যন্তর মন্তরে জেন জি’র জিদের কাছে হার মানতে হয়েছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে। কিন্তু সেখানেই ছাত্রদের যুবকদের আন্দোলন শেষ হয়ে যায়নি। অনেকে হয়তো ভেবেছিলেন এই আন্দোলন শুধুমাত্র নীট পরীক্ষার দুর্নীতি সংক্রান্ত আন্দোলন, কিন্তু এটা যে দেশের শিক্ষা পরিকাঠামো নতুন করে ঢেলে সাজানোর আন্দোলন সেটা হয়তো তখন বোঝা যায়নি আজ বোঝা যাচ্ছে। একদিকে ককরোচ জনতা পার্টি এবং তাদের সমর্থকরা নেমে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রাথমিক স্কুল গুলোর কি পরিকাঠামো আছে সেই সংক্রান্ত আন্দোলনে আর অন্যদিকে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো নেমেছে এই জেএনজি’দের আন্দোলন কেন করা উচিত তাই নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে। যন্তর মন্তরে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন আইসা’র একটা বড় ভূমিকা ছিল, তাদের সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরা দেশের নানান প্রান্তে কথা বলতে যাচ্ছেন ছাত্রদের সঙ্গে। কেন স্বাধীনতার ৮০ বছর পরে ছাত্র ছাত্রীদের তাদের অভিভাবকদের পরামর্শ মত রাজনীতি হীনতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং দেশটাকে নতুন করে সাজাতে হবে সেই কথা পৌঁছে দিচ্ছেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন কলেজ ক্যাম্পাসের মধ্যে।

যন্তর মন্তরের আন্দোলন যে শুধুমাত্র জেন জি’দের আন্দোলন তা যে নয় তা কিন্তু তাদেরও পরবর্তী প্রজন্ম অর্থাৎ জেন আলফারা বুঝিয়ে দিচ্ছে। একাধিক রাজ্যে পথে নামতে দেখা যাচ্ছে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের। কোথাও তাদের দাবি হিসেবে উঠে আসছে, উন্নত রাস্তা, পর্যাপ্ত শিক্ষক, শৌচালয় পরিষেবা এবং অন্য সাধারণ কিছু মৌলিক পরিষেবা। এই জন্য তারা সরকারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে। কোথাও সরকারি আধিকারিক কে ঘেরাও করা হচ্ছে, কোথাও নিজেরা ভিডিও তুলছে এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে তাদের লড়াই।
এবারের স্বাধীনতা দিবসের দিন থেকে “স্কুল ঠিক করো” নামে একটি নতুন প্রচার অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টির সদস্যরা। তাদের লক্ষ্য গ্রামাঞ্চলের সরকারি স্কুল গুলোর পরিকাঠামো ও শিক্ষার মান উন্নত করতে হবে। রাজ্যে রাজ্যে যখন ফুল পড়ুয়াদের আন্দোলন হচ্ছিল সেখান থেকেই অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও অভিজিৎ রাঙ্কারা এই আন্দোলনে নামবেন সিদ্ধান্ত নেন। সেইমতো সাংবাদিক সম্মেলন করে জানানো হয় এবং এক্স হ্যান্ডেল ও ইন্সটাগ্রামেও সেগুলো বলা হয়।
গত ১১ই আগস্ট উত্তরপ্রদেশের হামিরপুরে একদল স্কুল পড়ুয়া তাদের স্কুলে যাওয়ার রাস্তা ঠিক করার জন্য জেলা শাসকের দপ্তরে মিছিল করে যাচ্ছে তাদের সবার হাতে জাতীয় পতাকা। সঙ্গে তাদের বাবা মায়েরাও মিছিলে হাঁটছে। তাদের দাবি এলাকার বাসিন্দারা আগে যে বিকল্প রাস্তাটি ব্যবহার করতেন বনদপ্তর সেই রাস্তাটা বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে কুল ও আশেপাশের এলাকার যাতায়াতের পথ অত্যন্ত সীমিত হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা জানায় এর