্রদীপ তায়ালের সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি জমা দিয়েছে। তার মূল দাবিগুলো অত্যন্ত সময়োপযোগী,যেমন- এফআইআর দায়ের করতে অহেতুক দেরি বরদাস্ত না করে অবিলম্বে কড়া পদক্ষেপ।দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে দোষীদের কঠোরতম শাস্তির ব্যবস্থা করা।শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে ও রাজধানীর রাস্তাগুলোতে পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা এবং আলোর ব্যবস্থা।বাস ও মেট্রোতে কঠোর নিরাপত্তা এবং মহিলাদের জন্য ডেডিকেটেড ‘হেল্প ডেস্ক’ ও নিরাপত্তা সহায়তা কেন্দ্র চালু করা।


আজও যেখানে নারীদের ভোগের বস্তু বা অবদমিত রাখার মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়, সেই সমাজের বুকে দাঁড়িয়ে এই আন্দোলনের স্লোগানগুলি খোদ ‘মনুবাদ’, ‘পিতৃতন্ত্র’ এবং ‘শোষণ’-এর বিরুদ্ধে মুক্তির ডাক দেয়। এটি কেবল অপরাধ দমনের দাবি নয়, সামাজিক বিপ্লবের বার্তা। ​দিল্লির এই ছাত্র আন্দোলন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বসে থাকা সরকারগুলি আজও সাধারণ নাগরিকদের, বিশেষ করে নারীদের জীবন ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে ব্যর্থ হয়েছে।


ছাত্রছাত্রীদের এই প্রতিবাদ নিছক কোনো সাময়িক বিক্ষোভ নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ এবং সমতার সমাজ গঠনের লড়াই। পুলিশি দমনপীড়ন বা প্রশাসনিক উদাসীনতা দিয়ে এই কণ্ঠরোধ করা যাবে না। রাজধানীর রাজপথ থেকে ওঠা এই পরিবর্তনের দাবি আগামী দিনে ভারতের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক নীতি নির্ধারণে এক দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।

অন্যান্য প্রতিবেদন.