ক্রেনশক্তিতে উপড়ে গেলো নেহেরু মূর্তি;কংগ্রেস-বিজেপি-তৃণমূলের ত্রিমুখী তরজা ভারতের শেষ গ্রামে দুর্বিষহ জীবন, পদ্মা নদীর ছন্দেই বাঁচে ওরা! নেই হাসপাতাল, স্কুল, রোজগার! ভাতের বদলে কাফন? ১৯৫৯ সালের যে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে কেঁপেছিল রাইটার্স! আহমেদাবাদের স্টাডি সার্কেলে হামলা; নিষিদ্ধ আনা ফ্রাঙ্ক,মালালা ইউসুফজার! কেন বুদ্ধবাবু পারেননি তসলিমাকে নিরাপত্তা দিতে? কেন বিজেপি ফেরাল? কার দখলে বাংলার বিরোধী রাজনীতি? তৃণমূলের শেষে আশার আলো দেখছে CPIM? কার দখলে বাংলার বিরোধী রাজনীতি? তৃণমূলের শেষে আশার আলো দেখছে CPIM? ককরোচদের (CJP) আন্দোলনে জেরবার BJP! কোন পথে ঐতিহাসিক জয় প্রশান্ত কিশোরের? নেপথ্যে ছাত্র আন্দোলন! BJP-র বিরুদ্ধে একজোট হচ্ছে মানুষ? বাঁকিপুর ভাবাচ্ছে নরেন্দ্র মোদীকে নেপথ্যে ছাত্র আন্দোলন! BJP-র বিরুদ্ধে একজোট হচ্ছে মানুষ? বাঁকিপুর ভাবাচ্ছে নরেন্দ্র মোদীকে

হম লেকে রহেঙ্গে আজাদী…

৬৪ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

হেমন্তের এক ধূসর সন্ধ্যা। কলকাতার যাদবপুর কিংবা দিল্লির জেনইউ ক্যাম্পাসের কোনো এক চত্বরে তখন হালকা কুয়াশা জমতে শুরু করেছে। চারপাশের চায়ের দোকানগুলো থেকে ধোঁয়া উঠছে, আর একদল তরুণ-তরুনী গোল হয়ে বসেছে প্রাঙ্গণের ঠিক মাঝখানে। হঠাৎ কাঠের ফ্রেমে টানটান করা চামড়ার গায়ে আছড়ে পড়ল এক জোড়া হাত। ঠক-ঠক-ঠকা-ঠক…
বাতাস চিরে প্রথম সুরটা ভেসে এল। প্রথমে বেশ নিচু গলায়, যেন বুকচাপা দীর্ঘশ্বাস: “মেরি বহনে মাঙ্গে…”
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের পরিবেশ বদলে গেল। শত শত গলায় একযোগে গর্জে উঠল জবাব: “আজাদী!”
আবার সেই ডাফলির দ্রুততর তাল: “সামন্তবাদ সে…”
জবাব এলো আরও তীব্র, আরও তীক্ষ্ণ: “আজাদী!”
কথাটা স্রেফ চার অক্ষরের এক ফার্সি শব্দ—যার অর্থ ‘স্বাধীনতা’। কিন্তু এই একটি শব্দের ভেতর যখন বহু শতকের সামাজিক নিপীড়ন, পিতৃতন্ত্রের দমবন্ধ অনুশাসন, জাতপাতের বৈষম্য আর ক্ষমতার দম্ভ এসে মিশে যায়, তখন তা আর অভিধানের পাতায় বন্দি থাকে না। তা হয়ে ওঠে প্রতিবাদের এক জীবন্ত রূপকথা—লাঞ্ছিত মানুষের বুকের ভেতর জমানো আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোত।

