কেন্দ্রের ‘পরিবেশ বান্ধব জ্বালানি’ তৈরি করতে গিয়েই বিশ্বের সবথেকে দূষিত স্থান বার্নিহাট?

৮৮ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

মেঘালয় শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সবুজে মোড়া পাহাড়, স্বচ্ছ নদী এবং সেখানকার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছবি। সম্প্রতি সেই সৌন্দর্যের ওপরে জমতে শুরু করেছে কালো আস্তরণ। গ্রাউন্ড জিরোয় পৌঁছে তেমনটাই জনসমক্ষে তুলে ধরলেন সাংবাদিক সার্থক গোস্বামী।

এত দিন পর্যন্ত দিল্লি-নয়ডার অতিরিক্ত বায়ু দূষণ চর্চিত বিষয় ছিল। কিন্তু সুইস সংস্থা QAir রিপোর্ট বলছে , ২০২৪ সালে বায়ুদূষণের নিরিখে শীর্ষে ছিল মেঘালয়–আসাম সীমান্তের  Byrnihat শহর। গুয়াহাটি থেকে মাত্র ২০-২৫ কিমি দূরে অবস্থিত এই শহরের বার্ষিক গড় PM2.5-এর ঘনত্ব ছিল ১২৮.২ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার (µg/m³)। যা World Health Organization (WHO)-এর নির্ধারিত নিরাপদ সীমার তুলনায় প্রায় ২৫ গুণ বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, Byrnihat শহরে এই মারাকত্মক দূষণের প্রধান কারণ হল ইথানল উৎপাদনকারী ডিস্টিলারি শিল্প’সহ অন্যান্য ভারী শিল্পকারখানার ব্যাপক বিস্তার। প্রসঙ্গত, সরকারের ইথানল-কেন্দ্রিক জ্বালানি নীতি বর্তমানে বাকি সমস্ত বিতর্ককে ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। ইতিমধ্যেই দেশে E20 অনিবার্য করা হয়েছে। এমনকী আংশিকভাবে E85 চালু করা হয়েছে। যার জেরে পুরোনো মডেলের গাড়ি ব্যবহারকারী চলোকেরা অস্বস্তির মধ্যে পড়েছেন।

অন্যদিকে, ১০০% ইথানল বা E100 ব্যবহারের সম্ভবনার কথা ঘোষণা করেছেন খোদ নীতিন গাডকরি। শিল্প সম্প্রসারণ ও জ্বালানি নীতির পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সাংবাদিক স্বার্থক গোস্বামী তাঁর ডকুমেন্টারিতে Byrnihat শহরের দূষণ গাছপালার করুণ অবস্থার দৃশ্য দেখিয়েছেন। সেখানেই দেখা যায়, ওই শহরের গাছের পাতা স্পর্শ করলেই হাত কালো হয়ে যাচ্ছে, যেন আলকাতরা। গোটা আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে রয়েছে। এই ভয়াবহ দৃশ্যই বলে দেয়, কলকারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া পরিবেশ ও প্রাণীকুলের জন্য কতটা বিপজ্জনক।

সাংবাদিক তাঁর প্রতিবেদনে বলেছেন, “কারখানার মুনাফায় মালিক ফুলে ফেঁপে ওঠে, অথচ এলাকাবাসীদের কপালে জোটে শুধুই বিষাক্ত বায়ু।”  ইথানল উৎপাদনকারী কলকারখানাকে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে করে সাংবাদিক সার্থক কটাক্ষের সুরে আরও বলেন, “এই তো বলা হচ্ছিল পরিবেশ বান্ধব পদ্ধতিতেই নাকি ইথানল উৎপাদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। কিন্তু এখানে তো উন্নয়নের নামে তামাশা চলছে।”

ওই অঞ্চলের গারো, খাসি জনজাতির মানুষেরা নির্ভীকভাবে সাংবাদিকের ক্যামেরার সামনেই মুখ খুলেছেন এবং তাঁদের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাঁরা জানান, কীভাবে শহরজুড়ে গজিয়ে ওঠা কারখানাগুলোর নির্গত ধোঁয়া ও দূষণের ফলে তাঁদের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীরা রোগে পড়ছে। এমনকি ক্যান্সার, শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় অনেকের  মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে।

প্রতিবেদনটি কেবল বায়ু দূষণের বাস্তবতার ওপরেই থেমে নেই। সাংবাদিক শব্দ দূষণ বৃদ্ধির সত্যতা নিশ্চিত করতে  দর্শকদের কলকারখানার বিকট শব্দ শোনান। সেই সঙ্গে দর্শকদের তিনি মেঘালয়ের সাম্প্রতিক অতীত ও বর্তমানের পার্থক্য বোঝান। তিনি বলেন,  কিছুবছর আগেও  যে অঞ্চলে দিনভর পাখির কিচিরমিচির শোনা যেত।সেখানে এখন শুধুই কল-কারখানার বিকট শব্দ শোনা যায়। উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, সাংবাদিক যখন গোটা শহরের ছবি ড্রোন ক্যামেরার মাধ্যমে দেখাতে চেষ্টা করেন, তখন বাতাসে উপস্থিত দূষিত কণাগুলোকে  যন্ত্রাংশটি অনিরাপদ বলে চিহ্নিত  করে।

