“ন্যায়ের খড়্গ আজ বত্সরে বত্সরে,
কুর্নিশ করে বুঝি ক্ষমতার তরে।”
সুনারিয়া কারাগারের প্রকোষ্ঠ থেকে আবারও বেরিয়ে এসেছেন রাম রহিম। ২০১৭ সালে দুই শিষ্যাকে ধর্ষণের দায়ে আদালতের রায়ে যিনি কুখ্যাত অপরাধীর তকমা সেঁটে কুড়ি বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন, তিনি আজ যেন বিচারব্যবস্থার নিগড়ে থেকেও এক অদ্ভুত অদৃশ্য স্বাধীনতায় ভাসছেন। এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য—যেখানে আদালতের একটি রায় অপরাধীকে দাগী সাব্যস্ত করে অন্ধকারে পাঠায়, আর অন্য এক অদৃশ্য কার্যকারণ তাকে বারবার ফিরিয়ে আনে দিনের আলোয়, ভক্তের ভিড়ে। সাম্প্রতিক ২১ দিনের নতুন ফুরলোসহ তাঁর সতেরো বারের মতো কারাগার থেকে বাইরে আসা কেবল আইনি বাঁকাপথের ব্যবহার নয়, বরং এটি আমাদের সমসাময়িক রাজনীতির এক নির্মম ও বিদ্রূপাত্মক দলিল।
বিচারালয় হলো ন্যায়ের এমন এক দুর্ভেদ্য সৌধ, যেখানে অন্ধ দেবীর হাতে থাকা দাঁড়িপাল্লায় কোনো পক্ষপাত থাকে না। কিন্তু সুনারিয়া জেলের উচ্চ নিরাপত্তা ভেদ করে যখনই রাম রহিম বাইরে আসেন, সেই দাঁড়িপাল্লা যেন ক্ষমতার অদৃশ্য ধাক্কায় কেঁপে ওঠে। অপরাধীর পরিচয় এখানে গৌণ হয়ে যায়; মুখ্য হয়ে ওঠে তার অনুসারীদের সংখ্যা এবং ব্যালট বাক্সে তাদের মোহাচ্ছন্ন প্রভাব।
গণতন্ত্রের উৎসবে যখনই ভোট আসে, তখনই যেন ডেরা প্রধানের কারাবাসের মেয়াদ ফুরিয়ে যায়। পরিসংখ্যান বলে, গত কয়েক বছরে তাঁর এই সাময়িক মুক্তিগুলোর সময়কাল কোনো না কোনো নির্বাচনী ঋতুর সঙ্গে আশ্চর্যরকম মিলে গেছে। জানুয়ারির কনকনে শীতে চল্লিশ দিন, মে মাসের রোদে ত্রিশ দিন, আর এখন বর্ষার শেষাংশে একুশ দিনের ফুরলো—এ যেন এক সুচারুভাবে নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ক্যালেন্ডার। অপরাধের মার্জনা নেই, অথচ দণ্ডভোগের বিরতিতে কোনো কমতি নেই। রাষ্ট্রের কারাগার তখন এক বিলাসবহুল প্রতীক্ষালয় হয়ে ওঠে, যেখান থেকে ক্ষমতার রিমোট কন্ট্রোল পরিচালিত হয়।
এই ঘনঘন মুক্তি কেবল আইনি ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকেই ধূলিসাৎ করে না, বরং এটি আমাদের নৈতিকতার ভিতকে কাঁপিয়ে দেয়। একজন সাধারণ অপরাধী যখন সামান্য অপরাধে বছরের পর বছর তিল তিল করে কারাবাস ভোগ করে, তখন নারী নিপীড়নে দণ্ডিত এক ‘বাবা’ রাজনৈতিক রসায়নের কৃপায় বছরের পর বছর ধরে চারশো দিনেরও বেশি সময় কাটান কারাগারের বাইরে।
রাম রহিমের বারবার কারাগার থেকে বেরিয়ে আসা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি ক্ষমতার রাজনীতি এবং অন্ধ বিশ্বাসের এক বিপজ্জনক যৌথ উৎপাদন। এই প্রহসন চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের মনে এই প্রশ্নটিই রক্তক্ষরণের মতো বারবার জেগে উঠবে—আইন কি তবে কেবল দুর্বলদের জন্যই তৈরি, আর ক্ষমতাশালীদের জন্য সেটি কেবলই এক ক্ষণিকের বিরামহীন নাটক? রাষ্ট্রের এই নির্বাক সম্মতি গণতন্ত্রে এক দীর্ঘ স্থায়ী কালো ছায়া ফেলে চলেছে অবিরত৷ যা বারবার প্রশ্ন চিহ্নের সামনে দাঁড় করাচ্ছে ভারতীয় সংবিধানের – গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র ও সাধারণতন্ত্রের ধারণাকে।

