ক্যাম্পাসে গ্রাফিতিতে চুনকাম ও রাষ্ট্রের ছায়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়?

তিহাড়ে ছয় বছর: উমর খালিদ এবং স্বাধীনতার প্রশ্ন

১২৭ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

১৫ আগস্ট। লাল কেল্লায় উঠবে তেরঙ্গা, স্কুলের মাঠে বাজবে জাতীয় সংগীত। আর সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু চিরাচরিত পোস্ট, আমরা কী সতিই স্বাধীন? অন্যবার হাসি মজায় মিম পোস্টে উড়িয়ে দিই, কিন্ত এবারের ককরোচ আন্দোলন পরবর্তী আবেশে ভেবে দেখতে বাধ্যই হলাম। মার্কিন রাজনিতিবিদ এঞ্জেলা ডেভিসের কথায়, স্বাধীনতাকে স্থায়ী ধ্রুবসত্যর বদলে আবহমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা উচিত। আর সেই মাপকাঠিতে দিল্লির তিহাড় জেলের একটি কক্ষে গত ছয় বছর ধরে স্বাধীনতা নীরবে ব্যর্থ হয়ে আছে।

ড. উমর খালিদ। জেএনইউ-এর প্রাক্তন ছাত্রনেতা, বস্তারের বিদ্রোহ নিয়ে গবেষণারত ইতিহাসবিদ, এবং সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে দিল্লি পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি কারণ তাঁর বিচারই এখনও শুরু হয়নি। ছয় বছর পরও তিনি অপেক্ষারত, রাষ্ট্র যে মামলার কথা বলছে, তার প্রমাণ আদালতে হাজির করার জন্য। এহেন লোকতন্ত্রে প্রতি আগস্টে যে স্বাধীনতা উদযাপন করা প্রহসন। ভারতীয় সংবিধানের দ্রুত বিচারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, তিহাড় জেলে একজন সাক্ষীকেও জেরা না করে ছয় বছর কাটিয়ে দেওয়া কোন নয় যথাযত বিচারব্যাবস্থা হতে পারে না। এ যেন বিচারের আগেই শাস্তিমূলক বন্দিদশা।

খালিদকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন বা ইউএপিএ – ভারতের প্রধান সন্ত্রাসবিরোধী আইন – সহ ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়, যার মধ্যে থাকে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, দাঙ্গা এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ। এই অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে দিল্লি পুলিশ উমরের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লি দাঙ্গার সঙ্গে সম্পর্কের সন্দেহে ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’ মামলা দায়ের করে । নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে চলা বিক্ষোভের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়া সেই সাম্প্রদায়িক হিংসায় প্রাণ হারান ৫৩ জন। দিল্লি পুলিশের অভিযোগ, উমর ছিলেন সেই হিংসার অন্যতম উদ্যোক্তা। তাদের দাবি, উমরের একটি বক্তৃতা, এবং সহ-অভিযুক্তদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে অশান্তি সৃষ্টির এক পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের প্রমাণ তাঁরা পেয়েছেন। বলা বাহুল্য, ছ-বছরেও দিল্লি পুলিস এই অভিযোগের সাপক্ষে কোন প্রমাণ বা সাক্ষ্য আদালতের সামনে আনতে পারেনি।

উমর শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন দাঙ্গায় তাঁর কোনো ভূমিকা ছিল না এবং প্রকৃত দোষীদের সঙ্গে তাঁর কোনো ষড়যন্ত্রমূলক যোগসূত্র নেই। একাধিক সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা, বিশেষত ‘কয়েদি নং ৬২৬৭১০ হাজির হে’ নামক তথ্যচিত্র দেখা গিয়েছে যে অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত ভিডিওগুলো বিকৃত। ইউএপিএ-র ৪৩ডি(৫) ধারা জামিনের জন্য এক অস্বাভাবিক মানদণ্ড বেঁধে দিয়েছে। বিচারককে নিশ্চিত হতে হয় যে অভিযোগ প্রাথমিকভাবেও সত্য নয়, তবেই জামিন মেলে। জামিন-ই নিয়ম, জেল-ই ব্যতিক্রম – এই স্বাভাবিক আইনি ধারণার বিপরীত। উমরের মামলায় হাজতবাসের শর্ত পূরণ হয়েছে, কিন্ত মূল বিচার প্রক্রিয়া প্রায় শুরুই হয়নি। গ্রেপ্তারের বহু বছর পরও মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনই সম্পন্ন হয়নি এখনও।