এই প্রতিবাদের সুর কিন্তু কোনো আরামদায়ক ড্রয়িংরুমে বা চায়ের টেবিলে তৈরি হয়নি; এর জন্ম হয়েছিল রাজপথের রক্ত আর টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে। গল্পটা আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ের। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান তখন সেনাশাসক জেনারেল জিয়া-উল-হকের বুটের তলায় পিষ্ট। কট্টরপন্থী ‘হুদুদ অর্ডিন্যান্স’ জারি করে নারীদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তাঁদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চলছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু অন্ধকার যতই গভীর হয়, প্রতিরোধের আলো ততই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ঘরের চারদেওয়ালের শৃঙ্খল চূর্ণ করে লাহোরের রাজপথে নেমে এলেন ‘উইমেনস অ্যাকশন ফোরাম’ (WAF)-এর একদল নির্ভীক নারী।
খাকি পোশাকের পুলিশ যখন টিয়ার গ্যাস আর জলকামান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল, ঠিক তখনই ভয়কে জয় করে সেই নারীদের কণ্ঠ থেকে প্রথম স্পন্দিত হয়েছিল এই শব্দ—’আজাদী’। ডিকটেটরের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এটি ছিল এক বুকখোলা চ্যালেঞ্জ।
রাজপথের সেই আগুনের শিখা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে আসতে বেশি সময় নেয়নি। নয়ের দশকের শুরুর কথা—প্রখ্যাত সাউথ এশিয়ান নারীবাদী, কবি ও সামাজিক কর্মী কমলা ভাসিন এই সুরকে নিয়ে এলেন এপার বাংলায়।
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি এক শীতের বিকেলে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সম্মেলন কক্ষে কমলা ভাসিন উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতে ছিল একটি ছোট্ট কাঠের ঢোল বা ডাফলি। তিনি কেবল ভাষণ দিলেন না, বরং ডাফলির চালে সুর তুলে গাইতে শুরু করলেন:
“জিসসে অউরত ডরতি হে, ওহ পিতৃতন্ত্র হাম তোড়েঙ্গে…”
“মেরি বহনে মাঙ্গে—আজাদী! মেরি বেটি মাঙ্গে—আজাদী!”

জিসসে অউরত ডরতি হে, ওহ পিতৃতন্ত্র হাম তোড়েঙ্গে

সেই সম্মেলন কক্ষে উপস্থিত তরুণদের শরীরে যেন বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে গেল। দেখতে দেখতে সেই সুর ছড়িয়ে পড়ল ভারতের ঘরে ঘরে, ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে। ‘আজাদী’ আর কেবল কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা রাজনৈতিক সংজ্ঞায় আবদ্ধ রইল না; তা হয়ে উঠল নারীদের নিজস্ব আকাশ খোঁজার এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজকে প্রশ্ন করার এক সর্বজনীন ভাষা।
তবে আজাদী স্লোগানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় পরিবর্তন আসে ২০১৬ সালের এক কনকনে শীতের সন্ধ্যায়। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (JNU) প্রাঙ্গণে ছাত্র আন্দোলনের ঝোড়ো হাওয়ায় সেই চেনা সুর এক নতুন মাত্রা পেল।

সেদিন ক্ষমতার অলিন্দে থাকা শাসক ও সংবাদমাধ্যমের একাংশ যখন চটজলদি এর গায়ে ‘দেশদ্রোহিতা’র তকমা এঁটে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তখন তরুণ প্রজন্ম এক অভূতপূর্ব উত্তর দিয়েছিল। ছাত্রনেতারা ডাফলির তালে গর্জে উঠে স্পষ্ট করে দিয়েছিল তাদের দাবির মূল সুরটি। তারা বলেছিল—তারা দেশ থেকে আজাদী বা বিচ্ছিন্নতা চায় না, তারা এই দেশের ভেতরে বাস করে ক্ষুধা থেকে, দারিদ্র্য থেকে, জাতপাত থেকে, হিংসা থেকে আর শাসকের স্বৈরাচারী মানসিকতা থেকে আজাদী চায়।
এই একটি সূক্ষ্ম পার্থক্যে রাতারাতি স্লোগানটির চেহারা বদলে গেল; এটি আর কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের চারদেওয়ালে আটকে রইল না।
পরবর্তী বছরগুলোতে দিল্লির শাহীনবাগের কনকনে ঠান্ডা রাতে চাদর মুড়ি দিয়ে বসা আশি বছরের বৃদ্ধা মা-বোনেদের কণ্ঠে, কিংবা নতুন নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনে ‘আজাদী’ রূপ নিল এক মহাকাব্যিক ঐক্যের গীতায়।

যে দেশে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর সংবিধান লেখা হয়েছিল সমতার বার্তা নিয়ে, সেই দেশের মাটিতেই আজও কোনো এক তরুণকে কেবল নিজের জাতের বাইরে ভালোবাসার অপরাধে পিটিয়ে মারা হয়। সেখানে আজও কৃষককে দেনার দায়ে বিষ খেতে হয়, আর অভুক্ত শিশু রাস্তায় হাত বাড়ায়। স্বাধীনতা দিবসের জাঁকজমকপূর্ণ প্যারেড আর লাল কেল্লার ভাষণের আড়ালে এই চরম সত্যটি আজ আমাদের চাবুকের মতো আঘাত করে—আমরা রাজমুকুট বদলেছি ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের মুক্তি আজও অধরা।

