“A uniform law, though is highly desirable, enactment thereof in one go perhaps may be counter productive to UNITY & INTEGRITY of the nation.”
-The Supreme Court of India’s observation in Pannalal Bansilal Pitti & Ors. V. State of Andhra Pradesh & Anr. (1996)
ইউনিফর্ম সিভিল কোড। বিতর্কিত ইউনিফর্ম সিভিল কোড। উত্তরাখণ্ড, গুজরাট ও অসম মডেলেই এবার পশ্চিমবঙ্গেও চালু হতে চলেছে ইউনিফর্ম সিভিল কোড। সোমবার বিধানসভায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল পেশ করবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। যার মূল উদ্দেশ্য হলো ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইন (Personal Laws)-এর পরিবর্তে এমন একটি অভিন্ন দেওয়ানি আইন প্রবর্তন করা, যা ধর্ম, সম্প্রদায় বা বিশ্বাস নির্বিশেষে ভারতের সকল নাগরিকের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। এই আইনের আওতায় বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, ভরণপোষণ, দত্তক গ্রহণ, অভিভাবকত্ব, উত্তরাধিকার এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়সমূহ নিয়ন্ত্রিত হবে। বর্তমানে এদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের জন্য পৃথক পার্সোনাল ল বলবৎ আছে। হিন্দুদের জন্য হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্ট, হিন্দু সাকসেসন অ্যাক্ট বা হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, একইভাবে মুসলিমদের জন্য রয়েছে মুসলিম পার্সোনাল ল’, খ্রিস্টান ও পারসিদের জন্য পৃথক ব্যক্তিগত আইন রয়েছে। ইউসিসি লাগু হলে এই পৃথক ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে আসবে সবার জন্য একটিই মাত্র অভিন্ন দেওয়ানি আইন।
ভারতের মতো বহু ধর্মের, বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতির দেশে সবার জন্য অভিন্ন দেওয়ানি আইন কি আদৌ বাস্তবসম্মত? এই আইন বলবৎ করার পেছনে সত্যিই কি “Equality before Law” ‘র ধারণা রয়েছে? না এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর ষড়যন্ত্র?
ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা অভিন্ন দেওয়ানি আইন আসলে সাংবিধানিক বহুত্ববাদের ওপর আক্রমণ। আইনের অভিন্নতা যদি ভারতীয় সংবিধানের দর্শন হয়ে থাকে, সাংবিধানিক বহুত্ববাদও একই সংবিধানের দর্শন। এদেশের বহুধার্মিক ও বহুজাতিক সমাজে পারিবারিক সম্পর্ক, বিবাহ, উত্তরাধিকার এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত আইনও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন রূপে বিকশিত হয়েছে। ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় সমাজে একটি দ্বৈত আইনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। একদিকে তারা ফৌজদারি আইনকে অভিন্ন করে তোলে; অন্যদিকে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার ও পারিবারিক বিষয়ে ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইন বহাল রাখে। সংবিধান প্রণেতারাও ইউসিসি-কে অবিলম্বে বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করার পক্ষে ছিলেন না। যদি সংবিধান প্রণেতাদের মূল উদ্দেশ্য অবিলম্বে একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রবর্তন করা হতো, তবে তাঁরা ব্যক্তিগত আইন সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে কেবলমাত্র সংসদের একচ্ছত্র আইন প্রণয়ন ক্ষমতার অধীন রাখতেন এবং সেজন্য এগুলোকে সংবিধানের ইউনিয়ন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতেন। কিন্তু বাস্তবে ‘ব্যক্তিগত আইন’ সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে সমবর্তী তালিকা (Concurrent List)-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে এই বিষয়ে সংসদ এবং রাজ্য বিধানসভা—উভয়েরই আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রয়েছে (সংবিধানের সপ্তম তফসিল অনুযায়ী)। গণপরিষদের অন্যতম সদস্য বি. পকার সাহেব বাহাদুর উল্লেখ করেছিলেন যে, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রবর্তনের বিরোধিতায় বিভিন্ন সংগঠনের কাছ থেকে তাঁর কাছে স্মারকলিপি আসে। সেই সংগঠন গুলোর মধ্যে শুধুমাত্র মুসলিম সংগঠনই নয়, হিন্দু সংগঠনও ছিল। এদেশের সংবিধানের মূল স্থপতিকার ভীমরাও আম্বেদকর উল্লেখ করেছিলেন– কোনো সরকারই সংবিধানের বিধানসমূহকে এমনভাবে প্রয়োগ করতে পারে না, যার ফলে মুসলিম সম্প্রদায়কে বিদ্রোহের পথে ঠেলে দেওয়া হয় বা তাদের মধ্যে বিদ্রোহের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
