কর্ণাটকের মাণ্ড্য জেলার মদ্দুর তালুকের একটি গ্রাম—সেখানকার এক প্রান্তে দুই একরের এক সুবজ নার্সারিতে এখন যেন হাহাকারের আবহাওয়া। সেই জমির মালিক মারিলিঙ্গাইয়া, একজন খেটে খাওয়া প্রবীণ কৃষক। তাঁর চোখের পলকে জমে আছে একরাশ মেঘ না জমা বৃষ্টির অপেক্ষা। তাঁর এই দুই একরের বীজতলায় মাথা তুলেছে কচি ধানের চারা, যা আগামী সোনালী ফসলের নীরব প্রতিশ্রুতির মতো উঁকি দিচ্ছে। কিন্তু সমস্যা একটাই—কৃষ্ণা রাজা সাগর (কেআরএস) জলাধারের বুকে মাথা তোলা কাবেরীর জল এখনও এসে পৌঁছায়নি তাঁর খেতে।
গ্রামটি ঠিক যেন বিষেশ্বরায়া সেচ খালের এমন এক ভৌগোলিক অবস্থানে অবস্থিত, যা মানচিত্রের একেবারে শেষ প্রান্ত বা ‘টেইল এন্ড’ নামে পরিচিত। আর এখানেই কৃষকদের ভাগ্য যেন এক নিষ্ঠুর পরিহাসের শিকার হয়। খালের উৎপত্তি স্থল থেকে মাইসুরুর কোল ঘেঁষে বয়ে চলা কাবেরীর পবিত্র ধারা যখন এই শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছায়, তখন তা মৃতপ্রায় নদীর ফেনার মতো ক্ষীণ হয়ে আসে।
কাবেরী নদী এই অঞ্চলের মানুষের কাছে কেবল জলপ্রবাহ নয়, এটি মাণ্ড্যের মাটির জীবনরেখা, সংস্কৃতির রক্তধারা। অথচ প্রকৃতির এমন এক বিচিত্র রূপ যে, যে নদী তীরবর্তী উর্বর ভূমিকে সোনা ফলাতে সাহায্য করে, সেই নদীরই শেষ সীমানার মানুষগুলোকে প্রতিনিয়ত জলহীনতার অভিশাপ সইতে হয়। মারিলিঙ্গাইয়া যখন তাঁর সেচখালের শুকনো কংক্রিটের বুকটার দিকে তাকান, তখন তাঁর মনে ভেসে ওঠে অতীতের দিনগুলোর স্মৃতি— আজ সেখানে কেবল ধুধু করা বালুচর আর বাতাসের শুষ্ক দীর্ঘশ্বাস।

এই ঘটনা কেবল একজন মারিলিঙ্গাইয়ার ব্যক্তিগত দুঃখ নয়, এটি দক্ষিণ ভারতের সেচ ব্যবস্থার এক গভীর কাঠামোগত সংকটের নিখাদ রূপক। উচ্চ অববাহিকার কৃষিজমিগুলো যখন পর্যাপ্ত জলে পুষ্ট হয়ে ওঠে, তখন নিম্ন অববাহিকা বা শেষ প্রান্তের কৃষকদের ভাগ্যে জোটে কেবল খালের শুষ্ক তলদেশ। নীতি এবং বাস্তবায়নের এই ফারাক মারিলিঙ্গাইয়ার মতো অগণিত কৃষকের বুকভাঙ্গা আর্তনাদের জন্ম দেয়।
মারিলিঙ্গাইয়া এখনও হাল ছাড়েননি। প্রতিদিন সকালে উঠে খালের জলের কলকল শব্দ শোনার আশায় তিনি প্রতীক্ষা করেন। হয়তো আজ রাতে জল আসবে, হয়তো কাল ভোরে প্রাণ ফিরে পাবে তাঁর মাটির সন্তানরা—এই ছোট্ট আশাটুকুই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে।
কাবেরী নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে মারিলিঙ্গাইয়া যেন সময়ের এক নিঃসঙ্গ প্রহরী। তাঁর এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা শুধু জলের জন্য নয়, এটি বেঁচে থাকার অধিকারের এক মৌন লড়াই। জলহীন খালের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মারিলিঙ্গাইয়ার অবয়ব আমাদের মনে করিয়ে দেয়—উন্নয়নের আলোকবর্তিকা আজও সমাজের একদম শেষ প্রান্তে থাকা মানুষের কুটিরে পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি।

