২০২১ সালের মার্চ মাস—যখন করোনা অতিমারির করাল গ্রাসে বিপর্যস্ত গোটা দেশ, লকডাউনের কড়া বেড়াজালে থমকে গিয়েছিল স্বাভাবিক জনজীবন, ঠিক তখনই কলকাতার বুকে জ্বলে উঠেছিল শিক্ষার এক অবৈতনিক প্রদীপ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘেরাটোপ পেরিয়ে যাদবপুরের এক কোণে তৈরি হয়েছিল “আশু তিমিরের পাঠশালা”। উদ্দেশ্য ছিল —মহামারীর ধাক্কায় যে নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুরা স্কুলছুট হয়ে পেটের টানে শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়ছিল, তাদের আবার বর্ণমালার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া।
কিন্তু, বুধবার রাতে যাদবপুর চত্বরে ঘটে যাওয়া বহিরাগতদের তাণ্ডবলীলার বলি হলো শুধু ইট-কাঠের দেওয়াল নয়, বহু সাধারণ শিশুর ভবিষ্যৎ। বৃহস্পতিবার সকালে পাঠশালার কর্মীরা এসে দেখলেন বাইরে ছোটদের পড়ানোর জন্য যত্নে তৈরি করা পোস্টারগুলো ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করা হয়েছে। পড়ে রয়েছে কচিকাচাদের নিপুণ হাতে আঁকা ছবি আর রং-তুলির নানা সরঞ্জাম—যার বেশিরভাগই আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে।

করোনা-পরবর্তী সময়ে যখন নামী স্কুলগুলি অনলাইন ক্লাসের বন্দোবস্তে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল, তখন এই শহরেরই খেটে খাওয়া সাধারণ পরিবারের ছেলেমেয়েদের কপালে জুটেছিল অন্ধকার। কাজ হারিয়ে বাবা যখন দিশাহারা, দশ-বারো বছরের শিশুটির তখন হাতে কলম তোলার বদলে চায়ের দোকানে কাপ ধোয়া বা ভারী বোঝা টানার বয়স। ঠিক সেই সঙ্কটময় মুহূর্তে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েরই কিছু সংবেদনশীল পড়ুয়া। নিজেদের নিয়মিত ক্লাস শেষ করে, ক্লান্তি ভুলে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁরা ওই পাঠশালায় এসে সময় দিতেন। জনা পঁচিশেক পড়ুয়াকে বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক শেখানোর পাশাপাশি জীবনের পাঠও দিতেন তাঁরা। “আশু তিমিরের পাঠশালা” কেবল একটি কোচিং সেন্টার ছিল না, তা ছিল অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার সরণি।
প্রশ্ন জাগে, এই তাণ্ডব কাদের বিরুদ্ধে? যারা জ্ঞান ছড়াতে চেয়েছিল, নাকি সেই অসহায় শিশুদের বিরুদ্ধে যারা একটু ভালো থাকার স্বপ্ন দেখেছিল?
ইট-কাঠ ভেঙে ফেলা যায়, পোস্টার পুড়িয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু বুকভরা জেদ আর অদম্য শিক্ষাকে কি এভাবে ছাইচাপা দেওয়া সম্ভব? যাদবপুরের পড়ুয়াদের এই মানবিক প্রচেষ্টা প্রমাণ করেছে, অন্ধকার যতই ঘনীভূত হোক না কেন, আশু তিমিরের পাঠশালার মতো ছোট ছোট উদ্যোগগুলোই তিমিরনাশকারী আলোর উৎস। এই ধ্বংসস্তূপ থেকেই হয়তো জন্ম নেবে আরও এক নতুন প্রত্যয়—যেখানে প্রতিহিংসার আগুনে হার মানবে না নিষ্পাপ শিশুদের বর্ণমালা।

