বয়স বাড়লে শুধুই কি নোলা বাড়ে! না কি স্মৃতিরা এসে খোঁচা মারে মগজে, খানিকটা উদরেও। আজ এই জোম্যাটো- সুইগি ঘন সময়ে রেস্তোরা, এমনকি স্ট্রিট ফুডও ‘দুয়ার খাবার’ ট্যাগলাইনে রাত বারোটাতেও বাড়িতে উপস্থিত, ইউ টিউবের দৌলতে ঘরে ঘরে যখন বেলাদি তখন আরো বেশি করে মনে পড়ে আশির দশকের কথা, যখন আমরা নেহাৎই ছাত্র। সেই সময় শিল্প ও কয়লাখনির দৌলতে আসানসোল দেশের এক গুরুত্বপূর্ণ শিল্প শহর, অন্তত রেভেনিউ কালেকশনের দিক থেকে তো বটেই। শহরে নাগরিক পরিষেবা রয়েছে কিন্তু বার্নপুর সহ বিস্তীর্ণ অংশটা নোটিফায়েড এরিয়া অথরিটির অধীনে। এখন শহরটা যেভাবে আড়ে-বহরে বেড়ে এক কিম্ভুতকিমার চেহারা নিয়েছে, তখন ছবিটা ছিল অন্যরকম। পাড়ায় পাড়ায় নিত্য নতুন দোকান তখন দেখা যেত না, কেনাকাটা, খাওন-দাওন ছিল মূলত বাজার কেন্দ্রিক। আসানসোল বড় বাজার, তবে ইস্পাত কারখানার দৌলতে বার্নপুরও ছিল জমজমাট। সেই সময়ে আমাদের রসনা তৃপ্তির আয়োজন ছিল সীমিত কিন্তু তারও এক আকাশ স্মৃতি আজও জাগরুক।
খাবারের ক্ষেত্রে প্রথমেই মনে পড়ে স্কুলের কথা। আসানসোল রামকৃষ্ণ মিশন তখন পুরোনো জায়গায় অর্থাৎ আশ্রম মোড়ে। সেইসময় ইস্কো কোম্পানির স্কুল বাস সার্ভিস থাকার কারণে বাড়ি থেকে বাসভাড়া জুটত না। জ্যামিতি বক্সে পাঁচ টাকা দেওয়া থাকত হঠাৎ কোন দরকারে খরচ করার জন্য। এর বাইরে এক টাকা, তাও নিয়মিত নয়। বাড়ি থেকে টিফিন দিত তাই ঐ টাকার বেশি আশাও করতাম না। টিফিনের সময় গেটের বাইরে বসত অনেকে তাদের পসরা নিয়ে।গেটের ফাঁক দিয়ে পয়সা দিয়ে সবাই কিনত। আমার আকর্ষণ ছিল গঙ্গামাটি বলে মার্বেলের মত একটা বস্তুর দিকে। এখন যেমন বাহারী আচারের দোকানে হজমি গুলি পাওয়া যায়, গঙ্গামাটি সেরকম ছিল না। এটা অনেকটা শক্ত, গায়ে গঙ্গামাটির মত গুড়ো, অনেকটা নাড়ুর মত, চুষতে চুষতে মজাটা নিতে হত। যিনি বিক্রি করতেন, তার নাম ছিল সরযু। আর ছিল হারুর ফুচকা, ঘুগনির দোকান। আলুকাটাও পাওয়া যেত। তবে গরমের সময় সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল আইসক্রিমের। এখনকার মত কাপ বা কোণে নয়, সোজাসুজি কাঠির উপর রঙিন বরফ। অরেঞ্জ আর মালাই ছিল পরিচিত। এছাড়া আরেকটা আইসক্রিম ছিল, যার কথা না বললেই নয়। এই আইসক্রিমকে আমরা বলতাম চিঁড়ে আইসক্রিম, বরফের উপরভাগে চিঁড়ে। সে সময় প্রতিটি মধ্যবিত্ত বাড়িতে তাদের সন্তানদের পঁই পঁই করে শেখানো হত যে সমস্ত আইসক্রিম ড্রেনের জলে তৈরি হয়,খেলে অসুখ বিসুখ হবেই। সেই সাবধানবানীকে পকেটে রেখেই আমরা নিয়ম করে আইসক্রিম খেতাম। এ প্রসঙ্গে বলি সে সময় আসানসোল শহরের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র চিত্রা সিনেমা হলের পাশেই একটা আইসক্রিমের কারখানা ছিল। মালিকের নাম জ্ঞানী সিং, তার ছেলে টিটু আমার বন্ধু হওয়ার কারণে বেশ কয়েকবার বিনা পয়সায় আইসক্রিম জুটেছিল।

