সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম্
শস্যশ্যামলাং মাতরম্…
শস্যের শ্যামলিমা শোভিত, সুখ ও বর প্রদানকারিণী ভারতমাতাকে প্রণাম জানিয়েছিলেন সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ওরফে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আখ্যায়িত ‘বঙ্কিমদা’! ১৮৭৫ সালের ৭ নভেম্বর নৈহাটির কাঁঠালপাড়ার বাড়িতে বসে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যে রচনা করেছিলেন, সেই রচনাই এখন রাজনীতির রসদ। কেউ বলছেন, বাংলা বন্দেমাতরমের জন্মভূমি, স্বাধীনতার জাগরণের পবিত্র ভূমি। তাই ইতিহাসকে ভুলে নয়, স্মরণ করেই ভবিষ্যৎ গড়তে হবে। সেই যুক্তিতেই রাজ্য সরকার প্রতিটি স্কুলসহ মাদ্রাসাগুলিতে বন্দেমাতরম গাওয়া বাধ্যতামূলক বলে সম্প্রতি ঘোষণা করেছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, রাষ্ট্রগীত হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া গানটির শেষ স্তবকগুলিতে হিন্দু দেবদেবীর বন্দনা থাকায় স্বাধীনতার আগে ও পরে মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষদের এই গান গাওয়া নিয়ে যথেষ্ট আপত্তি আছে। এদিকে সার্ধশতবর্ষে বন্দেমাতরম ঘিরে একগুচ্ছ পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করলেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একবারও ভেবে দেখলেনই না, যে লালগোলা রাজবাড়ি এবং কলকলি নদীর প্রেক্ষাপটে এই কালজয়ী গানের প্রথম অংশ লেখা, সেই রাজবাড়ির অবস্থা এখন ভগ্নপ্রায়! আজ পর্যন্ত সেখানে বঙ্কিমচন্দ্রের একটি মূর্তিও নেই! ভেবে দেখলেনই না, যে দেশের সকালটা শুরু হয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চরণে শ্রদ্ধা জানিয়ে, সেই দেশেই দিনের শেষে তাঁর মূল দর্শনকে প্রতিদিন একটু একটু করে কোণঠাসা করা হচ্ছে। ভেবে দেখলেনই না, জওহরলাল নেহরুকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলে গিয়েছিলেন, স্বাধীনতার মঞ্চে বিপ্লবী মন্ত্র হিসেবে ‘বন্দেমাতরম’-এর অবদানকে অস্বীকার করা যাবে না ঠিকই, কিন্তু সকল ধর্ম সম্প্রদায়ের জন্য সঙ্গত নয় বন্দেমাতরম। আর তাই ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে কখনোই এটিকে মান্যতা দেওয়া উচিত নয়। তাহলে প্রশ্ন জাগে, যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা বন্দেমাতরমকে জাতীয় সঙ্গীতের সমমর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা কি রবীন্দ্রবিরোধী? নাকি তারা ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগানের ধাঁচেই বন্দেমাতরমকে স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করে আজ থেকে প্রায় ৯০ বছর আগে এই গানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ধর্মীয় বিতর্ককে ইচ্ছাকৃতভাবে আবার উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করছে?
একটু খুলে বলি বরং বিষয়টা। ১৯১১ সাল, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে কলকাতায় হাজির হয়েছেন সমস্ত মান্যগণ্য নেতারা। সদ্য বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ঝড় দেখেছে শহর। এর মধ্যেই শুরু হয়েছে কংগ্রেসের ২৬তম অধিবেশন। ঠিক হল, এই অধিবেশনে গান গাইবেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। দ্বিতীয় দিন প্রত্যাশামতো এলেন গুরুদেব। সঙ্গে সরলা দেবী, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর-সহ আরও বেশ কয়েকজন। কয়েকদিন আগেই একটি গান রচনা করেছেন কবি, সমবেত কণ্ঠে সেটাই বেজে উঠল ভারতের বুকে। বেজে উঠল ‘জন-গণ-মন-অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা’। সেদিনের গানটির প্রথম স্তবকটি আজ জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পেয়েছে। ১৯৩৭ সাল। কলকাতায় শুরু হয়েছে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির