বাংলার রাজনীতি ও সংস্কৃতির দীর্ঘস্থায়ী আখ্যানের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ যখন আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকাল এবং তার চারপাশের ‘বুদ্ধিজীবী’ বলয়টির দিকে তাকাই, তখন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা ও বিস্ময় আমাদের গ্রাস করে। দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম জমানার অবসান ঘটিয়ে যখন পরিবর্তন এল, তখন সেই পরিবর্তনের লগ্নটিকে ঘিরে যে প্রগতিশীল ও সৃজনশীল মেধার জোয়ার এসেছিল, সময়ের আবর্তে আজ তা এক ক্লান্ত ও ম্রিয়মাণ পরিণতির দিকে ধাবিত।
বাঙালি সুশীল সমাজের চিরাচরিত সংজ্ঞায় ‘বুদ্ধিজীবী’ বলতে বোঝাতো এমন এক গোষ্ঠী, যারা ক্ষমতার অলিন্দ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে সত্যের উচ্চারণ করেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের শ্রমজীবী মানুষের প্রতিচ্ছবি কিংবা তারাশঙ্করের জনপদ-কথার যে নির্যাস, তা বাংলার মননে বুদ্ধিজীবীদের এক স্বতন্ত্র উচ্চাসন দিয়েছিল। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানপর্বে এই বুদ্ধিজীবী সমাজের ভূমিকা ছিল বহুমুখী। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের উত্তাল দিনে যখন শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার চেষ্টা হচ্ছিল, তখন অনেক প্রথিতযশা শিল্পী, কবি ও সাহিত্যিক রাস্তায় নেমেছিলেন ‘পরিবর্তন’-এর প্রত্যাশায়।
অথচ আজ, যে বুদ্ধিজীবী সমাজ একদা ‘প্রতিষ্ঠান-বিরোধী’ অবস্থানে থেকে গর্বিত ছিলেন, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনেকেই হয়ে উঠেছেন সেই নতুন প্রতিষ্ঠানের অংশীদার। রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে যখন শিল্প-সাহিত্য চর্চার চেয়ে প্রশাসনিক অনুদান বা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বেশি গুরুত্ব পায়, তখন সৃজনশীলতার মেরুদণ্ডটি নুইয়ে পড়ে। কবি যখন কবিতা লেখার চেয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্লোগান তুলতে বেশি ব্যস্ত হন, কিংবা চিত্রশিল্পী যখন ক্যানভাসের চেয়ে সরকারি পুরস্কারে বেশি তৃপ্তি খোঁজেন, তখন সমাজের সেই চিরকালীন বিবেকী কণ্ঠস্বরটি ক্ষীণ হয়ে আসে।
এই রূপান্তর বাঙালি সমাজকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আজকের সুশীল সমাজে বিভাজন প্রকট। একটি বড় অংশ এখন সরকারের প্রচারযন্ত্রের মুখপাত্রে পরিণত হয়েছে, অন্য অংশটি আবার নিছক সমালোচনার খাতিরেই বিরোধী শিবিরে অবস্থান নিয়েছে। ফলে ‘নিরপেক্ষ’ এবং ‘নির্ভীক’ বুদ্ধিজীবী শব্দগুলো যেন অভিধানের পাতায় বন্দি হয়ে গেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং তার প্রতি আপামর মানুষের আবেগ এক প্রবল শক্তি। কিন্তু সেই শক্তির ছায়াতলে যখন বুদ্ধিজীবীদের বসত গড়ে ওঠে, তখন তারা নিজেদের অজান্তেই ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে পড়েন। বাংলার সেই চিরচেনা রূপ—যেখানে রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুল ছিলেন প্রতিবাদের প্রতীক—সেখানে আজ এক ধরনের স্তাবকতা বা সুবিধাবাদের সংস্কৃতি বাসা বেঁধেছে।
অথচ বাংলার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখি, প্রকৃত সৃজনশীলতা সবসময়ই ক্ষমতার বাইরে থেকে শক্তি সঞ্চয় করেছে। আজ প্রয়োজন সেই দূরত্বের। সুশীল সমাজকে আবার তার শিকড়ে ফিরতে হবে—যেখানে শিল্প কেবল শাসকের স্তুতি নয়, বরং শাসিতের যন্ত্রণা ও স্বপ্নের দর্পণ হয়ে ওঠে। গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশে বুদ্ধিজীবীদের দায়বদ্ধতা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি নয়, বরং সেই সত্যের প্রতি, যা ধুলোবালি মাখা মাটির কাছাকাছি থাকে।
মমতাপর্বের এই আখ্যান বাঙালির জন্য একটি সতর্কবার্তাও বটে। যদি সাহিত্যিক বা শিল্পীরা তাদের ‘স্বাধীনতা’ বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার করিডোরেই স্থায়ী আস্তানা গড়েন, তবে ভবিষ্যতে এমন এক সময় আসবে যখন সমাজ আর কোনো প্রকৃত কবি বা দার্শনিককে খুঁজে পাবে না। কেবল শোনা যাবে রাজকীয় ফরমানের প্রতিধ্বনি ।