আশির দশকে আমাদের খাবারের স্মৃতির সঙ্গে অনেকটাই জুড়ে ছিল আসানসোল বাজার। সে সময় আমাদের মত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে বাজার যাওয়া রীতিমত একটা ‘ইভেন্ট’ বলে বিবেচিত হত। চিত্রা মোড় থেকে বাসে করে বাজার যাওয়ার ঘটনা ঘটত পুজোর বাজার, বড়দিন, নিমন্ত্রণ বাড়ির উপহার কেনা বা এইরকম নির্দিষ্ট কিছু ঘটনায়। তবে দশম শ্রেণি থেকে আমি যখন সাইকেলে স্কুল যাওয়া শুরু করি তখন ছবিটা পাল্টে যায়।এক্ষেত্রে প্রথমেই মনে পড়ে ভ্যালি ভিউ বলে দোতালায় অবস্থিত একটা রেস্তোরাঁর কথা। ওখানে বসলে খোলা জানলা দিয়ে বাসস্ট্যান্ড দেখা যেত (তখন বাসস্ট্যান্ড ছিল বাজারের মাঝে), চারিদিকের হৈ হল্লা দেখতে দেখতে আমরা মোগলাই পরোটা খেতাম। সেখানেই প্রথম শিখি কিভাবে কাঁটা- চামচ ব্যবহার করতে হয়। মোগলাই এখন বাজার হারালেও সেইসময় খুবই জনপ্রিয় ছিল। বিশেষ করে আলুর তরকারি, সস এবং অবশ্যই কাসুন্দি। আশির দশকের মাঝামাঝি মোগলাই এবং ফিশ ফ্রাই খাবার আরেকটা খুব ভালো জায়গা ছিল হটন রোড মোড়ের রেল ক্যান্টিন। সমবায় করে চলত, পরে উঠে যায়। বাবা- মায়ের হাত ধরে বাজারে আর যে সমস্ত দোকানে খেয়েছি তার মধ্যে প্রথমেই যে নামটি মনে আসে তা হল বেনারস মিষ্টান্ন ভান্ডার। এখন কার মত বিদঘুটে কচুরি নয়, ওখানে পাওয়া যেত রাধাবল্লভী ও ঘুগনি। সে স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে, জানি না এখন কোনো দোকান নিয়মিত রাধাবল্লভী বানায় কি না! বেনারসে খুব ভিড় থাকলে ওর পাশের শ্রীকৃষ্ণ বলে আরেকটা মিষ্টির দোকানে বাবা নিয়ে যেত। সেটাও বেশ ভালো ছিল। তবে রাধাবল্লভী খাওয়ার পর অর্ডার হত রসগোল্লার। অন্য মিষ্টি বলাই হত না। এইভাবে শেষপাতে অন্য মিষ্টি ছেড়ে এই বাধ্যতামূলক রসগোল্লা খাওয়াটা আমার মোটেও পছন্দ ছিল না। পরবর্তীতে আসানসোল বাজারে যারা যেত তারা প্রায় নিয়ম করে মাধুরীর ছোলা- বাটুরে খাওয়া শুরু করে।আমরাও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। জমজমাট ভিড়, সবার অর্ডার এক, দোকানের বাইরে ঘর্মাক্ত এক লোক বাটুরে ভেজে চলেছে, আর নিমেষের মধ্যে কর্মচারীরা পৌঁছে দিচ্ছে টেবিলে টেবিলে। সম্ভবত ওর দুটো দোকান পরে ছিল জনতা মিষ্টান্ন ভান্ডার। ভালো সিঙ্গারা ও জিলিপি পাওয়া যেত, তবে অবাঙালি স্টাইলের।যে দোকানগুলোর কথা বললাম, কালের নিয়মে আজ সবাই হারিয়ে গেছে, শুধু টিমটিম করে জ্বলছে মাধুরী। তবে আজ যখন অলিতে গলিতে ছোলা- বাটুরে সহজলভ্য তখন স্বাভাবিক ভাবে সেই ক্রেজটা আর নেই।

