গরুকে ভারতে মা হিসেবে পুজো করা হয়, তাই সেটি ব্যবসায়ীক মাপকাঠির। কিন্তু মহিষ এসব বাধাবিপত্তির বাইরে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের কৃষিপণ্য রপ্তানির তালিকায় মহিষের মাংস (বাফেলো মিট) এখন সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে এই রপ্তানি ২৫.৬ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে ৫.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এই বছরের প্রথম তিন মাসেই হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৬৬.৬%।
এই সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল, শুধু বেশি রপ্তানির খবর নয়, প্রতি টনে দামও বাড়ছে, যাকে বলা হয় ‘ভ্যালু রিয়েলাইজেশন’। ২০১৪-১৫ সালে ভারত ১৪.৮ লক্ষ টন মহিষের মাংস রপ্তানি করেছিল, যার মূল্য ছিল ৪.৮ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ প্রতি টনে গড়ে প্রায় ৩,২৪০ ডলার দাম পাওয়া যেত। এরপর কয়েক বছর রপ্তানি ও দাম দুটোই কমেছিল, কিন্তু ২০২৪-২৫ সাল থেকে পরিস্থিতি আবার ঘুরে দাঁড়ায়। ২০২৪-২৫ সালে রপ্তানির মূল্য দাঁড়ায় ৪.১ বিলিয়ন ডলার, প্রতি টনে ৩,২৩৬ ডলার দরে। ২০২৫-২৬ সালে প্রতি টনের দাম বেড়ে হয় ৩,৫৯১ ডলার, এবং ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন সময়কালে তা আরও লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়ায় ৪,৩৯২ ডলারে। সহজ কথায়, একই পরিমাণ মাংসে ভারত এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি রোজগার করছে, যা প্রমাণ করে বিশ্ববাজারে ভারতীয় মাংসের গুণমান নিয়ে আস্থা তৈরি হচ্ছে।
বদলের মূল কারণ হিসেবে, অল-ইন্ডিয়া বাফেলো অ্যান্ড শিপ মিট এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সচিব ফৌজান আলভি বলেছেন, “গত কয়েক বছর ধরে আমরা সচেতনভাবে চেষ্টা করেছি ভারতীয় মহিষের মাংসকে একটা বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ড হিসেবে দাঁড় করাতে, গরুর মাংসের ‘দ্বিতীয় বিকল্প’ হিসেবে না রেখে। বিশ্ববাজারও এখন আমাদের পণ্যের গুণমান আর নিরাপত্তা মান স্বীকার করছে।”
শুধুমাত্র APEDA স্বীকৃত সংস্থান থেকেই গ্রহণ করা হয় এই রপ্তানিযোগ্য মাংস। যা নির্ধারণ করে দেয় একটি কঠোর রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা। এমন ৮৩ টি প্রতিষ্ঠান আছে যাদের অন্তর্গত কসাইখানা ও প্রক্রিয়াকরণ ইউনিটে প্রত্যেকদিন ৫০০ – ২০০০ প্রাণী সঞ্চালনে সক্ষম। পূর্বে ব্যবসায়ীরাও নিম্নমূল্যে কোনো নিয়ম ছাড়াই রপ্তানি করতেন মাংস। কিন্তু এখন তারাও পটু হয়েছে এবং গ্রাহক ব্যবহারের জন্যে প্রস্তুত ১ কিলো প্যাকেটে দ্রব্য রপ্তানি করে, যা সরাসরি বিদেশে পৌঁছে হিমশীতল গুদামে রাখার জন্যে যথাযথ হয়। APEDA সাথে একটি মিট এক্সপোর্ট করও ধার্য করেছে প্রতি টন মাংস রপ্তানির ওপর।
এই মুহূর্তে ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গবাদি পশুর মাংস রপ্তানিকারী দেশ, শীর্ষে ব্রাজিল (৪২.৮ লক্ষ টন), তারপর অস্ট্রেলিয়া (২১.৬ লক্ষ টন)। মার্কিন কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৭ লক্ষ টন। মূল রপ্তানিকারক সংস্থাগুলোর শীর্ষে থাকা তিনটি সংস্থা হলো মুম্বই-ভিত্তিক আল্লানাসন্স প্রাইভেট লিমিটেড, লুলু গ্রুপের মালিকানাধীন ফেয়ার এক্সপোর্টস ইন্ডিয়া, এবং আগ্রার এইচএমএ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ।
ভিয়েতনাম ভারতের প্রথম খদ্দের হলেও এখন অনেক নতুন দেশ ভারতের ক্রমবর্ধমান Carabeef বাজারে আগ্রহী। নতুন বাজারের মধ্যে রয়েছে উজবেকিস্তান, রাশিয়া, জর্জিয়া, ওমান এবং সেনেগাল। ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিয়েতনাম, মিশর, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, ফিলিপাইন্স এবং জর্ডান।
শুধুমাত্র প্রজনন ক্ষমতা হারানো একটি মহিষই চর্বিযুক্ত মাংস রপ্তানিতে সক্ষম। তাই কৃষকদের সাধারণত ১ – ১.৫ লক্ষ টাকা ব্যয় করে একটি দুগ্ধ প্রদানকারী মহিষ কিনতে হয় এবং তার ৫-৬ টি বাচ্চা প্রজন্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। তারপর তারা সেই প্রজনন ক্ষমতা হারানো মহিষকে প্রায় ৫০,০০০ টাকা দিয়ে বিক্রি করে। বর্তমানে ভারতে ডেইরি দ্রব্যের চাহিদা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে এক লিটার মহিষের দুধের মূল্য এখন ৬০ টাকা। সমগ্ররূপেই মহিষ পালন একটি লাভদায়ক ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অতীতে একাধিকবার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উত্তেজনা, গোরক্ষা আন্দোলন এবং কড়াকড়ির কারণে এই ব্যবসা বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে, এমনকি কোনো কোনো মাসে রপ্তানি ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। তাই আজকের এই পাঁচ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক শুধু একটা সংখ্যা নয় এটা এমন একটা শিল্পের প্রত্যাবর্তনের গল্প যেটা বারবার অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে গেছে। এই ব্যবসা সরাসরি দুগ্ধ শিল্পের সঙ্গেও জড়িত, কারণ মহিষ পালন মূলত দুধ উৎপাদনের পাশাপাশি চলা একটা সহায়ক কাজ, তাই এই রপ্তানি বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ে গ্রামীণ কৃষক ও দুগ্ধ ব্যবসায়ীদের আয়েও।

