বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়? সেক্যুলার নেতাজির আদর্শ নিয়ে সমস্যা BJP-র! তাই অনন্ত মহারাজ এখনও বাইরে?

স্বাধীনতার প্রশ্নে অঙ্গীকারবদ্ধ বাংলার সংবাদপত্রের ইতিহাস

২২ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

স্বাধীনতার ৭৯ বছর। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বাংলার সংবাদপত্র নিছক তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম ছিল না, তা ছিল প্রতিরোধের এক নীরব অথচ শক্তিশালী অস্ত্র। ভারতের জাতীয় পত্রিকাসমূহ, বাল গঙ্গাধার তিলক প্রচারিত ‘কেসারি ‘ , গান্ধীজির ‘ইয়ং ইন্ডিয়া ও হরিজন’ বি জি হর্ণিমানের সম্পাদিত ইংরেজি পত্রিকা ‘বোম্বে ক্রনিকলস ‘ ইত্যাদির ভূমিকা ছিল অসামান্য। কিন্তু বাংলাও পিছিয়ে ছিল না কোনমতে। ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’, ‘আনন্দবাজার’, ‘দ্য বেঙ্গলি’-র মতো পত্রিকাগুলি ব্রিটিশ শাসনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলেছিল, যখন প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করা ছিল বিপজ্জনক। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “বন্দে মাতরম্” যেমন জাতীয়তাবাদের সংগীতে পরিণত হয়েছিল, তেমনই বাংলার সংবাদপত্র হয়ে উঠেছিল জাতীয়তাবাদী জাগরণের উৎস। স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা উঠলে আমরা সাধারণত মিছিল, আন্দোলন, বিপ্লবীদের বোমা-পিস্তলের কথাই বেশি মনে করি। কিন্তু এর পাশাপাশি চলেছিল আর এক লড়াই, যা অনেক সময় চোখের আড়ালেই থেকে যায়- কলমের লড়াই। বাংলার সংবাদপত্রগুলো তখন শুধু খবর ছাপতো না, তারা মানুষের মনে আগুনের সঞ্চার করতো। একটা কাগজ, একটা সম্পাদকীয়, একটা লেখা এগুলোই তখন হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র। আর আমাদের মতোই কিছু সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবন বাজি রেখে এই অস্ত্র চালিয়েছিলেন।

অমৃতবাজার পত্রিকা। ১৮৬৮ সালে যশোরের অমৃতবাজার গ্রামে শিশির কুমার ঘোষ আর তাঁর দুই ভাই মিলে মাত্র বত্রিশ টাকার একটা ছাপাখানা কিনে এই কাগজ শুরু করেছিলেন। শুরুতে এটা ছিল নীলচাষিদের ওপর ব্রিটিশ অত্যাচারের প্রতিবাদে লেখা এক সাপ্তাহিক পত্রিকা। ক্রমশ এই পত্রিকার তীব্রতা ও নির্ভীকতা এতটাই বৃদ্ধি পায় যে অনেকেই দাবি করে, ১৮৭৮ সালে যখন লর্ড লিটন ‘ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট’ (যাকে মানুষ বলতো ‘গ্যাগিং অ্যাক্ট’) আইন আনে, তখন বলা হয় এই আইনটা মূলত অমৃতবাজার পত্রিকাকেই টার্গেট করে বানানো হয়েছিল। কিন্তু আইনটার একটা বড় দুর্বলতা ছিল, এটা শুধু দেশীয় ভাষার কাগজের ওপর প্রযোজ্য হতো, ইংরেজি কাগজের ওপর না। শিশির ঘোষ আর তাঁর ভাইরা এই ফাঁকটা ধরে ফেললেন। আইন জারি হওয়ার পরের দিন সকালে ব্রিটিশ অফিসাররা ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, অমৃতবাজার পত্রিকা রাতারাতি বাংলা থেকে সম্পূর্ণ ইংরেজি কাগজে বদলে গেছে। একই কণ্ঠস্বর, একই ধার, শুধু ভাষাটা পাল্টে গিয়ে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে গেল।এই কাগজের সাংবাদিকতা কতটা নির্ভীক ছিল, তার একটা উদাহরণ হলো একবার পত্রিকার একজন সাংবাদিক ভাইসরয়ের অফিসের ফেলে দেওয়া কাগজের ঝুড়ি থেকে ছেঁড়া একটা চিঠি জোড়া লাগিয়ে জানতে পারেন, ব্রিটিশ সরকার গোপনে কাশ্মীর দখলের পরিকল্পনা করছে। এই খবর পত্রিকায় ছাপানোর পর এত বৃহৎ জনগণ আকর্ষন করে যে, ব্রিটিশ সরকার এই পরিকল্পনা পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়।