২০২২ সালের অক্টোবরে দিল্লি হাইকোর্ট উমরের জামিনের আবেদন খারিজ করে। এরপর তিনি সুপ্রিম কোর্টে যান, যেখানে বিচারপতিরা অনির্দিষ্ট কারণে সরে দাঁড়ান এবং আইনজীবীদের অনুপস্থিতি কারণে শুনানি এক বছরেরও বেশি স্থগিত থাকে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে উমর আপিলটি প্রত্যাহার করে নিম্ন আদালতে নতুন করে জামিনের আবেদন করেন। সেটিও ফল দেয়নি।

তারপর, ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি, সুপ্রিম কোর্ট ফের রায় দেয়, পাঁচ সহ-অভিযুক্ত গুলফিশা ফাতিমা, মিরান হায়দার, শিফা উর রহমান, মহম্মদ সেলিম খান এবং শাদাব আহমেদ জামিন পান। কিন্তু খালিদ এবং তাঁর জেএনইউর সহপাঠী শারজিল ইমাম জামিন পাননি। বেঞ্চ এই দুজনকে ‘ভিন্ন অবস্থান’ বলে বর্ণনা করে, যদিও সেই অবস্থানের জটিলতা কেন তা আদালত স্পষ্ট করে বলতে পারেনি।

২০২৬ সালের জুলাই মাসে সুপ্রিমC কোর্টের একটি পৃথক বেঞ্চ দীর্ঘ বিচারপূর্ব আটক সংক্রান্ত পূর্ববর্তী রায়গুলো নিম্ন আদালতগুলো কীভাবে প্রয়োগ করছে তাতে অসংগতি চিহ্নিত করে। উমর ও শারজিল সেই সুযোগ ফের জামিনের আবেদন করেন। কিন্তু তাঁদের জানানো হয়, নিম্ন আদালত এখনও জানুয়ারির রায়ে বাঁধা। তারপর উমত ফের দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাঁর অষ্টমবারের জামিনের প্রচেষ্টা, শুনানি ধার্য হয়েছে আগস্টের শেষদিকে।

ইউএপিএ নিয়ে জাতিসংঘের নির্বিচার আটক সংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপ, এবং অন্যান্য জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা করে আসছে। আইনটির সংজ্ঞা অস্পষ্ট এবং জামিনের বিধান কার্যত আটকের মতোই। পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজের মতো সংগঠনগুলির নথি অনুযায়ী, এই আইন রাজনৈতিক, সাংবাদিক এবং মুসলমানদেরর বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল উমরের মামলাকে ভারতের আইনি কাঠামোর গাফিলতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

কিন্ত মুশকিল হল, আদালতগুলো আইনবহির্ভূতভাবে কাজ করেছে না। বিচারকেরা আইনের যেমন লেখা রয়েছে, তেমনই প্রয়োগ করেছেন, আর সুপ্রিম কোর্ট নিজেই অন্যান্য রায়ে বলেছে যে দীর্ঘ কারাবাস ও বিচারে বিলম্ব ইউএপিএ-র কঠোর মানদণ্ড সত্ত্বেও জামিনের যথেষ্ট কারণ হতে পারে। কিন্তু উমরের মামলায় যতবারই এই নীতি প্রয়োগ হচ্ছে না।

উমরের দীর্ঘায়িত আটকাবস্থায় হয়তো সরকার বুঝিয়ে দিতে চায় যে রাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে যাওয়ার মূল্য। বিচার শেষ পর্যন্ত যা-ই প্রমাণ করুক না কেন, এই ছয়টি বছর, যা তিনি ইতিমধ্যে জেলে কাটিয়েছেন, তা আর ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না।

উমর খালিদের মামলা আজ গণতন্ত্রের পরীক্ষা। ভারতের বিচারব্যবস্থা একজন প্রতিবাদীর সঙ্গে একজন সন্ত্রাসীর পার্থক্য করতে পারে কি না, এবং করতে পারলেও, ন্যায়বিচারের যোগ্য কোনও সময়সীমার মধ্যে করতে পারে কি না, তা আজও জানতে চান আপামর জনগণ। দীর্ঘ ছয় বছরের অপেক্ষা। যারা আজও দেশের বিচারব্যাবস্থা, গণতন্ত্র এবং সংবিধানে বিশ্বাসী, এই মামলার পরিণতির সঙ্গে তাঁদের প্রত্যেকেরই আর্দশ এবং আবেগ জড়িয়ে আছে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.