গণপরিষদেরই আরেক সদস্য হুসেইন ইমাম প্রশ্ন তোলেন যে, ভারতের মতো একটি বহুবিধ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশে ব্যক্তিগত আইনের ক্ষেত্রে কখনও সত্যিকারের অভিন্নতা অর্জন করা আদৌ সম্ভব কি না। সংবিধানের মৌলিক অধিকার এবং ডিরেক্টিভ প্রিন্সিপাল– এই দুই সাংবিধানিক মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। লক্ষণীয় যে, সংবিধানের ৪৪ নম্বর ধারায় বর্ণিত আছে– “The State shall endeavor to secure for the citizens a uniform civil code throughout the territory of India.” অন্যদিকে, অনুচ্ছেদ ৩৭ অনুসারে- রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা (DPSPs) আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য নয় অর্থাৎ Non-Justiciable, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এগুলি মৌলিক নির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ, সংবিধান রাষ্ট্রকে একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও, তা অবিলম্বে কার্যকর করার বাধ্যবাকতা আরোপ করেনি।
অনেক তর্ক- বিতর্ক শেষে গণপরিষদ অনুচ্ছেদ ৪৪-কে মৌলিক অধিকার হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা (Directive Principle) হিসেবে গ্রহণ করে, যার মাধ্যমে আইন সংস্কার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক সমঝোতা প্রতিফলিত হয় (Constituent Assembly Debates, Vol. VII, ২৩ নভেম্বর ১৯৪৮)।
সংবিধানের মৌলিক অধিকার ও ইউনিফর্ম সিভিল কোড
ভারতীয় সংবিধানের আর্টিকেল ২৫ একজন ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার নির্ধারণ করে। আর্টিকেল ২৬(খ) ‘তে প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ধর্ম সংক্রান্ত বিষয়ে নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিষয়াদি পরিচালনার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। আবার আর্টিকেল ২৯, স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণের অধিকার সুনিশ্চিত করে। গণপরিষদে ইউনিফর্ম সিভিল কোডকে ফান্ডামেন্টাল রাইটসের অন্তর্ভুক্ত করা হবে কিনা– এবিষয়ে চূড়ান্ত মতভেদ ছিল। শেষ অবধি, ৫:৪ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সর্দার প্যাটেলের নেতৃত্বাধীন মৌলিক অধিকার উপ- কমিটি রায় দেয় যে ইউসিসিকে মৌলিক অধিকার অংশে অন্তর্ভুক্ত না করে, ডিরেক্টিভ প্রিন্সিপাল অফ স্টেট্ পলিসির অন্তর্ভুক্ত করতে। যার কারণেই ইউসিসি’র বাধ্যতামূলক আইনি গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে সীমিত রাখা হয়।
ইউনিফর্ম সিভিল কোড, যার লক্ষ্য হলো ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইন এর পরিবর্তে সকল নাগরিকের জন্য একটি অভিন্ন দেওয়ানি আইন প্রণয়ন করা। ফলত, ইউসিসি লাগু হলে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর আইন প্রণয়ন ও পরিচালনার অধিকার সীমিত হতে পারে। ভারতে ৭০০-রও বেশি স্বীকৃত জনজাতি রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সেই সংখ্যাটা প্রায় ৪০। মুসলিম, পারসি, আদিবাসী প্রভৃতি সম্প্রদায়ের নিজস্ব আইন ও প্রথা রয়েছে। তাদের আশঙ্কা হলো, ইউনিফর্ম সিভিল কোড সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষপাতিত্ব করতে পারে এবং তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সেন্টিমেন্টকে উপেক্ষা করতে পারে। সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাওঁ, হো, ভূমিজ, খাড়িয়া, টোটো প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব প্রথাগত আইন (customary laws), সামাজিক কাঠামো এবং পারিবারিক বিধান রয়েছে, যা বহু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিগত আইন ব্যবস্থার বাইরে স্বতন্ত্রভাবে বিকশিত হয়েছে। ভারতের সংবিধানের পঞ্চম তফসিল আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের জন্য বিশেষ প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক সুরক্ষা প্রদান করে, যার উদ্দেশ্য হলো তাদের সামাজিক প্রথা, ভূমি অধিকার এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা। এই প্রেক্ষাপটে ইউনিফর্ম সিভিল কোড কার্যকর হলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠে আসে—এটি কি আদিবাসী সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র কাস্টমারি আইন ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করবে নাকি সংরক্ষণ করবে। ইউসিসি যদি একক আইন কাঠামো চাপিয়ে দেয়, তবে তা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসন ও পরিচয়-এর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ তাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনব্যবস্থা কেবল আইনগত নয়, বরং গভীরভাবে প্রথা ও সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে বিবাহ, উত্তরাধিকার এবং সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব নিয়ম বহু প্রজন্ম ধরে প্রচলিত। সেক্ষেত্রে লিগ্যাল ইউনিফর্মিটি চাপিয়ে দেওয়া Cultural Homogenization সৃষ্টি করতে পারে।
