ভারতীয় রাজনীতিতে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ এবং তাদের মৌলিক সমস্যাগুলোকে মূলধারার রাজনৈতিক এজেন্ডার কেন্দ্রে নিয়ে আসার প্রচেষ্টায় সাম্প্রতিক সময়ে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর উদ্যোগে আয়োজিত ‘ছাত্রোঁ কি গূঞ্জ’ (Chhatron Ki Goonj) কর্মসূচি। উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজের পর মহারাষ্ট্রের পুনে শহরে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচির নারী-বিশেষ সংস্করণটি এক ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে। এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন জেন-জি প্রজন্মের দৃষ্টিহীন বা শারীরিকভাবে সক্ষমতায় ভিন্নধর্মী তরুণী ও ছাত্রীরা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তার অভাব, পরিকাঠামোগত অসাম্য এবং সামাজিক বৈষম্যের কথা তুলে ধরেন, তখন তা কেবল কিছু ব্যক্তিগত আক্ষেপের প্রকাশ থাকে না; বরং এটি ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা ও নীতিনির্ধারকদের সামনে এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক আয়না হিসেবে প্রতিভাত হয়।
পুনের এই বিশেষ সমাবেশে দৃষ্টিহীন তরুণী ও ছাত্রীরা যেভাবে নিজেদের জীবনের প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরেছেন, তা বর্তমান সমাজের মূলধারার উন্নয়ন ও অগ্রগতির দাবিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে শহরায়ন ও ডিজিটাইজেশনের কথা বলা হলেও, সাধারণ স্তরে শারীরিক ও দৃষ্টিশক্তিহীন তরুণীদের জন্য গণপরিবহন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং জনবহুল রাস্তাঘাট কতটা অনিরাপদ ও অপ্রতুল, তার জীবন্ত দলিল ছিল এই আলোচনা।
তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, দৈনন্দিন জীবন যাপনে চলাফেরা করার স্বাধীনতা বা ব্রেইল মাধ্যমের বাইরে আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা আজও প্রান্তিক মানুষের নাগালে পৌঁছয়নি। জেন-জি প্রজন্মের এই তরুণীরা কেবল সুযোগ-সুবিধার অভাবের কথাই বলেননি, তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন কাঠামোগত সমতা এবং সামাজিক মানসিকতা নিয়েও। একজন নারী হিসেবে চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং তার ওপর শারীরিক প্রতিবন্ধকতা—এই দ্বিমুখী জাঁতাকলে তাঁদের যে দৈনন্দিন লড়াই চালাতে হয়, তা মূলধারার রাজনীতিতে দীর্ঘকাল উপেক্ষিত থেকেছে।
রাহুল গান্ধীর এই আউটরিচ প্রোগ্রাম বা গণ-সংযোগ কর্মসূচির মূল লক্ষ্যই ছিল তরুণ সমাজের ক্ষোভ, হতাশা এবং আকাঙ্ক্ষাকে সরাসরি রাজনৈতিক পরিসরে স্থান দেওয়া। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে তরুণী ও ছাত্রীদের ওপর দমনপীড়ন বা সামাজিক হেনস্থার অভিযোগ তুলে ধরে বিরোধী নেতৃত্ব বারবার জেন-জি ভোটারদের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন যে, তাঁদের কণ্ঠস্বরকে চেপে রাখা যাবে না।
পুনের মঞ্চে দৃষ্টিহীন তরুণীদের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, এই আন্দোলন কেবল সাধারণ ছাত্ররাজনীতির গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এতে সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা ও প্রান্তিক অংশের মানুষেরা অংশ নিচ্ছেন। রাজনীতিতে প্রায়শই যে ‘ইনক্লুসিভিটি’ বা সর্বাত্মক অন্তর্ভুক্তির কথা তাত্ত্বিকভাবে বলা হয়, এই অনুষ্ঠানটি তার একটি বাস্তব প্রতিফলন ঘটানোর প্রয়াস হিসেবে সামনে এসেছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগের পরিবেশ তৈরি করা, গণপরিবহনকে সহজলভ্য করা এবং পাবলিক প্লেসে জেন্ডার-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এগুলো কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং মৌলিক অধিকার।
যখন জেন-জি তরুণীরা জনসমক্ষে এই মৌলিক অধিকারগুলোর জন্য লড়াইয়ের কথা বলেন, তখন তা সরকারের প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর সরাসরি প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করে। উন্নয়নের বড় বড় স্লোগান ও বিজ্ঞাপনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাস্তব চিত্রগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে কতখানি জায়গা করে নেবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তাত্ত্বিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
জেন-জি প্রজন্ম এখন আর গতানুগতিক রাজনৈতিক স্লোগান বা ফাঁকা আশ্বাসে সন্তুষ্ট নয়। তাঁরা নিজেদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার আলোকে নীতি পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছেন। দৃষ্টিহীন তরুণীদের এই সরব হওয়া সমাজ এবং রাষ্ট্র—উভয়ের পক্ষ থেকেই এক বিরাট ঝাঁকুনি। সমাজে এখনও প্রতিবন্ধকতা এবং নারী নিরাপত্তাকে যেভাবে করুণা বা কেবল আইন-শৃঙ্খলার চশমা দিয়ে দেখা হয়, এই তরুণীরা সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর দাবি তুলেছেন।
পুনের ‘ছাত্রোঁ কি গূঞ্জ’ অনুষ্ঠানে দৃষ্টিহীন জেন-জি তরুণীদের এই অংশগ্রহণ ভারতীয় রাজনীতির পরিসরে এক নতুন রাজনৈতিক ব্যাকরণ রচনা করছে। এটি কেবল বর্তমান শাসক দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং এটি দেশের প্রতিটি নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক দলের জন্য একটি আত্মমূল্যায়নের সময়। যখন প্রান্তিক তরুণীরা তাঁদের নিরাপত্তা, অধিকার এবং সমতার দাবি নিয়ে রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়েন, তখন তা ভারতের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে আরও জবাবদিহিমূলক করে তোলার পথ প্রশস্ত করে।গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে সেই শেষ মানুষটির হাসিতে এবং নিরাপত্তায়, যিনি সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা সারিতে বসে আছেন।