যুগান্তর পত্রিকা। ১৯০৬ সালে বারীন্দ্র কুমার ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত আর অভিনাশ ভট্টাচার্য মিলে কলকাতার এক গলিতে এই কাগজ শুরু করেন। এই কাগজ কোনো রাখঢাক না করেই খোলাখুলি বলেছিল অস্ত্র তোলো, বিপ্লব করো, ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করো। মাত্র এক পয়সা দামে বিক্রি হতো বলে বাংলার তরুণ, ছাত্র, সাধারণ মানুষ সবার হাতে হাতে এই কাগজ পৌঁছে যেত। একটা সময় এর পাঠকসংখ্যা কুড়ি হাজার ছাড়িয়ে যায়। যুগান্তর ছিল অনুশীলন সমিতির মুখপত্র, এই কাগজের পেছনে ছিল একটা গোপন বিপ্লবী সংগঠন, যারা বোমা বানানো, অস্ত্র চালানো শেখাতো তরুণদের। ১৯০৭ সালে ভূপেন্দ্রনাথ দত্তকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে তিনি নিজেকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই করেননি, উল্টে বলেছিলেন, তিনি যা করেছেন দেশের জন্যই করেছেন। এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয় তাঁর। কিন্তু এই গ্রেপ্তার যুগান্তরকে থামাতে পারেনি। বারবার মামলা হয়েছে, কাগজ বাজেয়াপ্ত হয়েছে, তবু নতুন নামে, নতুন ঠিকানা থেকে আবার ছাপা হয়েছে এই কাগজ।

আনন্দবাজার পত্রিকা। ১৯২২ সালের ১৩ মার্চ,দোলযাত্রার দিন, সুরেশচন্দ্র মজুমদার আর প্রফুল্ল কুমার সরকার মিলে শুরু করলেন আনন্দবাজার পত্রিকা। উৎসবের দিন বলেই কিনা, প্রথম সংখ্যাটা ছাপা হয়েছিল লাল কালিতে। ব্রিটিশ প্রশাসন এই লাল রংটাকে দেখেছিল বিপদের সংকেত হিসেবে। মাত্র দুই পয়সা দামের চার পাতার এই সান্ধ্য কাগজ প্রথম দিনেই হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল। অসহযোগ আন্দোলনের ঠিক পরের বছর জন্ম নেওয়া এই কাগজ শুরু থেকেই ব্রিটিশবিরোধী অবস্থান নিয়েছিল, আর বারবার সম্পাদক-প্রকাশকদের জেলেও যেতে হয়েছিল এই কারণে। এই কাগজটাই আজকের সময়ে এসে বাংলার সবচেয়ে পঠিত সংবাদপত্র, কিন্তু তার শিকড় লুকিয়ে আছে ঠিক এই বিদ্রোহের মধ্যেই।


বন্দে মাতরম। অরবিন্দ ঘোষের সম্পাদনায় প্রকাশিত হত এই পত্রিকা। ১৯০৭ সালে এই কাগজের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয়, অরবিন্দ ঘোষকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই মামলায় তাঁর হয়ে আদালতে লড়েছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ। আর বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা “বন্দে মাতরম” গানটা হয়ে উঠেছিল গোটা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গীত।


তখন খবর ছড়ানো এখনকার মতো সহজ ছিল না। ছাপাখানা ব্রিটিশ পুলিশের নজরদারিতে থাকত, যেকোনো সময় প্রেস বাজেয়াপ্ত হতে পারত। তাই অনেক সময় কাগজ ছাপা হতো রাতের অন্ধকারে, বিতরণ হতো হাতে হাতে, বিশ্বস্ত মানুষের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে পৌঁছে যেত। সম্পাদকেরা প্রায়ই ছদ্মনামে লিখতেন, যাতে ধরা পড়লেও পুরো সংগঠনটা বিপদে না পড়ে।
বাংলার এই কাগজগুলো আজকের হিসেবে দেখলে হয়তো ছোট, দুর্বল ছাপার মেশিনে ছাপা সাদামাটা পাতা মনে হবে। কিন্তু সেই সময়ে এগুলোই ছিল মানুষের কাছে সত্যি জানার একমাত্র জানালা। এই কাগজগুলর সম্পাদকরা জানতেন, তাঁদের লেখার দাম হতে পারে নিজের স্বাধীনতা, এমনকি জীবনও। তবু তাঁরা থামেননি। কলম তখন আদতেই হয়ে উঠেছিল তলোয়ারের চেয়েও বেশি শক্তিধর।

অন্যান্য প্রতিবেদন.