আগে ৩রা জুলাই তারা একই দাবীদের প্রতিবাদ করেছিল। সেই প্রতিবাদের পর রাস্তায় সাময়িকভাবে মাটি ফেলা হয়েছিল কিন্তু বৃষ্টি শুরু হতেই সেই রাস্তা আবার কাদায় পরিণত হয়েছে। ঐ রাজ্যেরই ফতেপুর জেলার কিশানপুরে সম্প্রতি আরো একটি ছাত্র বিক্ষোভ হয়। সরস্বতী ইন্টারমিডিয়েট কলেজের প্রায় ১৫০০ ছাত্রছাত্রী গত ২৮ শে জুলাই ৪ ঘন্টা শান্তিপূর্ণ অবস্থান বিক্ষোভ করে তাদের দাবি ছিল পরিষ্কার পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে হবে স্কুলে । খারাপ হয়ে যাওয়া পাখাগুলো সারাতে হবে, স্কুলের শ্রেণিকক্ষের পরিকাঠামাগুলোকে মেরামত করতে হবে এবং সঠিকভাবে মিড ডে মিল সরবরাহ করতে হবে। তাদের এই আন্দোলনের ফলে জেলা শিক্ষা দপ্তরের আধিকারিক এবং জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক তড়িঘড়ি কলেজে পৌঁছে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেন তাদের সমস্ত দাবি মেনে নেওয়া হবে। শুধু উত্তরপ্রদেশে নয়, রাজস্থান মধ্যপ্রদেশ এবং বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্য গুলিতে এই ধরনের ছোটখাটো আন্দোলনের খবর এখন নিয়মিত আসছে। গোদি মিডিয়া চেষ্টা করেও সেই খবর চেপে রাখতে পারছে না। একেক জায়গায় তো পড়ুয়াদের দাবী ‘হয় শিক্ষক দাও নয় আমাদের স্কুল থেকে বার করে দাও’। জয়পুরে মূক ও বধির শিক্ষার্থীরাও স্কুলের নিম্নমানের পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে তাদের সাংকেতিক ভাষায় প্রতিবাদ করছে এই ছবিও এসেছে।

অন্যান্য রাজ্যে যখন এগুলো ঘটছে তখন বাংলা থেকে কিছু হচ্ছে না? বাংলাতেও হচ্ছে। আর সেই ঘটনা বিজেপির পক্ষে অস্বস্তির কারণ হচ্ছে। তাদের যুক্তি তারা তো সদ্য সদ্য ক্ষমতায় এসেছে গত ৩৪ বছর বাম শাসন এবং ১৫ বছর তৃণমূল শাসনে কেন স্কুলের পরিকাঠামোর কোন উন্নয়ন করা হয়নি। সঠিক যুক্তি এই নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। কিন্তু আগে এই নিয়ে কথা হয়নি বলে আজকে কথা হবে না সেটা তো কোন যুক্তি হতে পারে না। বাংলায় এই সংক্রান্ত একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেছে যেটা দেশের কোন প্রান্তে ঘটেনি।
দিল্লিতে যখন অবস্থান অনশন চলছে ছাত্রদের তখন সেই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন বাংলার বাঁকুড়া জেলার ইন্দাস থানার অন্তর্গত একটি গ্রামের শেখ আব্দুল হাফিজ। যে সময় দিল্লী পুলিশ লাঠি টিয়ার গ্যাস চালিয়েছে সেই সময়ও আন্দোলনে ছিলেন আব্দুল হাফিজ। তারপর তার মনে হয়েছে যে ককরোচ জনতা পার্টির যে স্কুল ঠিক করার আন্দোলন সারাদেশে করছে সেই আন্দোলনের শামিল হওয়া উচিত। বাড়ি ফিরে বেহাল অবস্থায় থাকা তার স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছবি তুলে তিনি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন। এই অপরাধে শোনা যাচ্ছে এলাকার বিজেপি প্রভাবিত দুষ্কৃতীরা তাকে আক্রমণ করে এবং শুধু তাকে নয় তার বাবা শেখ মোহাম্মদ মাফিককেও আক্রমণ করা হয়। তার ফলে মৃত্যু হয় শেখ মোহাম্মদ মাফিকের।
