উচ্চমাধ্যমিক মাধ্যমিকের মেধাতালিকায় যেসমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ধারাবাহিকভাবে জ্বলজ্বল করে, তার অন্যতম নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন। স্বামী বিবেকানন্দের তৈরি রামকৃষ্ণ মিশনের নিয়মানুবর্তিতাই এই প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য, গর্ব, অহংকার। উৎকৃষ্ট মেধার চাষ, প্রাচীন ভারতীয় আশ্রমিক ব্যবস্থা, গুরু-শিষ্য পরম্পরা – আধুনিক শিক্ষাঙ্গনের থেকে মিশনকে খানিক আলাদা করেই রেখেছে। ফলাফলের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও বজায় রেখে আসছে মিশন। তবে এবার এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাফল্য নয়, বরং ছাত্রমৃত্যুর ঘটনায় শিরোনামে। ছাত্রদের বিরুদ্ধতার আঙুল উঠেছে প্রতিষ্ঠানের অন্দরে।
দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র দীপ্তাংশু মাহাতোর মৃত্যুতে উত্তাল মিশন। মাস্টারমশাইয়ের ফুটন্ত গরম চা খেয়ে মৃত্যু হয় ওই ছাত্রের। গাফিলতির অভিযোগ উঠছে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। মৃত ছাত্রের এক সহপাঠী জানায়, মিশনের নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৭টার পর আর দেওয়া হয় না চা। কিন্তু আগের দিন রাতে ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে রাত জাগতে হয়েছিল দীপ্তাংশুকে। সেই ভেবে, ক্লাসে নিয়ে যাওয়ার সময় খানিক ‘দুষ্টুমি’ করেই মাস্টারমশাইয়ের ফ্লাক্স থেকে গরম চা গিলে ফেলে দীপ্তাংশু। ফুটন্ত গরম চা-য়ে তৎক্ষনাৎ ওর জিভ গলা পুড়ে গেলেও তা উগলে দেয়নি পাছে বকা খেতে হয়। এরপরেও ক্লাসও করে ও। সহ্যের সীমা অতিক্রম করলে দীপ্তাংশু ওয়ার্ডনের কাছে যায়। প্রার্থনার সময় হয়ে যাওয়ায় তখনও তাকে অপেক্ষা করতে হয়। মিশনের ডাক্তার দেখেই অবিলম্বে ওকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললেও, দীপ্তাংশুর বাড়ির লোকের আসার অপেক্ষা করা হয়। বাবা আসা মাত্রই তড়িঘড়ি ওকে হাসপাতালে নিয়ে ছোটা হলেও শেষ রক্ষা হয়নি৷ বাবার ঘাড়ে মাথা রেখে পছন্দের টিম ব্রাজিলের ম্যাচ দেখতে দেখতেই কখন ও চিরঘুমে আচ্ছন্ন হয়েছে, ধরতে পারেননি বাবাও। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে ওই ছাত্রকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।

পাঁচতারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রমৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। দুর্ঘটনা দুর্ভাগ্যজনক বটেই, কিন্তু গাফিলতি শাস্তিযোগ্য, এবং তীব্র নিন্দনীয়। সচরাচর রামকৃষ্ণ মিশনের অভ্যন্তরীণ ঘটনা, নিয়ম-কানুন লোকচক্ষের সামনে আসে না। কিন্তু এই ঘটনা সামনে এনে দিয়েছ আরও বেশ কয়েকটি দিক।
কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, শাসন, বারণ নিঃসন্দেহে ছাত্রাবস্থায় মূল্যবান। কিন্তু সেই বকুনির ভয় যদি এই ছাত্র শেষ মুহূর্তে না পেত, বোধহয় এযাত্রায় ওর প্রাণটুকু বেঁচে যেত। ভক্তি, সম্মান, শ্রদ্ধা আর বিনয়ের সঙ্গে ভয়ের পার্থক্য রয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রেও ভয় পাওয়ার এই কারণ বুঝে ওঠা দরকার। একেই পড়াশোনার যে প্রবল মানসিক চাপ মাথায় নিয়ে তারা ইঁদুর দৌড়ে নামে সেখানে দুএকটা হাওয়া ঢোকার জানলা খোলা না রইলে দমবন্ধ হয়ে যায় যেকোনও চারদেওয়ালই।
প্রতিষ্ঠানের উজ্জ্বল তারাদের একজন ছিল দীপ্তাংশু, ও নয় শিখবে নয় শেখাবে। আত্মীয় পরিজন, পরিবার, বাড়ি ছেড়ে যারা প্রতিষ্ঠানকে আলো করতে আসছে, তাদের মূল্য দিতে ভুল নিশ্চিত শুধরে নেবে মিশন। একইসঙ্গে, প্রশ্নহীন আনুগত্যের বদলেও কিছু ছাত্র প্রশ্ন করতেও শিখবে।

