পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের পর রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র সংঘাত শুরু হয়েছে। সম্প্রতি একটি তথ্য অধিকার বা RTI (Right to Information) আইনের মাধ্যমে প্রাপ্ত পরিসংখ্যানকে কেন্দ্র করে শাসকদল ও বিরোধীদের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে পৌঁছেছে। রাজ্যের স্টেট ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (SCRB)-র তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর মাত্র প্রথম পাঁচ মাসে অপরাধের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ।
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ সাকেত গোখলের করা একটি RTI-এর জবাবে প্রকাশিত তথ্যে জানানো হয়েছে যে, মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ পর্যন্ত রাজ্যে প্রায় ২,৪৫৮টি ধর্ষণের ঘটনা এবং ৬০০টি খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬টি ধর্ষণের ঘটনা এবং ৪টি খুনের মতো অপরাধ ঘটছে। এছাড়াও খুনোখুনি ও প্রাণঘাতী হামলার চেষ্টা (Attempt to Murder)-র ১৩,১১৪টি এবং গুরুতর জখম করার ৩,২৩৪১টি মামলা নথিভুক্ত হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। নির্বাচনের আগে রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ‘জঙ্গলে রাজ’ কায়েমের অভিযোগ তুলে কঠোর আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল গেরুয়া শিবির। প্রশ্ন জাগে যে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজ্যে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছিল, এটি কি সেই ‘নিরাপদ বাংলার’ প্রতিশ্রুতি?
এই পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে আসার পর বিধানসভার অন্দরে ও বাইরে আক্রমণাত্মক অবস্থানে গেছে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস। বিধানসভার চত্বরে দলের মুখপাত্র ও নেতারা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ তুলে অবিলম্বে বিধানসভার একটি জরুরি অধিবেশন ডাকার দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে ধর্ষণ ও খুনের ক্রমবর্ধমান পরিসংখ্যানের প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতিরও দাবি তোলা হয়েছে। বিরোধী শিবিরের দাবি, ভোটের আগে নারী সুরক্ষা ও অপরাধ দমনের যে চড়া সুর শোনা গিয়েছিল, বাস্তবের মাটিতে তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।বিরোধী দলগুলির দাবি, স্লোগানসর্বস্ব রাজনীতি দিয়ে রাজ্যবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, এই পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে আসার পর আত্মপক্ষ সমর্থনে ময়দানে নেমেছে বিজেপি নেতৃত্ব। দলীয় মুখপাত্র ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের দাবি, এই পরিসংখ্যানের একটি বড় অংশই আগের শাসক দলের আমলের ঘটনা, যা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থানায় দেরিতে বা নতুন করে নথিভুক্ত হয়েছে। বিজেপির মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বর্তমান প্রশাসন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। ঘটনার প্রকৃত সময়কাল যাচাই না করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য এই তথ্যকে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলেছে শাসক দল।
সবমিলিয়ে, RTI-এর এই তথ্যকে হাতিয়ার করে বাংলার নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে পারদ চড়াতে চাইছে বিরোধী শিবির, অন্যদিকে পুরোনো মামলার জট ও আইনি প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা দিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছে শাসকপক্ষ। তবে অপরাধের এই আকাশছোঁয়া পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতার আবহ তৈরি করছে । এই পরিস্থিতিতে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য প্রতিটি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিই জোরালো হয়ে উঠছে। এই পরিসংখ্যান কেবল অপরাধের কিছু খতিয়ান নয়, এটি পরিবর্তনের বাংলার এক চিত্র। নতুন সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক কথার লড়াই পেরিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ভীতি দূর করে প্রকৃত অর্থে একটি নিরাপদ ও আস্থার পরিবেশ গড়ে তোলা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই সংঘাত আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