প্রাথমিক স্কুলের পরিকাঠামোর উন্নতি চাওয়া কি আজকের ভারতবর্ষে অপরাধ? নাকি বাংলাটা দেশের বাইরে? শোনা যাচ্ছে আশুতোষ রাঙ্কা সহ ককরোচ জনতা পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব বাঁকুড়ায় আসছেন। সামাজিক মাধ্যমে ইতিমধ্যেই তাকেও হুমকি দেওয়া শুরু হয়েছে বিজেপির বেশ কিছু মানুষদের পক্ষ থেকে। আশুতোষ বলেছেন তিনিও চান তার উপর আক্রমণ হোক এবং সারা পৃথিবীর দেখুক ভগ্ন প্রায় বিদ্যালয় পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবিতে ছাত্ররা রাস্তায় নামলে তাদেরকে বাংলায় শাসকদের পক্ষ থেকে আক্রমণ করা হয়। সারাদেশ যখন বিজেপির বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস খুঁজে পাচ্ছে সারা দেশে যখন নতুন প্রজন্ম আক্ষরিক অর্থে ভয়কে জয় করে রাস্তায় নেমে বিজেপির গুন্ডা এবং প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে তখন বাংলার কিছু মানুষের এই আচরণ মাথা হেট করে দিচ্ছে রামমোহন রায় বিদ্যাসাগর এবং অন্যান্য শিক্ষাবিদদের। আসলে বিজেপির কর্মী সমর্থকরা যে কুশিক্ষিত এবং তাদের যে শিক্ষার কোন প্রয়োজন নেই সেটা তারা পদে পদে দেখাচ্ছে। তাদের একমাত্র শিক্ষা যদি তারা পেয়ে থাকে সেটা তারা মনে করে হোয়াটসঅ্যাপে যা আসে সেটাই একমাত্র ধ্রুব সত্য। কিন্তু নতুন প্রজন্ম তো সেই হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে রাজি নয় তারা তো শিক্ষিত হতে চায় শিক্ষার পরে চাকরিও পেতে চায় তাই তাদের দাবিতে অন্যায়টা কোথায়?
দীর্ঘদিন ধরে স্কুল শিক্ষাকে ক্রমশ শুকোনো হয়েছে। সরকার চায়না মানুষ শিক্ষিত হোক। কারণ তারা জানে শিক্ষিত হলেই যে কোন মানুষ প্রশ্ন করবে। সেই কবে হীরক রাজার দেশে ছবিতে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন ” ওরা যত বেশি জানে, তত কম মানে”। সরকার চায় সব মেনে নেওয়া কিছু মানুষের মতো দেখতে প্রাণী যারা কোন প্রশ্ন করবে না, কোনদিনও সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলবে না। শিক্ষার বাজেটে ধীরে ধীরে টাকার সংস্থান কমানো হয়। ২০১৩-১৪ সালে যে সরকার ৪.৬% ব্যয় বরাদ্দ করত তারা ২০২৫- ২৬ সালে এসে সেই ব্যয় ২.৫ % তে নামিয়ে আনে এবং তখনও কোন নাগরিক কোন বিরোধী দল সেই অর্থে শোরগোল করে না।
আসলে সরকার চায় মানুষ শিক্ষিত না হোক। যখন পড়াশোনা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে তখন এই সরকারই বলবে যে আরএসএসের যে একল বিদ্যালয়গুলো আছে, সেই বিদ্যালয়গুলো এখন থেকে প্রাথমিক শিক্ষার কাজটা করবে এবং সরকার তখন সরাসরি আরএসএসকে ঐ উপলক্ষে টাকাও দিতে পারবে। আর যাদের পয়সা আছে তারা বেসরকারি শিক্ষায় যাবে সেখানে পয়সা দিয়ে শিক্ষা কিনবে সুতরাং একটা বিরাট দূরত্ব তৈরি হবে ধনী ও গরীব ছাত্রদের মধ্যে এবং এই দূরত্ব ক্রমশ বাড়বে। আজকের বামপন্থী আন্দোলনের ছাত্র ছাত্রীরা এবং ককরোচ জনতা পার্টির সদস্য সমর্থকরা এই গোটা নীল নকশাটা ধরতে পেরে গেছেন, এবং সেই জন্যই তারা রাস্তায় নামছেন এবং শুধু তারা নয় সারাদেশের জেন জি এবং জেন আলফা নিজেদের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর লক্ষ্যেই রাস্তায় নামছে। এই আন্দোলনকে সমর্থন না করে থাকা যায়। যে প্রজন্ম নিজের ভালো কিসে হবে সেটা বুঝে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করে সেই প্রজন্মের পাশে সেই আন্দোলনের পাশে যদি আমরা না থাকি তাহলে সেটা অন্যায় হবে।

