অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রেফতারি এবং গুগল এলগরিদম

৮২ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি চর্চিত এব বিষয় হলো—তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রেফতারির জল্পনা। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার বহু আগে থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে বিরোধী শিবির, বিশেষ করে শুভেন্দু অধিকারীসহ একাধিক বিজেপি নেতার মুখে নিয়মিত শোনা গেছে যে, “এবার অভিষেক গ্রেফতার হচ্ছেন।” ইউটিউবে এমন হাজার হাজার ভিডিও এবং গুগলে অজস্র প্রতিবেদন বা মতামত ছড়িয়ে রয়েছে, যেখানে নিশ্চিত করে দাবি করা হয়েছে যে তাঁর কারাবাস কেবল সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এই ধরনের ঘটনা ঘটেনি। এই দীর্ঘমেয়াদি জল্পনা কি নেহাতই রাজনৈতিক কৌশল, নাকি এর পেছনে রয়েছে এক লাভজনক ডিজিটাল অর্থনীতির চাকা?

​রাজনীতিতে স্নায়ুযুদ্ধ বা পারসেপশন গেম অত্যন্ত শক্তিশালী একটি হাতিয়ার। বিরোধী দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য থাকে সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা গেঁথে দেওয়া যে শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব দুর্নীতিতে জর্জরিত এবং আইন তাদের ওপর যে কোনো মুহূর্তে খড়্গহস্ত হতে পারে।
​
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো হাই-প্রোফাইল নেতাকে কেন্দ্র করে গ্রেফতারির জিগির তোলা হলে দলীয় কর্মীদের মনোবল ভাঙা সহজ হয় এবং সাধারণ ভোটারদের মনে নেতিবাচক ধারণার বীজ বপন করা যায়।
তদন্তকারী সংস্থা যেমন সিবিআই (CBI) বা ইডি (ED) বিভিন্ন সময়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, নোটিশ পাঠিয়েছে—যা আইনি প্রক্রিয়ারই অংশ। কিন্তু রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে সেগুলোকে অতিরঞ্জিত করে সরাসরি ‘গ্রেফতারির দিনক্ষণ’ হিসেবে প্রচার করা হয়। আদালত বারবার বিভিন্ন মামলায় রক্ষাকবচ দিলেও রাজনৈতিক বয়ানে সেই আইনি সূক্ষ্মতাগুলো বাদ দিয়েই চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করে দেওয়া হয়।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়


​
​বর্তমান যুগ ডেটা এবং মনোযোগের (Attention Economy)। এখানেই প্রবেশ করে ইউটিউব ও গুগলের অ্যালগরিদম। এই টেক জায়ান্টগুলোর অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি, যা মানুষের কৌতূহল এবং আবেগকে উসকে দেয় এমন কনটেন্টকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।
​ “আজই গ্রেফতার অভিষেক!”, “খাস কলকাতার পথে পুলিশ ঘেরাও”—এই ধরণের চটকদার শিরোনাম এবং এডিট করা ছবিযুক্ত থাম্বনেইল সাধারণ মানুষের আঙুলকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিওতে ক্লিক করতে বাধ্য করে।
​সন্ধ্যাবেলা কাজের শেষে যখন সাধারণ মানুষ একটু অবসর পান, তখন এই ধরনের সংবেদনশীল রাজনৈতিক শিরোনাম তাঁদের দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের সামনে আটকে রাখে। যত বেশি ভিউ, তত বেশি বিজ্ঞাপন এবং ইউটিউব থেকে দেদার রোজগার। কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং ইউটিউব চ্যানেলগুলোর কাছে এটি এক ধরণের লাভজনক ব্যবসা, যার বাস্তব সত্যতার সঙ্গে দূরদূরান্তের কোনো সম্পর্ক নেই।

​যদি আইনি বা বাস্তব পরিস্থিতির মূল্যায়ন করা হয়, তবে দেখা যাবে যে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা তাঁদের আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে উচ্চ আদালত থেকে বিভিন্ন সময়ে সুরক্ষা পেয়ে এসেছেন। ভারতের বিচারব্যবস্থায় কোনো অভিযুক্তকে অপরাধী সাব্যস্ত না করা পর্যন্ত এবং আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ ও পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ না মিললে পুলিশ চাইলেই কোনো সাংসদ বা প্রভাবশালী নেতাকে ইচ্ছেমতো গ্রেফতার করতে পারে না। কলকাতা হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে বহুবার আইনি প্রক্রিয়া মেনে চলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক ময়দানের কথামতো যে গ্রেফতারি রাতারাতি সম্ভব নয়, তা আইনজ্ঞ মাত্রেই জানেন।

​অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রেফতারি সংক্রান্ত নিয়মিত চর্চা মূলত দুই মেরুর মিশ্রণ। একদিকে এটি রাজনৈতিক শিবিরের বিরোধীদের এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক কৌশল, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের ভোটারদের চাঙ্গা রাখে; অন্যদিকে এটি ডিজিটাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে তৈরি হওয়া এক অসত্য উত্তেজনার বাজার। সন্ধের চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে যে হাজার হাজার মানুষ এই ভিডিওগুলো দেখেন, তার বড় অংশই রাজনৈতিক সত্যের চেয়ে ইউটিউবের লভ্যাংশ বা ভিউ বাড়ানোর নিখুঁত কারসাজি।
​

অন্যান্য প্রতিবেদন.