ভানওয়ারি দেবী মামলা এবং ভারতের নারী অধিকার আন্দোলনের রূপান্তর

১০ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

ভারতের নারী অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে রাজস্থানের গ্রামীণ নারী ভানওয়ারি দেবীর নাম এক লড়াকু সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। ১৯৯২ সালে রাজস্থানের ভাতেরি গ্রামে একজন সাধারণ সমাজকর্মী ও ‘সাথীন’ হিসেবে কাজ করার সময় তাঁর ওপর নেমে আসা নৃশংস নির্যাতন এবং পরবর্তী আইনি লড়াই কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ছিল না। এটি ছিল ভারতের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, গ্রামীণ ক্ষমতার রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার এক নির্মম দলিল। এই একটিমাত্র ঘটনা ভারতের বিচারব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের সুরক্ষার জন্য যুগান্তকারী ‘বিশাখা গাইডলাইন’ ও পরবর্তীতে কঠোর আইন তৈরিতে বাধ্য করেছিল।


ভারতের গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় জাতপাত, পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবের শিকড় কতটা গভীর, ভানওয়ারি দেবীর ঘটনা তার এক জীবন্ত উদাহরণ। ১৯৯২ সালে রাজস্থানের ভাতেরি গ্রামে সরকারের নারী উন্নয়ন কর্মসূচির আওতাধীন ‘সাথীন’ হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ভানওয়ারি দেবী একটি প্রভাবশালী উচ্চবর্ণের পরিবারে ৯ মাস বয়সি এক শিশুর বাল্যবিবাহ রোধ করেন। গ্রামীণ সমাজে উচ্চবর্ণের পুরুষদের নীতিনির্ধারক ও ক্ষমতার মূল কেন্দ্র হিসেবে দেখার যে চিরাচরিত ধারণা, তা এক গ্রামীণ দলিত বা প্রান্তিক নারী দ্বারা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এই বাল্যবিবাহ রোধের ঘটনাটি কেবল একটি সামাজিক অপরাধ ঠেকানো ছিল না, বরং এটি ছিল স্থানীয় সামন্ততান্ত্রিক ও পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার মোড়লের মুখে এক সরাসরি চপেটাঘাত।

এর জেরে প্রভাবশালীরা ভানওয়ারি দেবীকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করে এবং চরম প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করে। প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে ওঠা উচ্চবর্ণের অপরাধীরা ১৯৯২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ভানওয়ারি দেবীর ওপর পৈশাচিক হামলা চালায় এবং তাঁর স্বামীর সামনে তাঁকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পর শুরু হয় বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনের দীর্ঘতর প্রহসন। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন প্রভাবশালীদের চাপে শুরুতে এফআইআর নিতে গড়িমসি করে। বিচার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরেও ক্ষমতার দীর্ঘ ছায়া স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিচারিক আদালত পর্যাপ্ত প্রমাণের অজুহাতে বা রাজনৈতিক প্রভাবে অভিযুক্তদের ধর্ষণ মামলা থেকে খালাস দিয়ে লঘু অপরাধে নামমাত্র সাজা দেয়।

ভানওয়ারি দেবী

বিচারকের এই পক্ষপাতদুষ্ট ও সংবেদনহীন রায় গোটা দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দেয় এবং স্পষ্ট করে তোলে যে, প্রান্তিক ও সাধারণ নারীদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা কতটা ঠুনকো।
স্থানীয় আদালতের সেই লজ্জাজনক রায়ের বিরুদ্ধে রাজস্থানসহ সারা দেশের নারী সংগঠনগুলো ফুঁসে ওঠে। প্রবল জনমতের চাপে এবং এনজিও ‘বিশাখা’ ও অন্যান্য সংগঠনের দায়ের করা জনস্বার্থ মামলার (PIL) প্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায় দেয়। সুপ্রিম কোর্ট কর্মক্ষেত্রে নারীদের যৌন হয়রানি রোধে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা ‘বিশাখা গাইডলাইন’ (Vishakha Guidelines) জারি করে।


​এই নির্দেশিকা ছিল ভারতীয় বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক মাইলফলক। এটি কেবল কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাবকেই স্বীকার করেনি, বরং নিয়োগকর্তাদের ওপর আইনি দায়ভারও চাপিয়ে দিয়েছিল। এই গাইডলাইনের পথ ধরেই দীর্ঘ ১৬ বছর পর ২০১৩ সালে প্রণীত হয় ‘কর্মক্ষেত্রে নারীদের যৌন হয়রানি (প্রতিরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও প্রতিকার) আইন’। সুতরাং, ভানওয়ারি দেবীর ব্যক্তিগত সংগ্রাম ও অবর্ণনীয় যন্ত্রণা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে সমগ্র ভারতীয় কর্মজীবী নারীর সাংবিধানিক সুরক্ষার ঢাল হয়ে ওঠে।


ভানওয়ারি দেবী মামলার রাজনৈতিক মাত্রা আরও গভীর রূপ লাভ করে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। রাজস্থানের যোধপুর থেকে তাঁর রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে এক তীব্র ভূকম্পন সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (CBI) বা সিবিআই-এর তদন্তে যে তথ্য বেরিয়ে আসে, তা তৎকালীন রাজনৈতিক ব্যবস্থার পচনশীল রূপকে উন্মোচন করে।
​তদন্তে প্রকাশ পায় যে স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, কিছু আপত্তিকর ভিডিও ক্লিপ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের জেরে ভানওয়ারি দেবীকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে সরাসরি নাম জড়িয়ে পড়ে তৎকালীন রাজস্থান সরকারের এক মন্ত্রী এবং এক শাসকদলীয় বিধায়কের। ঘটনাটি প্রমাণ করে যে অপরাধ জগতের সাথে রাজনীতির অপরাধমূলক আঁতাত কতটা প্রবল হতে পারে। একজন সাধারণ নারী যখন ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে নিজের অধিকার বা বার্গেনিং পাওয়ার ব্যবহার করতে যান, তখন তাঁকে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক মেশিনারিজের মাধ্যমে কীভাবে নিশ্চুপ করে দেওয়া হয়, ভানওয়ারি দেবীর নিখোঁজ ও হত্যা মামলা তার এক কলঙ্কজনক উদাহরণ।


ভানওয়ারি দেবীর জীবন ও সংগ্রাম ভারতীয় রাজনীতির একটি অন্ধকার ও একই সাথে রূপান্তরকারী অধ্যায়। একদিকে যেমন এটি ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং নারীদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতার নগ্ন রূপ দেখিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি এটি প্রমাণ করেছে যে সংঘবদ্ধ নারী আন্দোলন এবং আইনি লড়াই কীভাবে রাষ্ট্রকে আইন পরিবর্তন করতে বাধ্য করতে পারে। ভানওয়ারি দেবীর আত্মত্যাগ ও দীর্ঘ লড়াই ভারতের কর্মজীবী নারীদের জন্য সুরক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। কিন্তু একই সাথে এই মামলা ভারতীয় গণতন্ত্র ও বিচারব্যবস্থার সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে গেছে, যার উত্তর আজও খোঁজে দেশের প্রান্তিক ও নিপীড়নবিরোধী জনতা।

অন্যান্য প্রতিবেদন.