গণতন্ত্রের পীঠস্থান রাজপথ যখনই শাসকের অন্ধকূপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অগ্নিতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তখনই তৈরি হয় নতুন ইতিহাসের সোপান। দিল্লির যন্তর মন্তরের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর লড়াইয়ের সার্থক রূপান্তর যেন এবার দেখা গেল ঝাড়খণ্ডের মাটিতে। দীর্ঘ বঞ্চনা, অনিশ্চয়তা আর দুর্নীতির নাগাল থেকে মুক্তি পেতে রাজপথে যে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিলেন ঝাড়খণ্ডের তরুণ-তরুণী ও চাকরিপ্রার্থীরা, তা অবশেষে কাঙ্ক্ষিত ফলপ্রসূ হলো। ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েট লেভেল বা জেএসএসসি সিজিএল (JSSC-CGL) পরীক্ষা বাতিলের ঐতিহাসিক ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন। প্রশাসনিক গুমোট হাওয়া ভেদ করে এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই উল্লাসে ফেটে পড়েন আন্দোলনকারীরা।
গত কয়েক বছর ধরে ঝাড়খণ্ডের বেকার যুবসমাজ নিয়তির নির্মম পরিহাসের শিকার হয়েছিল। প্রতিবার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, মেধাতালিকা প্রকাশে অন্তহীন কালক্ষেপ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত দালালচক্রের দৌরাত্ম্যে তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নগুলো বারবার ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছিল। দিনের পর দিন লাইব্রেরির চার দেওয়ালের বন্দিদশা ছেড়ে এই হবু প্রার্থীরা রাস্তায় নেমেছিলেন নিজেদের না পাওয়ার ক্ষোভকে শক্তিতে পরিণত করে। তাদের এই আন্দোলন স্রেফ একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষার বিরুদ্ধে ছিল না; এটি ছিল কাঠামোগত দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক প্রতিবাদ । মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন আন্দোলনকারীদের এই ক্ষোভ এবং ত্যাগের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছেন। মন্ত্রিসভার বৈঠকে শুধু জেএসএসসি সিজিএল পরীক্ষাই বাতিল করা হয়নি, বরং ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সমস্ত সরকারি চাকরির পরীক্ষায় ঘটা ছোট-বড় সমস্ত অনিয়মের অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে রায়ের বাস্তবায়ন এবং বিচার পাওয়ার রাস্তা এখনও দীর্ঘ। পরীক্ষা বাতিল হওয়াই শেষ কথা নয়; স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তিতে নতুন পরীক্ষা সময়মতো আয়োজন করা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের এই ঘোষণা সাময়িক স্বস্তি দিলেও, আগামী দিনে প্রশাসনের সদিচ্ছার ওপরই নির্ভর করছে লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ। যন্তর মন্তরের সার্থক অনুবৃত্তি ঘটিয়ে ঝাড়খণ্ডের পড়ুয়ারা আজ প্রমাণ করে ছাড়ল—অধিকার ভিক্ষা করতে হয় না, তা আদায় করে নিতে হয়। ঝাড়খণ্ডের মাটি থেকে আজকের এই বার্তা গোটা দেশের বেকার যুবসমাজকে এক নতুন লড়াইয়ের অক্সিজেন জোগাল। রাজপথের এই জয় কেবল কিছু পদের নয়, এটি মানবিক মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল মাইলফলক।