যদিও, সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন মামলায় যেমন, Mohd. Ahmed Khan v. Shah Bano Begum 1985 2 SCC 556, Sarla Mudgal v. Union of India 1995 3 SCC 635, Shayara Bano v. Union of India ইত্যাদিতে ইউনিফর্ম সিভিল কোডের সপক্ষে রায় দিয়েছে, তদুপরি, ২০১৮ সালের Consultation Paper-এ ভারতের ২১তম ল’ কমিশন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে ইউনিফর্ম সিভিল কোড “এই পর্যায়ে না প্রয়োজনীয়, না কাম্য”। একক অভিন্ন কোড চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে কমিশন যুক্তি দেয় যে বিদ্যমান ব্যক্তিগত আইনগুলোর মধ্যে থাকা বৈষম্যমূলক বিধানগুলো সংস্কারের ওপরই গুরুত্ব দেওয়া উচিত, যাতে লিঙ্গ-ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায় (Dhavan, 2018)।
এর প্রধান যুক্তি ছিল যে জোরপূর্বক আইনি অভিন্নতা ভারতের বিশাল সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে, যা সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত। কমিশন জোর দিয়ে বলে যে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতির জন্য সম্পূর্ণ অভিন্নতা অপরিহার্য নয় এবং ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হলো বহুত্ববাদকে সম্মান করা। ২১তম ল’ কমিশন প্রস্তাব করে যে সকল ব্যক্তিগত আইনকে কোডিফাই ও সংশোধন করা উচিত, যাতে সেগুলোর মধ্যে থাকা পক্ষপাত দূর করা যায় এবং সেগুলো মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। এর মাধ্যমে দেশের বৈচিত্র্যকে বিলুপ্ত না করে বরং তাকে সংরক্ষণ ও উদ্যাপন করা সম্ভব হবে (Chandran, 2020; Law Commission of India, 2018)।
মৌলিক অধিকার না ডিরেক্টিভ প্রিন্সিপাল– সাংবিধানিক অগ্রাধিকারের দ্বন্দ্ব
নিয়ন্ত্রিত ভারতীয় সংবিধান মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করে গেছে, যেখানে কোনো একটিকে সম্পূর্ণভাবে অপরটির ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়নি, বরং “harmonious construction”-এর নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। তবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে মৌলিক অধিকার, অর্থাৎ Fundamental Rights অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সুপ্রিম কোর্ট প্রাথমিকভাবে State of Madras v. Champakam Dorairajan (1951 SCR 525) মামলায় মৌলিক অধিকারের প্রতি অগ্রাধিকার প্রদান করেছিল। পরবর্তী সময়ে সাংবিধানিক বিচারব্যবস্থা স্বীকার করে যে সংবিধানের পার্ট III (মৌলিক অধিকার) এবং পার্ট IV (রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা)—উভয়কেই সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে।
Kesavananda Bharati v. State of Kerala 1973 4 SCC 225 মামলায় আদালত রায় দেয় যে মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালার মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করা সংবিধানের “মৌলিক কাঠামো নীতি” অর্থাৎ basic structure doctrine -এর অংশ। সুপ্রিম কোর্টের Minerva Mills Ltd. V. Union of India 1980 SCC 625 মামলার রায়ে এটা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয় যে– ভারতীয় সংবিধান মূলত পার্ট III (মৌলিক অধিকার) এবং পার্ট IV (রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা)-এর মধ্যে একটি ভারসাম্যের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
ফলে, আর্টিকেল ৪৪ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুচ্ছেদ ২৫, ২৬ বা ২৯-এর ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে না।
তুলনামূলক সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গি
