রান্নাঘর থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়ের চায়ের কাপ—বাঙালির জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে, চিনি৷ কিন্তু বর্তমান দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জেরে সেই মিষ্টির স্বাদ তেঁতো ঠেকছে মধ্যবিত্তের ভিজে৷ বড়বাজারের বস্তা থেকে পাড়ার মুদির দোকানের বয়—সর্বত্রই এক আতঙ্ক, এই বুঝি শতরান ছুঁল চিনির দাম। মিষ্টির বাংলার রসনা আজ ফ্যাকাশে, তার কারণ এই আকাশছোঁয়া দাম।
রাজ্যের মিষ্টি ব্যবসায়ীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছেন, গ্যাসের চড়া দামের অভিশাপ কাটতে না কাটতেই এসে জুটেছে চিনির এই মারাত্মক কোপ। ছোট ছোট মিষ্টির দোকানগুলোর উনুনের আঁচ আজ নিবতে বসেছে, কারণ যে রসগোল্লায় প্রাণ পায় বাঙালির আনন্দ, তার মূল উপাদানটিই আজ নাগালের বাইরে। বেকারি শিল্পের অবস্থাও তথৈবচ; পাউরুটি থেকে কেক—সবকিছুর পেছনেই যে চিনির অদৃশ্য টান, তা আজ ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
এই দাম বৃদ্ধির নেপথ্যে শুরু হয়েছে কথার লড়াই ও রাজনৈতিক দড়িটানাটানি। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ সরাসরি আঙুল তুলেছেন কেন্দ্রীয় সরকারের ইথানল নীতির দিকে। পেট্রলে ইথানল মেশানোর ফলে আখ থেকে উৎপাদিত চিনির পরিমাণের যে ঘাটতি পড়েছে এবং বিশ্ববাজারে তার যে অভিঘাত আছড়ে পড়েছে, তা নিয়ে সরব বিরোধীরা। তাঁদের দাবি, এই নীতি জনস্বার্থবিরোধী এবং তা মানুষের হেঁসেলের বারোটা বাজাচ্ছে।
অন্যদিকে, কেন্দ্র সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে দায় চাপাচ্ছে কম উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাজারের চড়া দরের ওপর। রাজ্যের রাজনৈতিক আঙিনাতেও চলছে তির্যক মন্তব্য। শাসক থেকে বিরোধী—সবাই যখন নিজ নিজ স্বার্থের তর্কে ব্যস্ত, তখন সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসছে নীরব হাহাকার। সিডব্লিউবিটিএ-র মতো ব্যবসায়ী সংগঠনের অভিযোগ, চিনিকলগুলির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণের অভাবই এই কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক সংকটের মূল অনুঘটক। কেউ একে দেখছেন বিশ্ববাজারের হাওয়া হিসেবে, তো কেউ বলছেন ব্যবসায়ীদের বেআইনি মজুতদারির ফল।
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ হোক কিংবা রবিবারের সকালের নস্টালজিয়া—চিনির কৌটোটি এ সমাজের বয়নরীতির সঙ্গে জড়িয়ে। কিন্তু বর্তমান বাজারের যে হাওয়া, তাতে সেই কৌটো খালি হতে বেশি সময় লাগবে না। ইথানলের তরল রাজনীতি হোক কিংবা মিল মালিকদের কারসাজি—শেষ পর্যন্ত যাঁদের চোখে জল আসছে, তাঁরা ওই সাধারণ ক্রেতা ও খেটে খাওয়া মানুষ। সুস্বাদু জীবনের চাবিকাঠি আজ বন্দি এক মুঠো দানার কৃত্রিম অভাবে। কবে কাটবে এই মেঘ? কবে আবার সাধারণ মানুষের ভাঁড়ারে সহজলভ্য হবে চিনি? উত্তরহীন সেই প্রশ্ন নিয়েই পথ চেয়ে বসে আছে বাংলার প্রতিটা রান্নাঘর।