আসানসোল বাজার অঞ্চলের আরো কিছু স্মৃতি রয়েছে যা আমাদের ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ১৯৮৪ সালে মাধ্যমিক পাশ করার পর সোজা বি বি কলেজ কারণ তখন কলেজে একাদশ – দ্বাদশ শ্রেণি পড়ানো হত। শুরু হল কলেজ পালানো,আসানসোল- বার্নপুর মায় রানিগঞ্জ পর্যন্ত সমস্ত সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমা হলে যাতায়াত এবং অবশ্যই ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া। সেই সময়ে আসানসোলের প্রায় সব কিশোরদের গল্পে দুটো দোকানের নাম থাকবেই। প্রথাগত নাম অবশ্য ছিল (আজ আর মনে নেই), তবে আমাদের কাছে জন ও ভাবির দোকান। দুটোই চাইনিজ খাবারের দোকান।এখানেই আমরা প্রথম খাই চিলি সস ও এক গাদা পেঁয়াজ সহযোগে পর্ক চাও।তবে বেশিরভাগ মানুষের উচ্চারণে তা ছিল পোক চাও। আসানসোলের সুবিখ্যাত টেলার্স রেক্সকে অতিক্রম করে নালির ধারে দুটো দোকান। প্রথমে জনের দোকান, পরিসর বড় ও খাবারের মান ভালো। ভাবির দোকানের খাবার খারাপ ছিল এমন নয় তবে ঐ দোকানের ইউএসপি ছিল ভাবী স্বয়ং। সত্যি কথা বলতে কি আসানসোলের মানুষ চাইনিজ খাবার খেতে শিখেছে এই দুটো দোকান থেকে। ছাত্র থাকাকালীন বাজেট থাকত খুব টানটান তাই নুডলসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ভাজা মাংসেই ছিল আমাদের রসনা তৃপ্তি। তবে পরে ওখানে বেশ কয়েকবার পর্ক ফ্রাই খেয়েছি। তবে সম্ভবত নব্বই এর দশকের শেষ দিকে দোকান দুটো উঠে যায়। শুনেছিলাম জন অন্য দেশে চলে গেছেন। তবে ততদিনে অন্য বিকল্প চলে এসেছে। কোর্ট বাজারে দীর্ঘদিন ধরে দোকান চালিয়েছে বাদশা চাও সপ। গুণে ও মানে বেশ ভালো, বহুবার খেয়েছি। আর বার্নপুরে প্রতাপ চাও সপ সম্ভবত আজও টিকে আছে। আজকাল মাল্টি কুইজিন রেস্টুরেন্টের কথা খুব শোনা যায়। এক্ষেত্রে আসানসোলে আশির দশকেই আমরা মাল্টিকুইজিন রেস্টুরেন্টে দেখেছি। নাম ছিল বাবা হোটেল, রুটি – তড়কা, ইডলি, ধোসা সব পাওয়া যেত সেখানে। তবে রাহালেন পেরিয়ে ভারত কফি হাউস ছিল সাউথ ইন্ডিয়ান খাবারের সেরা ঠিকানা। ওখানে খুব ভালো কফি খাওয়ার স্মৃতি রয়েছে। আর ছিল শশী কাফে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে দুপুরের দিকে ঐ কাফেতে দুষ্টু- মিস্টি ইংরেজি ছবি দেখানো হত, সঙ্গে থাকত কমপ্লিমেন্টারি আইসক্রিম। মোগলাই খানার জন্য রয়্যালের নাম তখনো পরিচিত ছিল, আজও সে একই ভাবে ভাস্বর। তবে আমার এখনো মনে আছে বন্ধ নিউ সিনেমার পাশের এঁদো গলিতে নাসিমের দোকানের কথা। ওখানে বিরিয়ানি পাওয়া যেত, তবে সেটা বোধহয় নব্বইএর দশকের শুরুর দিকের কথা। আর একটা স্ন্যাক্সের দোকানের কথা না বললেই নয়, তা হল গোধূলি সিনেমার গলিতে লাবেলার কথা। চিকেন ও মাছের নানান ধরণের পদ ছিল এদের সিগনেচার ডিস। বহুদিন পরে লাবেলা গিয়ে দেখলাম দোকানটা আজও ভালো ভাবেই চলছে।

