দুইজনের নির্বাসনই বিতর্কিত তাই তাঁদের প্রত্যাবর্তনকেও যে বিতর্ক গায়ে মাখতেই হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মুজিবরকন্যা শেখ হাসিনা এবং লেখিকা তসলিমা নাসরিনের ‘ফেরা’ একই সময়ে চর্চায়। একজন ফিরতে চেয়েছিলেন পশ্চিম বাংলায়, আরেকজন ফিরতে চান বাংলাদেশে। দুইজনের নির্বাসনের কারণ, দেশ ছাড়ার কারণ সম্পূর্ণ আলাদা হলেও মিলও থেকে গেছে কিছু।
তসলিমাকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল ১৯৯০-এর দশকে। তাঁর লেখালেখিকে কেন্দ্র করে তৎকালীন বাংলাদেশে বিরাট বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে তাঁর নিরাপত্তা নিজের দেশেই প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। প্রাণনাশের হুমকি পেতে শুরু করেন তসলিমা। ১৯৯৪ সালে তাঁকে বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়তে হয়। তসলিমা আশ্রয় নেন পশ্চিম বাংলায়। বাংলাকেই আঁকড়ে বাঁচতে চান, কিন্তু এপার বাংলাতেও তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। আজ থেকে ১৯ বছর আগে রাতের অন্ধকারে তসলিমাকে শহর ছাড়তে বাধ্য করা হয়। চলে যেতে হয় তসলিমাকে। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলেও তিনি বাংলায় ফিরতে পারেননি। কিন্তু তাঁর একেরপর এক বই ‘নির্বাসনে’ও তাঁকে প্রাসঙ্গিক করে রাখে। মুসলিম মৌলবাদ , বাক স্বাধীনতা ,নারী স্বাধীনতা নিয়ে সরব তসলিমার লেখা দেশের গন্ডি পেরিয়ে তাঁকে বিদেশেও খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দেয়। তাঁর বই বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হতে শুরু করে।

এদিকে আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগে ৫ই অগাস্ট হাসিনাকেও বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল প্রবল ছাত্রআন্দোলনের চাপে পড়ে। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে কোটা সংস্কার আন্দোলন দ্রুত সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে পরিণত হয়। আন্দোলন দমনে মৃত্যুর খবর আসতে শুরু করে। জনঅসন্তোষ বাড়তে থাকে। ৫ আগস্ট বিক্ষোভকারীরা ঘিরে ফেলেন হাসিনার বাসভবন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রাণ হাতে বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে আসেন শেখ হাসিনা।
ঠিক যেই সময়ে ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরে এসে সংবর্ধিত হচ্ছেন তসলিমা নাসরিন সেই সময়েই ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রথমবার সাংবাদিক সম্মেলনে কথা বলেন শেখ হাসিনা। ধরে আসা গলায় হাসিনা বলেন “আমি ডিসেম্বরে দেশে ফিরব এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি”। হাসিনা জানান পরিকল্পিতভাবে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল। ওটা কোনও ছাত্র আন্দোলন ছিল না। ব্যালট বাক্স ছাড়া সরকার ফেলে দেওয়ার ব্লুপ্রিন্ট ছিল। তাঁর নামে মৃত্যু পরোয়ানা জারি আছে বাংলাদেশে। কিন্তু তাঁর কথায় ‘ আমি জেলে থেকে আমার সন্তানের জন্ম দিয়েছি। মানুষ সব ক্ষমতার উৎস। আমি একাধিকবার এর আগে গ্রেফতার হয়েছি। আমাকে দেশ ছেড়ে যেতে হয়েছে। আমাকে হত্যা করা হতে পারে। কিন্তু আমি এইসব নিয়ে চিন্তিত নই।’ এই মুহূর্তে বাংলাদেশে তাঁর দল নিষিদ্ধ। প্রয়াত খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের সরকার জানিয়ে দিয়েছে– হাসিনা ফিরলেই তাঁকে গ্রেফতার করে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হবে। যদিও এই ক্ষেত্রে হাসিনার রক্ষাকবজ ভারত সরকার।
এই দুই বিতর্কিত ব্যক্তিত্বকেই সাদরে অতিথির মর্যাদা দিয়েছে ভারত সরকার এবং এই বাংলার নব্য নির্বাচিত পশ্চিমবঙ্গ সরকার। দুইজনেই দুই বাংলার কট্টর মৌলবাদীদের চক্ষুশূল। বুলেটপ্রুফ নিরাপত্তা, শরণার্থীর সম্মান, অতিথির মর্যাদা সবই তাঁদের মিলছে। সেই ভারতবর্ষে যেখানে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে অনুপ্রবেশ, CAA, NRC-র মতো ইস্যুগুলি বড় প্রাসঙ্গিক। এই একই সময়ে ওপার বাংলা থেকে আসা মুসলমানদের বাংলাদেশি বলে পুশব্যাক করা হচ্ছে। এইবাংলার মুসলিমদেরও আখচার বাংলাদেশি তকমা মিলছে। কিন্তু এদেশে আপাতত নিরাপদে আছেন তসলিমা-হাসিনা। তসলিমা আর ফিরতে চান না বাংলাদেশে, কিন্তু হাসিনা ফিরতে মরিয়া। সম্পূর্ণ দুই ভিন্ন জগতের ব্যক্তিত্ব তাঁরা। তাঁদের প্রত্যাবর্তন সম্পর্কিত নয় পরস্পর। তবুও তাঁদের ফিরতে চাওয়া যেই বাস্তবিক দাবিগুলির উপর দাঁড়িয়ে- সেই দাবিতেই নিজের দেশে-নিজের ভাষায় কথা বলে বাঁচতে চান না জানি কত মানুষ। কিন্তু ‘কাগজ’ দেখাতে না পারলে যে দেশে থাকা যায় না-এও সত্যি।

