২৬ হাজার শিক্ষক পদে নিয়োগ সম্পন্ন করতে সুপ্রিম কোর্টের কাছে বাড়তি সময়ের আর্জি জানাচ্ছে রাজ্য সরকার ও স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি)। শীর্ষ আদালতের বেঁধে দেওয়া বর্ধিত মেয়াদ ফুরোচ্ছে আগামী সোমবার। কিন্তু কমিশনের বক্তব্য, পরীক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়ভিত্তিক একাধিক অভিযোগ তাদের কাছে জমা পড়েছে, যেগুলি খতিয়ে দেখার কাজ এখনও চলছে। এই কারণেই নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে তারা আগামী বছরের ৩১ মে পর্যন্ত সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে। সোমবারই বিচারপতি সঞ্জয় কুমার ও সচিন সচদেবার বেঞ্চে এই আবেদনের শুনানি হওয়ার কথা।
উল্লেখ্য, আগের তৃণমূল সরকারের সময়ে এসএসসি নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর সুপ্রিম কোর্ট গোটা ২০১৬ সালের নিয়োগ প্যানেলই খারিজ করে দিয়েছিল এবং নতুন করে গোটা প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশ দিয়েছিল। সেই নির্দেশ মেনেই গত বছর সেপ্টেম্বরে ৪৪টি বিষয়ে ফের পরীক্ষা নেওয়া হয়। কমিশনের দাবি, পরীক্ষার উত্তরপত্র প্রকাশের পর প্রায় ১ লক্ষ ২৯ হাজার বিষয়ভিত্তিক আপত্তি জমা পড়ে, যা যাচাইয়ের জন্য আলাদা একটি পর্যালোচনা কমিটি তৈরি করতে হয়েছে। এছাড়া পাঁচ লক্ষেরও বেশি ওএমআর শিট স্ক্যান করাতেও প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দেয়, ফলে সেগুলি তিনবার করে স্ক্যান করাতে হয়েছে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
সময় চাওয়ার পেছনে আরও কিছু প্রশাসনিক জটিলতার কথাও তুলে ধরেছে কমিশন। বিধানসভা ভোটের আগে যাঁরা কমিশনের চেয়ারম্যান পদে এবং পাঁচটি জ়োনের দায়িত্বে ছিলেন, ভোট মিটতেই তাঁরা পদ ছেড়ে দেন। এতে নিয়োগ-সংক্রান্ত কাজে ছেদ পড়ে বলে কমিশনের অভিমত। পাশাপাশি ওবিসি সংরক্ষণ নীতি নিয়ে পুরনো ও নতুন সরকারের অবস্থানগত ফারাকও একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, আগের সরকারের নীতি মেনেই তারা কাজ শুরু করেছিল, তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে কীভাবে এগোনো উচিত, সে বিষয়ে রাজ্যের কাছে দিকনির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
এই জটিলতা আরও বেড়েছে সম্প্রতি কলকাতা হাই কোর্টের একটি রায়ে। বিচারপতি রাজাশেখর মান্থার বেঞ্চ তৃণমূল আমলে তৈরি নতুন নিয়মের সব ওবিসি শংসাপত্র বাতিল ঘোষণা করে জানিয়েছে, ওবিসি-এ ও ওবিসি-বি, এই বিভাজন আর কার্যকর নেই, ফলে ওই শংসাপত্রধারীরা এখন থেকে সাধারণ শ্রেণির প্রার্থী হিসেবেই গণ্য হবেন। আদালতের এই নির্দেশের প্রেক্ষিতে ঠিক কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা স্থির করতেও কমিশনের বাড়তি সময় প্রয়োজন।
গত বছরের পরীক্ষায় নবম-দশম স্তরে প্রায় ২ লক্ষ ৯৩ হাজার এবং একাদশ-দ্বাদশ স্তরে প্রায় ২ লক্ষ ২৯ হাজার পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, একাদশ-দ্বাদশের ক্ষেত্রে প্যানেল ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে এবং ৩৩টি বিষয়ের মধ্যে ২১টিতে কাউন্সেলিং সম্পন্ন হয়েছে। এই স্তরে ৩,৫৮৬ জন প্রার্থীর নাম নিয়োগের জন্য পর্ষদের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। নবম-দশম স্তরের ইন্টারভিউ তালিকাও প্রস্তুত হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
বঞ্চিত প্রার্থীদের একাংশের হয়ে লড়া আইনজীবী ফিরদৌস শামিম প্রতিক্রিয়ায় বলেন, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যেই যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে এবং তিনি চান, দ্রুত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ নিশ্চিত করা হোক।
কার্যত প্রশ্ন উঠছে যে এটা শুধুমাত্রই একটি প্রশাসনিক জটিলতা নাকি একের পর এক কাঠামোগত সমস্যার পুঞ্জীভূত ফল? দুর্নীতির পুরনো দায়, আদালতের কড়া অবস্থান, আর রাজ্য সরকারের নীতিগত পরিবর্তন একসঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে প্রক্রিয়াটাকে বারবার থামিয়ে দিচ্ছে কি? এই চক্র আর কতদিন চলবে সে নিয়ে প্রশ্ন জাগছে সাধারণ মানুষের মধ্যেও। এর সবচেয়ে বড় খেসারত দিচ্ছেন সেই শিক্ষকরা, যাঁদের চাকরি আটকে আছে বছরের পর বছর, আর যাঁদের কেউ কেউ এই অনিশ্চয়তার চাপ সহ্য করতে না পেরে তার চরম মূল্যও দিয়েছেন। এমনভাবে, কতকাল অনিশ্চিত থাকবে বাংলার তরুণদের ভবিষ্যৎ?

