Mein Vaapas Aaunga: ইমতিয়াজ পারলেন, বিবেক হারলেন! “ওরা ভেবেছিল গান্ধীকে মারলেই ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হবে”, মোলাকাতের প্রথম পর্বে মুখোমুখি গান্ধীবাদী শিক্ষাবিদ মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায় One Nation, One Law: এক দেশ, এক আইন প্রজেক্টের নাম “হিন্দি হিন্দু- হিন্দুস্তান” অশান্ত মণিপুরের নেপথ্যে অবৈধ মাদক কারবার? প্রশাসনের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা ‘বাঙালির সন্তান থাকবে রাজমা চাওলে’, নিরামিষ বাংলা গড়ার প্রথম পদক্ষেপ? Gym Jihad: বাজারে নতুন ট্রেন্ড ‘জিম জিহাদ’, ফের ‘খাত্রে মে’ হিন্দুরা? রাজনৈতিক হিংসার দুই অধ্যায় বাজেটে পার্শ্বশিক্ষকদের নামমাত্র বেতন বৃদ্ধি, যোগ্যতার অমর্যাদা ও আর্থিক বঞ্চনার চালচিত্র!

ডিএ-র হিসেব পরে হবে, আগে ১৯ হাজার সহকর্মীর রুজি-রোজগার বাঁচান!

জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

খুব সোজা-সাপটা একটা কথা দিয়ে শুরু করি। সম্প্রতি আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মহাশয় চারটি সরকারি কর্মচারী সংগঠনকে নিয়ে বকেয়া ডিএ, সপ্তম বেতন কমিশন প্রভৃতি বিষয়গুলোকে সামনে রেখে এই মাসের ১ তারিখে নবান্নে বৈঠক করেছেন। খুব ভালো কথা! অনেকেই বলছেন এটা সরকারের সদিচ্ছা ও ইতিবাচক দিক। হ্যাঁ, সত্যিই তাই। কারণ আমরা অতীতে মমতা ব্যানার্জিকে দেখেছি, তিনি কীভাবে সরকারি কর্মচারীদের ডিএ তথা সমস্ত আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেছেন। এমনকি মমতা ব্যানার্জি সরকারি কর্মচারীদের ‘মানুষ’ বলেই গণ্য করতেন না। প্রসঙ্গগত, নবান্নে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সাথে মিটিংয়ের পর সরকারি কর্মচারী মহলে, বাসে-ট্রেনে চারদিকে হইচই—এবার কি তবে ডিএ (মহার্ঘ ভাতা) মিলবে? সরকারি কর্মচারীদের একটা বড় অংশ আশায় বুক বাঁধছেন, কেউ কেউ আবার ক্ষোভে ফুঁসছেন—ডিএ তো পাব, কিন্তু কবে?

এখানে উল্লেখ্য, যে সমস্ত রাজ্য সরকারি কর্মচারী সংগঠন কোর্টে কেস করেছিল, শুধু তাদের প্রতিনিধিদেরই ডাকা হয়েছিল। বাদ গেছে অসংখ্য কর্মচারী সংগঠন, যারা রাস্তায় প্রকাশ্যে দীর্ঘদিন ধরে এই দাবি করে আসছে। ফলে এই নিয়েও একটা চাপানউতোর আছে। তবে আমার আলোচনার বিষয় এটা নয়। আমার বক্তব্য আরও স্পষ্ট। সত্যি বলতে কী, আজকে ডিএ না পাওয়ার আফসোস বা হতাশা নিয়ে লিখতে বসিনি। পকেটের টান অবশ্যই বড় কষ্টের, কিন্তু যখন দেখি সমাজের মেরুদণ্ডটাই ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, তখন পকেটের খতিয়ান মেলানোকে বড্ড তুচ্ছ মনে হয়। ১৯ হাজার জীবন বনাম কিছু শতাংশের ডিএ!

আসল হতাশা আর আশ্চর্যের জায়গাটা অন্যখানে। যে শিক্ষক সমাজকে আমরা ‘গুরু’ বলে সম্মান করে থাকি, যাদের আমরা সমাজের মাথা বলে জানি—আজ তাঁরা কোথায় দাঁড়িয়ে? একটু পিছন ফিরে তাকালে কি আমাদের মনে পড়ে না—এই শিক্ষক সমাজেরই একটা অংশ দিনের পর দিন রাস্তায় রোদে পুড়ে, জলে ভিজে আন্দোলন করেছিলেন? আর নাড়িয়ে দিয়েছিলেন একটি চরম দুর্নীতিগ্রস্ত, পচা ব্যবস্থার ভিত। তাঁদের সেই লড়াইয়ের ওপর ভর করেই তো আজ এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন! অথচ ভাগ্যের কী অদ্ভুত পরিহাস! আজ যখন নবান্নের এসি ঘরে চা-বিস্কুট সহযোগে আলোচনার আসর বসেছে, তখন সেই টেবিলের জরুরি খসড়া থেকে এই প্রতিবাদী, অসহায়, যোগ্য শিক্ষকরাই বেমালুম বাদ পড়ে গেলেন!

