স্মৃতি বড়ো অদ্ভুত বিষয়৷ সময় থেকে সময়ান্তরে আবঝা হয়ে যায়৷ সেলুলয়েড কাঁচে রয়ে যায় কিছু দাগ৷ দেরাজ খুললে চোখে মুখে লেপ্টে যায় কেন্দুপাতার গন্ধ৷মায়ের বিয়ের শাড়িতে হাত বোলালে কুঁকড়ে ওঠে পেট৷ দিদার আচারের বয়ামের গায়ে আঁকা থাকে কালসিটে দাগ৷স্মৃতির আসলে নিজস্ব কোনো স্থায়ী ঠিকানা হয় না৷ তা আলতা পায়ের ছাপে ছাপে সঞ্চারিত হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। তেমনই এই নারী জন্ম৷ পাঞ্চালকন্যার খোলা চুল বেয়ে বেয়ে যা নেমে আসে গুজরাট মণিপুর বাংলা প্রদেশ জুড়ে।এযাবৎকাল যতবার মহাভারত পঠিত হয়েছে ততবার শকুনি তার পাশা পাল্টে ফেলেছে৷ সে জানে এক চালে বারবার বাজিমাৎ করা যায় না৷ তাই সত্য অসত্যের বাইরে এসে ভারতবর্ষ দাঁড়িয়ে আছে সাপসিঁড়ি খেলায়৷ যার একপাশে অন্তঃসত্ত্বা গঙ্গা ও অপরপারে শিখন্ডি৷ উত্তরের পাদদেশ থেকে দক্ষিণের কন্যাকুমারিকার দিকে ধাবমান জনকলরব৷ আর সেই কলরবের মাঝে বেঁচে আছে – জবা৷
জবা লোকের বাড়ি ঠিকে কাজ করে৷ বছর চল্লিশ৷ সুঠাম গড়ণ৷ কালো পিঠ৷ মলিন পেট৷ ঝোলা বুক৷
মালিকের ফাইল খুঁজে দিতে সে রাজি নয়৷ তার বদলে আরও খানবারো বাসন সে মেজে দেবে অনায়াসে৷ বকশিসের বড়ো খাই তার৷ শীতের বোনাস পুজোর বোনাস্ বর্ষার ছাতা গরমের গামছা লেগেই থাকে সারা বছর৷ জবা লেডিবার্ডে চড়ে দশ বাড়ি কাজ করে৷ রংচটা ঝনঝনে কেরিয়ারের সিক ভাঙা বিভৎস বেলের শব্দওয়ালা সেকেন্ড হ্যান্ড লেডিবার্ড। জবা একদিন মিঠাইকে বলেছিলো “জানো দিদিমণি আমার স্বপন ছিলো আমি পেলেন উড়াইব”৷ বলে সংকোচ মাখানো এক হাসি আঁচলের খুঁট দিয়ে চেপেচুপে ভিতরে দাবিয়ে দিয়েছিলো সে৷ ঝকঝকে করে সাফ করে দিয়েছিলো সাদাপাথরের মেঝে৷
জবা প্লেন ওড়াতে না পারলেও দুটো ডানা নিশ্চিত রয়েছে জবার৷ লেডিবার্ডের উড়ন্ত জবার বুকে প্রত্যহ এসে নামে শ’য় শ’য় উড়োজাহাজ। নানান রঙের রকমারি। জবার হাতে থাকে উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ। ককপিটে জ্বলে চলে কালো পিঠের মজবুত শিরদাঁড়া। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি যাওয়ার ওই মাঝের মিনিট সাতেক সময় জবা বাঁচে৷ বয়স চল্লিশ৷ কালো পিঠ। মলিন পেট। ঝোলা বুক৷
মাটিতে আঁছড়ে পড়ে তার উড়োজাহাজ৷ কল্পনা চাওলা হওয়া তার হয়না ৷ তবু সে সিন্ধু হতে পারে৷ জবার বুকের ভাঁজ বেয়ে দরদর করে গড়িয়ে পড়ে সিন্ধু নদের ধারা৷ আজ হতে হাজার বছর পর যার তীরে পত্তন ঘটবে পৃথিবীর শেষ সভ্যতার৷ যে সভ্যতা বর্বরতার চুড়ান্ত চিহ্ন রেখে নিশ্চিহ্ন করে দেবে জন্মবৃত্তান্ত, এ পৃথিবীর বুক থেকে। লখাইয়ের দেহ নদীতে ভাসিয়ে কালনাগিনীর সাথে সহবাসে যাবে বেহুলা। শত শত দুর্যোধনের উরু চেরা রক্তে ভেসে যাবে সিন্ধু-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র। ভীম নয়, দুর্যোধনের উরু চিরে রক্তস্নাতা হবে দ্রৌপদী একাই৷ কোনো কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নয়, পাঞ্চালীর চুলের ঝাপটেই টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পরবে হস্তিনাপুরের রাজসিংহাসন৷ গঙ্গা সদর্পে অস্বীকার করবে মহাদেবের বীর্য নিজ যোনিতে ধারণে।
আজ হতে শত বর্ষ পরে কালো মেয়ের কুঞ্চিত বক্ষের ভাঁজ দিয়ে গড়িয়ে পড়বে সিন্ধু নদের ধারা।পত্তন ঘটবে পৃথিবীর শেষ সভ্যতার৷ আইসিসের মূর্তি ভেঙে চুরমার হয়ে তৈরি হবে দ্য লেডিবার্ড৷ বয়স চল্লিশ। সুঠাম গড়ণ। কালো পিঠ । মলিন পেট। ঝোলা বুক৷