বৈঠক। আর সেখানেই শুরু হল সমস্যা। ‘বন্দেমাতরম’, না ‘জন-গণ-মন-অধিনায়ক’— কোনটি হবে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত এই নিয়ে চলল বিতর্ক। স্বাধীনতা আন্দোলনে ‘বন্দেমাতরম’-এর অবদান তো অস্বীকার করা যাবে না। বিপ্লবী থেকে স্বদেশি, সাধারণ মানুষ— সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল এই মন্ত্র। অন্যদিকে ‘জন-গণ-মন’র মধ্যে সমগ্র ভারতের এক ছবি ফুটে উঠেছে। সেখানে ধর্ম-জাতি-অঞ্চলের কোনো ভেদ নেই। তাহলে কোনটি হবে জাতীয় সঙ্গীত? ‘বন্দেমাতরম’-কে জাতীয় সঙ্গীত করার কথা ভেবেছিলেন অনেকে, কিন্তু আপত্তি ওঠে অন্য মহল থেকে। জাতীয় মন্ত্র হিসেবে এটি ঠিক আছে কিন্তু জাতীয় সঙ্গীতের ঐক্যের বাণী এখানে ফুটে উঠছে না। তাহলে? অগত্যা সমাধান এক জায়গাতেই। জওহরলাল নেহরু ছুটলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। কংগ্রেসের এই অধিবেশনেই ‘বন্দেমাতরম’-এ সুর দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ওই বছরই এক দীর্ঘ চিঠিতে নিজের বক্তব্য জওহরলালকে জানান রবি ঠাকুর। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, স্বাধীনতার মঞ্চে বিপ্লবী মন্ত্র হিসেবে ‘বন্দেমাতরম’-এর অবদানকে অস্বীকার করা যাবে না কখনোই। কিন্তু ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে এটিকে দেখা যায় না। সর্বধর্মের মিলনমঞ্চ এই দেশ; আর বঙ্কিমের ওই রচনা কোনোভাবে সেই ছবিটাকে তুলে ধরছে না। ওই বছরই কবি বুদ্ধদেব বসুকেও চিঠি লিখে কবিগুরু বলেন, “তর্কটা হচ্ছে এ নিয়ে যে ভারতবর্ষে ন্যাশনাল গান এমন কোনো গান হওয়া উচিত যাতে একা হিন্দু নয় কিন্তু মুসলমান খ্রীষ্টান- এমন কি ব্রাহ্মও- শ্রদ্ধার সঙ্গে ভক্তির সঙ্গে যোগ দিতে পারে। তুমি কি বলতে চাও, ‘ত্বং হি দুর্গা’, ‘কমলা কমলদল বিহারিণী, বাণী বিদ্যাদায়িনী’ ইত্যাদি হিন্দু দেবী নামধারিণীদের স্তব, যাদের ‘প্রতিমা পূজি [গড়ি] মন্দিরে মন্দিরে,’ সার্বজাতিক গানে মুসলমানদের গলাধঃকরণ করাতেই হবে। হিন্দুর পক্ষে ওকালতি হচ্ছে এগুলি আইডিয়া মাত্র। কিন্তু যাদের ধর্মে প্রতিমাপূজা নিষিদ্ধ তাদের কাছে আইডিয়ার দোহাই দেবার কোনো অর্থই নেই। রাগ করে মাথাঝাঁকানি দিয়ে বলতে পারো এ রকম মনোভাবকে আমরা মানব না। কিন্তু রাগারাগির কথা নয় এ মনোভাব যাদের আছে তারা আমাদের ন্যাশনালিটির একটা প্রধান অঙ্গ, তাদের কাছে হিন্দুয়ানি প্রচার করতে যাও না, কিংবা মুসলমানি প্রথায় তলোয়ারের চোটে হিন্দুধর্মের অসামান্য মাহাত্ম্যে তাদের দীক্ষিত করো না, যতক্ষণ তা না হয় ততক্ষণ ভারতের সর্বজনীন স্তবগানে দুর্গানাম বন্ধ রাখলে এতই কী অসহ্য দুঃখ এবং ক্ষতি।”
১৮৮২ সালে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে বন্দেমাতরম গানটি মুদ্রিত হয়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে লেখা একটি চিঠিতেও একই কথা বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ— “আনন্দমঠ উপন্যাসটি সাহিত্যের বই, তার মধ্যে এই গানের সুসংগতি আছে। কিন্তু যে রাষ্ট্রসভা ভারতবর্ষের সকল ধর্মসম্প্রদায়ের মিলনক্ষেত্র সেখানে এ গান সার্বজনীন ভাবে সংগত হোতেই পারে না।” এইসব সাক্ষ্যপ্রমাণ লেখা আছে ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু সেই ইতিহাস কি এখন ভুলতে বসেছেন কেন্দ্রীয় নেতারা? নাকি ভুলিয়ে দেওয়ার, গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন তাঁরা? আজকের ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক কোলাহলের দিকে তাকালে একটা অদ্ভুত সমান্তরাল রেখা চোখে পড়ে। প্রশ্ন জাগে, আজ যদি রবিঠাকুর সশরীরে আমাদের মাঝে ফিরে আসতেন, আজকের সমাজ কি তাঁকে বরণ করে নিত? নাকি তাঁর প্রগতিশীল, মুক্ত চিন্তার জন্য তাঁর কপালেও জুটে যেত ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ তকমা? বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে উত্তরটা ইতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর এটাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় পরিহাস! রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ কোনো ভৌগোলিক সীমানায় বন্দি ছিল না। তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, দেশের চেয়েও বড় হলো মানুষ এবং মানবতা। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘ঘরে বাইরে’-তে নিখিলেশের চরিত্রের মাধ্যমে তিনি বলিয়েছিলেন, ‘দেশকে আমি ভালোবাসি, কিন্তু দেশকে পুজো করতে আমি রাজী নই। কারণ দেশপ্রেমের নামে অন্যায়কে মেনে নেওয়া যায় না।’
আজকের ‘হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি’ এবং উগ্র জাতীয়তাবাদের যুগে দাঁড়িয়ে কেউ যদি কবিগুরুর আদর্শে বলেন যে, ‘দেশের চেয়েও মানবতা বড়’, তবে মুহূর্তের মধ্যে তাঁকে ‘দেশবিরোধী’ তকমা দিয়ে দেওয়া হবে। রবীন্দ্রনাথ আজ বেঁচে থাকলে তাঁর এই বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির জন্য নিশ্চিতভাবেই ট্রোলিং এবং আক্রমণের শিকার হতেন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’। তিনি এমন এক ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে তার মতামত প্রকাশ করতে পারবে। কিন্তু বর্তমান ভারতের দিকে তাকালে দেখা যায়, সরকার বা শাসন ব্যবস্থার সমালোচনা করলেই দেশদ্রোহিতার মামলা ঠুকে দেওয়া, সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করা বা বুদ্ধিজীবীদের জেলে পাঠানো একটা চেনা ছকে পরিণত হয়েছে।
ব্রিটিশ আমলে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘নাইটহুড’ উপাধি ত্যাগ করেছিলেন। রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার সেই মেরুদণ্ড আজ ক’জনের আছে? আর আজ যদি রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থেকে কোনো সরকারি নীতির বিরুদ্ধে কলম ধরতেন, তবে হয়তো কোনো না কোনো আইনের বেড়াজালে তাঁর স্বাধীনতাকেও খর্ব করার চেষ্টা করা হতো, ঠিক যেমনভাবে পশ্চিমবঙ্গের বুকে কোনও সরকারি কর্মচারী সরকারের পূর্ব অনুমতি ছাড়া এখন থেকে আর কোনও মিডিয়া প্রোগ্রামে অংশ নিতে পারবেন না কিংবা সংবাদপত্র বা সাময়িকীতে লেখা লিখতে পারবেন না, কোনও পত্রিকা সম্পাদনা বা পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত থাকতে পারবেন না। রবীন্দ্রনাথ খুব সহজ ভাষায় বুঝিয়েছিলেন, যার ধর্মে প্রতিমাপূজা নিষিদ্ধ, তাকে জোর করে ‘আইডিয়া’ বা ভাবার্থের দোহাই দিয়ে বন্দেমাতরম গান গাওয়ানো যায় না। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, ভারতের সর্বজনীন স্তবগানে কিছুদিনের জন্য দুর্গানাম বন্ধ রাখলে “এতই কী অসহ্য দুঃখ এবং ক্ষতি?” আজকের বিজেপি শাসিত ভারতে দাঁড়িয়ে কোনো বুদ্ধিজীবী যদি এই কথা বলতেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে নিশ্চিতভাবেই ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ হানার অভিযোগে মামলা হয়ে যেত! ঠিক যেমন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে সুর চড়ানোয় ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে টানা জেল হেফাজতে রয়েছেন দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী ছাত্রনেতা উমর খালিদ। উত্তর-পূর্ব দিল্লি দাঙ্গা সৃষ্টির এক পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাঁকে বন্দী রাখা হয়েছে। এই গণতন্ত্রের টুঁটি টিপে ধরার পূর্বাভাস রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের শেষভাগেই পেয়েছিলেন। তাই বুদ্ধদেবকে লেখা চিঠির শেষ অংশে তিনি গভীর আক্ষেপের সঙ্গে লিখে গিয়েছিলেন, “এখন যা লিখতে যাব মতের সঙ্গে না মিললেই হিংস্রতা জেগে উঠবে। এ রকম ঝোড়ো হাওয়ার মুখে পাল নামিয়ে দিয়ে চুপচাপ ঘাটে বসে থাকাই ভালো।”