আজ ভারতের আজাদ হওয়ার দিন

রাস্তার ধারের দেওয়ালে আঁকা গ্রাফিতি থেকে শুরু করে বলিউডের ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘গলি বয়’-এর মূল হিপ-হপ ট্র্যাক—আজাদী ছড়িয়ে পড়ল প্রতিটি কোণে। ডিজে নাইটে তরুণদের নাচ থেকে শুরু করে খেতমজুরদের অধিকারের আন্দোলন—সবখানেই এখন এই একই শব্দ। এই স্লোগানের আসল জাদুটা ঠিক কোথায়? এর মূল শক্তি হলো এর অসীম নমনীয়তা। এর কোনো নির্দিষ্ট কপিরাইট নেই, কোনো রাজনৈতিক দলের একচ্ছত্র ইশতেহার নয় এটা। যারই কোনো না কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক শৃঙ্খল ভাঙার তাগিদ আছে, সে-ই এতে নিজের মনের সুর জুড়ে দিতে পারে:
“ভুখমারি সে—আজাদী!”
“সামন্তবাদ সে—আজাদী!”
“জাতিবাদ সে—আজাদী!”
এটি আসলে ক্ষমতার দম্ভের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এক যৌথ আত্মকথা। এই স্লোগান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাজপথের লড়াই যতই কঠিন হোক না কেন, যতক্ষণ হাতে ডাফলি আছে আর গলায় জোর আছে, ততক্ষণ কোনো স্বৈরাচারই মানুষের মুক্তির স্বপ্নকে স্তব্ধ করে দিতে পারে না।
কিন্তু স্বাধীনতার এতদিন পরও কেন আজও ‘আজাদী’? গল্পের সবচেয়ে করুণ আর মর্মান্তিক মোড়টি এখানেই।
পঁচাত্তর বছরেরও বেশি সময় আগে ব্রিটিশদের লাল চোখ উপড়ে ফেলে আমরা এক স্বাধীন সার্বভৌম ভারতের পতাকা উড়িয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, শৃঙ্খলমুক্ত এক মুক্ত ভোরের সূর্য উঠেছিল সেদিন। কিন্তু আজ, স্বাধীনতার এতগুলো দশক পার হয়ে যাওয়ার পরও, যখন একজন তরুণী মাঝরাতে নিরাপদে বাড়ি ফেরার স্বাধীনতার জন্য রাজপথে চেঁচিয়ে ওঠে—”পিতৃতন্ত্র সে… আজাদী!”—তখন বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে।

জাতিবাদ সে, ভুখামারি সে, সামন্তবাদ সে

আজাদীর এই স্লোগান আসলে এক গভীর বিষাদের স্মারক। এটি আমাদের লজ্জা দেয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, আমরা ব্রিটিশদের তাড়িয়ে রাজপথের শাসন বদলেছি, কিন্তু শোষণের অবকাঠামো বদলাতে পারিনি। স্বাধীনতার এত বছর পরও যখন এক আশি বছরের বৃদ্ধাকে অধিকার রক্ষার জন্য কনকনে রাতে শাহীনবাগের রাজপথে বসে ‘আজাদী’ বলে চেঁচাতে হয়, তখন বুঝতে হবে স্বাধীনতা আমাদের দরজায় এসে পৌঁছেছে ঠিকই, কিন্তু তা পৌঁছেছে কেবল এক সুবিধাপ্রাপ্ত সংখ্যালঘু শ্রেণীর জন্য। সাধারণ মানুষের কাছে স্বাধীনতা আজও এক অলীক রূপকথা।
প্রতিটি ‘আজাদী’ শব্দের উচ্চারণের পেছনে লুকিয়ে থাকে এক একটি ভাঙা স্বপ্নের ট্র্যাজেডি। আজাদী স্লোগানের এই বেঁচে থাকাটা আসলে কোনো আনন্দের উৎসব নয়, বরং আমাদের গণতন্ত্রের এক পরম পরাজয়। কারণ যে দেশে স্বাধীন থাকার কথা ছিল প্রতিটি নিঃশ্বাসের, সেই দেশে আজও মানুষকে শ্বাস নেওয়ার অধিকারটুকু চেয়ে রাজপথে ডাফলি বাজাতে হয়।
স্বাধীনতার সাত দশক পরও এই শব্দের প্রাসঙ্গিকতা কি আপনাকে অপরাধী অনুভব করায় না? আর কত বছর পথ হাঁটলে ভারতের বুকে এই ‘আজাদী’ স্লোগানের প্রয়োজন চিরতরে ফুরোবে?

অন্যান্য প্রতিবেদন.