আজকের প্রজন্ম মিষ্টির সেরকম ভক্ত নয়। সুগার আর কার্ব ফ্রি যে প্যারালাল ইউনিভার্স তারা বানিয়ে চলেছে তাতে মিষ্টির কোন জায়গা নেই। কিন্তু আমাদের আশির দশকের গল্পে মিস্টি মাস্ট। সে ক্ষেত্রে বার্নপুরের দুটো দোকানের কথা দিয়ে শুরু করতেই হবে। প্রথমটা আজও মারকাটারি ব্যাটিং করা জলযোগ। এই অঞ্চলে থাকেন অথচ সেসময় জলযোগের লাল দই খাননি, এমন লোকের সন্ধান পাওয়া গেলে তাকে নিশ্চিত জাদুঘরে চালান করা হত। ওখানকার রাজভোগেরও নাম ছিল। আরেকটা অবশ্যই বার্নপুরের মিষ্টি মহলের। আজ বিগতযৌবনা কিন্তু সে সময় দামোদর নদ পেরিয়ে পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার কাছের গ্রামগুলোতে বিয়ে, অন্নপ্রাশনে, উপনয়নে মিষ্টি মহল থেকে দই- মিষ্টি যেত। বার্নপুর স্টেশন থেকে রেলগাড়ি চেপে তাদের অন্য জেলায় যাত্রা। সব মিষ্টি পাওয়া গেলেও ওখানকার অরেঞ্জ (কমলাভোগ) ছিল জনপ্রিয়। এখন যেমন ভুজিয়া কিং দের দৌলতে অবাঙালি মিষ্টি বাঙালির খাদ্য তালিকায় অনিবার্য স্থান করে নিয়েছে, সে সময় এমনটা ছিল না। তবে স্টেশন রোডের নটরাজ বলে একটা দোকানে লাড্ডু, প্যাঁড়া, শোনপাপড়ি ও গাঠিয়া পাওয়া যেত। এরকম আরেকটা জায়গা ছিল গোধূলি সিনেমার পাশে কাচ্ছি ভাজার দোকান। তবে আসানসোলের মিষ্টির ইতিহাস সম্পূর্ণ হবে না রঞ্জন কেবিন ছাড়া। এক ভিন্ন স্বাদের রসমালাই, দই, লালমোহন, ছানার জিলিপি। এই দোকানের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হল পরিমাণে কম বানানো। একটু দেরিতে গেলেই শোকেস খাল্লাস। অবশ্যই আসানসোলে আশির দশকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান চাচীর দোকান। তবে এই দোকানে ছাত্রাবস্থায় আমি খাই নি বললেই চলে তাই মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলাম।

সব খাবারই যে খুব উচ্চ মানের হতে হবে এমন মাথার দিব্যি কে দিয়েছে! আমাদের ছোটবেলায় আসানসোলে আরো অনেক ছোটখাটো দোকান ছিল যা আমাদের মন ভালো করে দিত। স্টেশন থেকে বেড়িয়ে তেরো নম্বরের চা। রীতিমত ভিড় জমে থাকত। দুধের সমুদ্রে অবগাহন করছে সস্তার চা পাতা, তাতে ফেলা হচ্ছে এলাচ, সে এক স্বর্গীয় বিষয়। আসানসোলের প্রান্তে অবস্থিত গোপালনগরে ছিল কানুয়ার দোকান। সে দোকানে একটা সময় ছিল আমার নিত্য যাতায়াত। সেখানে ছোট সাইজের সিঙ্গারা,কখনো পয়সা থাকলে জিলিপি ও অবশ্যই চা। বার্নপুর বেকারির প্যাটিস ও মিনারের কেকে লুকিয়ে থাকত আমাদের ছোটবেলার গন্ধ। আসানসোল শহরটা তখন এত কংক্রিটের জঙ্গল হয়ে যায়নি, সে সময় চিত্রা মোড়ে দুভাই বড় অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে নিয়ে আসত দই বড়া আর ঘুগনি। মনে নেই কখন তারা হারিয়ে গেল। ক’জন মনে রেখেছে রাধানগর রোডের সুইটস কর্নারের কালাকাঁদ আর এলআইসির উল্টো দিকের আলেয়া সুইটসের পান্তুয়ার কথা। সদর হাপাতালের পাশের একটা দোকানে একমাত্র অমৃতি বানাত। আর শহর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অজস্র তেলেভাজার দোকান। পকেটে যার যা আছে তা বের করে আমাদের সেই সবার খাওয়া, সবার যাপন। এই ভাবে ছোটবেলা হারিয়ে যায়, বড়োবেলা আসে। নতুন প্রজন্ম, নতুন দোকান, নতুন ফুড হ্যাবিট জায়গা নেয়। আমি গঙ্গামাটির স্মৃতি নিয়ে বাঁচি।