আজকের বিজেপির রাজনীতির মূল ভিত্তি হলো ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান’-এর এক ধরনের অদৃশ্য আধিপত্য তৈরি করা, যেখানে বৈচিত্র্যের চেয়ে একরূপতাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। অথচ রবীন্দ্রনাথ বারবার সতর্ক করে বলেছিলেন, ভারতের আসল শক্তি তার বহুত্ববাদের মধ্যে। তিনি ‘জনগণমন’-কে যখন ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে রচনা করেন, তখন সেখানে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের দেব-দেবীর বন্দনা ছিল না, বরং ছিল ভারতের সমস্ত প্রদেশ, পর্বত, নদী এবং বিবিধ সংস্কৃতির এক অপূর্ব সমন্বয়—যেখানে সমস্ত ধর্মের মানুষ সমানভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, যা আজকের শাসকদলের ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ দর্শনের সম্পূর্ণ বিরোধী। রবীন্দ্রনাথের ‘ভারততীর্থ’ কবিতার সেই বিখ্যাত লাইন—“হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চীন— / শক-হুন-দল পাঠান-মোগল এক দেহে হল লীন”—আজকের ভারতের বাস্তবতার সঙ্গে বড্ড বেমানান ঠেকে। আজ যখন রাজ্যে বুলডোজার চালিয়ে দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের সন্ধানে থাকা সাধারণ মানুষের মাথার ছাদটুকু কেড়ে নেওয়া হয় কিংবা হকারদের পেটে লাথি মারা হয়, কুরবানি ঈদে গরু বেচা-কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মানুষের খাদ্যাভাসে আঘাত হানা হয়, সমাজকে ধর্ম, জাত আর খাদ্যাভ্যাসের ভিত্তিতে ভাগ করার এক অন্ধ প্রতিযোগিতা চলে, তখন রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই তাঁর এই বহুত্ববাদ এবং সমন্বয়ের আদর্শকে অনেকে ‘তোষণ’ বা ‘দুর্বলতা’ বলে আখ্যা দিয়ে দিতেন। যে রবীন্দ্রনাথ সীমান্তহীন এক বিশ্বের কথা বলতেন, আজ তাঁকে হয়তো সমাজমাধ্যমের কমেন্টে ‘বহিরাগত’, ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘সংস্কৃতি-নাশক’ তকমা দিয়ে দেওয়া হতো।
আমরা প্রতি বছর নিয়ম করে ২৫শে বৈশাখ কিংবা ২২শে শ্রাবণ উদ্যাপন করি। রবীন্দ্রনাথের ছবিতে মালা দিই, তাঁর গান গেয়ে নিজেদের ‘সংস্কৃতিমনস্ক’ প্রমাণ করার চেষ্টা করি। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছবি উপহার দিয়ে হিন্দুত্ব আবেগে শান দিতেও চেষ্টা করেন। আবার সংসদে ‘বন্দেমাতরম’ রচনার ১৫০ বছর উপলক্ষে বিশেষ আলোচনাও অনুষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু আসল সত্যিটা হলো, আমরা যেমন রবীন্দ্রনাথের কাঠামোটাকে পুজো করি, তাঁর আত্মাকে নয়। ঠিক তেমনই বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাস করে আমরা ভুলে যেতে বসি যে স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্রই ‘লোকরহস্য’ প্রবন্ধে লিখে গিয়েছিলেন, “জ্ঞানই হউক, ধর্ম্মই হউক, আর সৌন্দর্য্যই হউক, সকল বিষয়েই সীমা রক্ষা করা ভালো।” ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে তিনিই বলে গিয়েছিলেন, “পরাধীনতা অপেক্ষা মৃত্যু শ্রেয়।” অর্থাৎ, এই বিষয়টি স্পষ্ট যে, এই দুই মনীষীর আসল দর্শনকে ধারণ করার মতো সহনশীলতা ও উদারতা আজকের সমাজের নেই। রবীন্দ্রনাথ এবং বঙ্কিমচন্দ্রকে দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখা সহজ, কিংবা সাহিত্যসম্রাটকে ‘হিন্দুত্বর প্রতীক’ বানিয়ে তাঁর মানহানি করা সহজ, কিন্তু তাঁদের মুক্তচিন্তাকে মেনে নেওয়া কঠিন। ভাগ্যিস আজ রবি ঠাকুর বেঁচে নেই! নয়ত তাঁকেও হয়তো নিজের তৈরি করা দেশের কাঠগড়াতেই দাঁড়িয়ে বলতে হতো, ‘ধর্মাবতার, আমি নির্দোষ’। আর পাশে দাঁড়িয়ে আফসোস নিয়ে শাসকের দিকে আঙুল তুলে বঙ্কিমচন্দ্রকে প্রশ্ন তুলতে হত, “তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইবো না কেন?”
















