ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই বিহারের হাথুয়া গঞ্জের গোপাল মন্দিরে বেজে ওঠে ঐকতান। এক দিকে আজানের উদাত্ত সুর, অন্য দিকে করতালের তালে ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’৷ আর এই দুইয়ের মাঝখানে ভোরের বাতাসে বাঁশির মায়াবী তান তুলে দাঁড়িয়ে থাকেন বছর সত্তর বয়সের সাগির আনসারি।
ঠাকুরদার কাছে হাতেখড়ি নেওয়া সাগির শৈশব থেকেই সুরকে নিজের ধর্ম মেনে নিয়েছিলেন। দেশ-গাঁ ছেড়ে মেলায় মেলায় বাঁশি বিক্রি ও বাজানোর হাত ধরেই তাঁর পথচলা শুরু হয়। ২০১৫ সালে দৈনিক হিন্দুস্থান পত্রিকায় তাঁর বাঁশিবাদনের প্রশংসা পড়ে হাথুয়া রাজবাড়ির থেকে আমন্ত্রণ পান তিনি৷ গোপাল মন্দিরের ভজন-কীর্তনে বাঁশি বাজাতে শুরু করেনসাগির যখন মন্দির চত্বরে মাগরিবের নামাজ পড়তেন, তখন এক চৌকিদার নালিশ নিয়ে মহারাজের দরবারে যান। কিন্তু তৎকালীন মহারাজের প্রতিক্রিয়া ছিল আজকের দিনে এক পরম শিক্ষা, তিনি বলেন—”ও কি আমার জমি খুঁড়ে কিছু তুলে নিয়ে যাচ্ছে নাকি? কারও কোনো ক্ষতি করছে? না হলে নালিশ কিসের?” এই একটি বাক্য প্রমাণ করে, সেদিন ধর্ম পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের শিল্প ও বিশ্বাসকে সম্মান জানানোর এক আবহ টিকে ছিল।

হাথুয়ার এই মধুর ঐকতান আজ এক আক্রান্ত সময়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। নতুন প্রজন্মের তরুণদের চোখে আজ আর সাগির আনসারির শৈশবের হাথুয়া ধরা পড়ে না। গত এক দশকে হাথুয়া গঞ্জের জনবিন্যাসে ৪৩ শতাংশ মুসলিম এবং ৫৬ শতাংশ হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাতের মাঝে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য দূরত্ব।
এই দূরত্ব হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এটি গত ১০-১৫ বছরের ভারতীয় রাজনীতির মেরুকরণের সরাসরি ফসল। রাজনৈতিক স্বার্থে যখন ধর্মকে অস্ত্র করা হয়, তখন তা কেবল ভোটের বাক্সে প্রভাব ফেলে না, বরং তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাপন, সংস্কৃতি এবং সহাবস্থানের শিকড়কেও দুর্বল করে দেয়। যে হাথুয়া রাজপরিবার একদিন জাত-ধর্মের গণ্ডী পেরিয়ে একজন মুসলিম শিল্পীকে মন্দিরের ঐতিহ্যের অঙ্গ করে নিয়েছিল, আজ সেই একই ভূমিতে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্ম মেরুকরণের রাজনীতির বিষবাষ্পে আক্রান্ত।
সাগির আনসারির বাঁশি আজ শুধু একটি বাদ্যযন্ত্র নয়, এটি একাকী লড়ে যাওয়া ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির প্রতীক। হাথুয়ার গোপাল মন্দিরের ভোরের বাতাস আজও সাগির আনসারির বাঁশির সুরে কেঁপে ওঠে। সাগির আনসারির বাঁশি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এখনও সময় আছে ঘৃণার রাজনীতিকে অস্বীকার করে আবার সেই উদার হাথুয়াকে ফিরিয়ে আনার, যেখানে মহারাজের মতো বলা যায়—”কারও কোনো ক্ষতি তো করছে না!”