  গতবছর অসম ও মেঘালয় —দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর যৌথ উদ্যোগে গঠিত কমিটি দূষণ নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। সেই সময় কয়েকটি কোম্পানিকে জরিমানার নোটিস পাঠানো’সহ কিছু কারখানায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়ছিল। কিন্তু চলতি বছরে কমিটি নীরব ভূমিকা পালন করছে বলে জানান সাংবাদিক সার্থক গোস্বামী।

ওই এলাকায় নাকি মদের ফ্যাক্টরিরও ছড়াছড়ি, তেমনটাই স্থানীয় এক বাসিন্দা সাংবাদিককে জানান। যিনি সাংবাদিককে ওই অঞ্চল ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন। তাঁর কথায়,  শাকসবজির ওপরেও ধুলো-ময়লার স্তর থাকে, যা পরিষ্কার করতে কমপক্ষে তিন বার ধুতে হয়। আরেক মহিলা তো মুখের ওপর বলেই দিলেন,  কারখানার ধোঁয়ার জন্য প্রকৃতিকে কম খেসারত গুনতে হচ্ছে না। প্রতিবেদনের শেষের অংশে, সাংবাদিক নামমাত্র তাৎক্ষণিক উন্নয়নের ওপর নয় বরং দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন। তার মতে, sustainable development দেশের প্রকৃত উন্নয়নের চাবি কাঠি। সেই সঙ্গে সাংবাদিক প্রশ্ন তোলেন, বিষাক্ত যৌগের মারণঘাতী ধোঁয়া ও জিডিপি পরিসংখ্যান কি দেশের উন্নয়নের মানদণ্ড?

শুট চলাকালীন এক ফ্যাক্টরির নিরাপত্তারক্ষী সঙ্গে তুমুল বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন জনপ্রিয় ওই সাংবাদিক। নিরাপত্তারক্ষী ফ্যাক্টরির আশেপাশে সাংবাদিককে ভিডিও রেকর্ড করতে নিষেধ করেন। তখনই দু’ই পক্ষের মধ্যে তর্ক শুরু হয়। ওই নিরাপত্তারক্ষী আন্তর্জাতিক সমস্যার প্রসঙ্গ টেনে এনে সাংবাদিককে বলেন, “ইরান-আমেরিকার যুদ্ধ চলছে আর আপনি এসব করছেন।” পাল্টা জবাবে  সার্থক গোস্বামী বলেন,  “যুদ্ধ হচ্ছে বলে  ফ্যাকট্রির কারণে দিন দিন ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, সেই তথ্য তুলে ধরব না?”

কমেন্টে অনেকেই সাংবাদিককে আর্থিক সহায়তা এবং তাঁর কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কেউ কেউ আবার কত টাকা অনুদান দিয়েছেন, সেটাও লিখেছেন। এর থেকেই স্পষ্ট যে স্বাধীন সাংবাদিকদের প্রতি মানুষের বিশ্বাস বাড়ছে। এখন মানুষ আর রাজনৈতিক সিরিয়াল দেখতে চায় না।  বিকেলের চায়ের আড্ডার সঙ্গী টিভি চ্যানেলের ডিবেট হয় না। বরং আজকের সচেতন মানুষেরা গ্রাউন্ড জিরো রিপোর্ট দেখতে চান। পরিবেশ সচেতনতা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন পড়তে চান। পাশাপাশি, সিস্টেমের গাফিলতি, নীতিগত দুর্বলতার বিষয়ে  জানতে ও বুঝতে চান । যাতে তাঁরা বাস্তব পরিস্থিতির সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে পারেন।

হয়তো অভিনেতা থেকে নেতা হয়ে ওঠা কিংবা  দল বদলু রাজনীতিকদের খবরের ভিড়ে এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ খবর শিরোনামে ঠাঁই পায় না। ঠিক সেই  শূন্যস্থানেই জায়গা করে নিচ্ছে স্বাধীন সাংবাদিকদের কাজ। ফলে, নাগরিক সমাজের কাছে স্বাধীনচেতা সাংবাদিকদের গ্রহণযোগ্যতা ক্রমশ বাড়ছে। বলাই বাহুল্য, তাঁদের প্রতি নতুন করে আস্থা রাখতে শুরু করেছে মানুষ।

অন্যান্য প্রতিবেদন.