তুলনামূলক সাংবিধানিক অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে যে ধর্ম ও দেওয়ানি আইনের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো একক বা সর্বজনীন মডেলের প্রয়োজনীয়তা বিশেষ নেই। দক্ষিণ আফ্রিকা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, শ্রীলঙ্কা– এরকম অনেক দেশ রয়েছে যাদের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক আইনব্যবস্থা বিদ্যমান। যুক্তরাজ্য যদিও ধর্মীয় বিবাহ অনুষ্ঠানকে স্বীকৃতি দেয়, তবে নাগরিক আইনের বাধ্যবাধকতার সাথে সংযুক্ত করে। সারাবিশ্বে অধিকাংশ দেশই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণবশত প্লুরাল লিগ্যাল সিস্টেম বজায় রাখে।
ইউনিফর্ম সিভিল কোড এবং রাইট টু প্রাইভেসি
Justice K.S. Puttaswamy v. Union of India (2017) মামলায় গোপনীয়তাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়– Privacy is a constitutionally protected fundamental right intrinsic to life and personal liberty under Article 21. শারীরিক স্বায়ত্তশাসন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বায়ত্তশাসন, ব্যক্তিগত অন্তরঙ্গ ও গোপন সিদ্ধান্তসমূহ (intimate personal choices) এবং পরিবার ও বিবাহ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ– রাইট টু প্রাইভেসির পরিধি সম্প্রসারিত করেছে স্বয়ং আদালত। অথচ, ইউনিফর্ম সিভিল কোড লাগু হলে লিভ-ইন সম্পর্কের রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে রাষ্ট্রের কাছে। নাবালক- নাবালিকাদের ক্ষেত্রে লাগবে পরিবারের অনুমতি। গোপনীয়তার অধিকার কোথায় রক্ষিত হচ্ছে? ইউসিসি লিঙ্গ ন্যায় সাম্যের হাতিয়ার হতে পারে, এটা ঠিক। কিন্তু রাষ্ট্রের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ যে জনমানুষের গোপনীয়তার অধিকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে! অন্তত পোস্টকলোনিয়াল ফেমিনিস্টরা এব্যাপারে বারবার সতর্ক করেছে। ট্রান্সজেন্ডারদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও গভীর।
এক দেশ, এক আইন
আরএসএস- বিজেপির “হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান” প্রজেক্টেরই একটা অংশমাত্র এই অভিন্ন দেওয়ানি আইন। বিজেপি চায় এক দেশ, এক ধর্ম। এক দেশ, এক সংস্কৃতি। এক দেশ, এক আইন। দেশের বহুত্ববাদের ওপর বারবার আঘাত নামিয়ে এনেছে বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদীতার রাজনীতি। যেখানে, বিদ্যমান পৃথক ব্যক্তিগত আইনব্যবস্থা বহাল রেখেই প্রতিটি আইনের মধ্যে এমন সংস্কারকে উৎসাহিত করা বা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা যেতো, যার মাধ্যমে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করা যায় এবং সেগুলোকে সংবিধানের মৌলিক নীতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়। যা আদতে ২১তম ল’ কমিশনের মতামতের সাথেও মিলে যায়। কিংবা, এমন একটি ইউনিফর্ম সিভিল কোড (UCC) প্রণয়ন করা যেতে পারত, যা বিদ্যমান ব্যক্তিগত আইনগুলোর সঙ্গে সহাবস্থান করবে। এতে নাগরিকদের স্বাধীনতা থাকবে—তারা চাইলে নতুন অভিন্ন দেওয়ানি বিধির অধীনে পরিচালিত হতে পারবেন অথবা তাদের নিজস্ব প্রথাগত ব্যক্তিগত আইন অনুসরণ করতে পারবেন। একেবারে স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টের মতোই। কিন্তু তা না করে, ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা অভিন্ন দেওয়ানি আইন দেশের সর্বস্তরের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পেছনে আসলে কাজ করছে সংখ্যাগুরুবাদ চাপিয়ে দেওয়ার রাজনীতি। যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী এক ঘরে ভিন্ন আইন না রাখার পক্ষে সওয়াল করছেন, ইউনিফর্ম সিভিল কোডের সমর্থকেরা লিঙ্গসাম্যের কথা বলছেন, তখন আমরা দেখতে পাচ্ছি ট্রান্সজেন্ডার সংশোধনী আইন এনে ট্রান্সজেন্ডারদের আত্মপরিচয়ের অধিকার কেড়ে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। দেশজুড়ে পেপার লিক বিরোধী আন্দোলনে বিকৃত মনস্তত্ত্ব নিয়ে সাংবাদিকরা ছুটছে ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটির পেছনে, উদ্ভট প্রশ্ন করে তাদের হাস্যরসের পাত্র বানাবার প্রচেষ্টায়। সেই ভিডিও নেটদুনিয়ায় ভাইরাল করে ট্রোল করে যাচ্ছে উগ্র হিন্দুত্ববাদের সমর্থক বাহিনী!
লিঙ্গসাম্যের জন্য এরা লড়াই করবে? এরা সংখ্যাগুরুবাদের পক্ষে লড়াই করবে। NCERT ‘র দুর্দান্ত কার্যকলাপের নবতম সংযোজন শুনবেন? পাঠ্যবই থেকে সংবিধানের প্রস্তাবনা, ধর্মনিরপেক্ষতা সরে গিয়ে জায়গা নিয়েছে মনুস্মৃতির শ্লোক। এরা এক ঘরে থেকে “একই বৃন্তে দুটি ফুল” ‘এর গান গাইবে? এরা আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাবে, হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের প্রজেক্টের বাস্তব রূপায়ণে। এরা বারবার চাইবে এদেশের বহুত্ববাদকে মুছে ফেলতে। এক দেশ, এক আইনের আসল উদ্দেশ্য ঠিক এটাই!