যেকোনো তর্কের খাতিরেই হোক বা আলোচনার খাতিরেই হোক, এই পার্থক্যটা আজ আর আমাদের চোখের সামনে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আজ প্রায় ১৯ হাজার যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকার ভবিষ্যৎ একটা ঘন অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। আজ আইনি প্যাঁচ আর প্রশাসনিক গাফিলতির জেরে দোষী আর নির্দোষকে একই পাল্লায় মাপা হচ্ছে। ঢালাও চাকরি বাতিলের খাঁড়া ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁদের ঘাড়ে। ঠিক তখন আমরা আমাদের বেতন বৃদ্ধি নিয়ে ভাবছি! কিন্তু যাদের চাকরি চলে গেল বা চলে যেতে বসেছে, তাদের নিয়ে আমরা কী ভাবলাম?এখানে খুব স্পষ্ট প্রশ্ন—কোন বিষয়টায় আগে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ছিল? যখন টিচার্স রুমের ভেতর দেখি মাইনে বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা, আর অন্যদিকে চাকরি হারানোর আতঙ্কে যারা দিন গুনছেন, সেইসব শিক্ষকদের দিকে তাকালে মাথা নত হয়ে যায়। মনে পড়ে অজিত পাণ্ডের গাওয়া, কবি প্রণব চট্টোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত গানের লাইন—“তুমি যখন হাসছিলে / ভেতরে কেউ কাঁদছিল।” চোর ধরতে গিয়ে ঘরের সৎ ছেলে-মেয়েদের পথের ভিখারি বানানো হলো।

আরও খারাপ লাগে যখন দেখি বহু অশিক্ষক কর্মচারী, যাঁরা কোনোদিন দুর্নীতির ‘দ’-টুকুও ছোঁননি, কোনো অন্যায় করেননি, তাঁরাও আজ স্রেফ নিয়তির ফেরে অপদার্থ পূর্বতন সরকারের জন্য কাজ হারিয়েছেন। চোদ্দ মাস বেতন বন্ধ এই সমস্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। অপরাধীরা শাস্তি পাক, তাতে তো কারও দ্বিমত থাকতে পারে না। কিন্তু চোর ধরতে গিয়ে ঘরের সৎ ছেলে-মেয়েগুলোকে যারা এভাবে পথের ভিখারি বানিয়ে দিল, সেই সরকার তো চলে গেল। আর আমরা ডিএ নিয়ে লাফিয়ে পড়লাম, মিটিংও হলো, আশ্বাসও পেলাম! কিন্তু যোগ্য শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারীদের কী হবে? মাইনে বৃদ্ধির আন্দোলন জরুরি, কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি জরুরি ছিল এই ১৯ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকার মৌলিক ও জীবন-মরণের সমস্যাটা মেটানো।

এর মধ্যে আমরা সকলেই দেখে ফেলেছি, ‘অযোগ্য’ বলে সমাজমাধ্যমে দাগিয়ে দেওয়া যোগ্য সহকর্মীদের মানসিক যন্ত্রণা। সমাজের বাঁকা নজর আর অভাবের সংসার সামলাতে না পেরে কিছুদিন আগেই মারা গেলেন একজন সহ-শিক্ষক। এটা কি স্রেফ একটা স্বাভাবিক মৃত্যু? নাকি এটা একটা ঠাণ্ডা মাথায় প্রাতিষ্ঠানিক খুন? একটা মানুষের চলে যাওয়া মানে শুধু একটা চাকরি চলে যাওয়া নয়, একটা গোটা পরিবারের আলো নিভে যাওয়া।

সুতরাং, নতুন সরকারের প্রথম এজেন্ডা হওয়া উচিত ছিল সমস্ত সরকারি কর্মচারী সংগঠনের সব স্তরের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলোচনায় বসা এবং দ্রুত এই ১৯ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকার সমস্যার সমাধান করা। কিন্তু আমরা কী দেখলাম? আমরা দেখলাম মাইনে বৃদ্ধি অগ্রাধিকার পেল, আর পূর্বতন সরকারের দুর্নীতির ফলে যোগ্য শিক্ষকদের ভবিষ্যৎ ঝুলেই রইল। সরকার বদল হলো কিন্তু উনিশ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জীবন-জীবিকা নিয়ে প্রথমেই যেখানে সরব হওয়ার কথা ছিল কর্মচারী সংগঠনগুলোর, প্রথম মিটিংয়ে তারা সবাই চুপ।

আজ ক্ষমতার নোংরা খেলা আর আমাদের বোবা বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের একটা নিজস্ব চরিত্র তৈরি হয়ে গেছে। সেখানে শুধু রাজা আসে আর যায়, পোশাকের শুধু রং বদলায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের দিন বদলায় না। কবেই দার্শনিকরা বলে গেছেন—রাষ্ট্র যখন নিজের স্বার্থে সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করতে চায়, তখন তাদের মাথায় তুলে রাখে। আর কাজ ফুরিয়ে গেলে ছুঁড়ে ফেলে দেয় ডাস্টবিনে। আজ বাংলার বঞ্চিত হতভাগ্য ১৯০০০ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সাথেও ঠিক এই খেলাই খেলছে আজকের নবগঠিত প্রশাসন।

যখন আন্দোলন দরকার ছিল, তখন শিক্ষকদের কাঁধকে ব্যবহার করা হলো। আর আজ যখন গোলটেবিল বৈঠক হচ্ছে, তখন তাঁদের ব্রাত্য করে রাখা হলো। আরও বেশি খারাপ লাগে তখন, যখন দেখি আমাদের সহকর্মী বা কর্মচারী সংগঠনগুলোও নিজেদের অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে, এই শিক্ষক বন্ধুদের চরম সংকটের কথাটা জোর গলায় তুলতেই ভুলে গেল!

ডিএ আজ না হলেও ছ-মাস পরে পাওয়া যাবে। কিন্তু যে মানুষগুলো প্রতিদিন তিল তিল করে মরছে, যে সহকর্মীরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন, তাঁদের জীবন কোন মহার্ঘ ভাতায় ফিরিয়ে দেবেন আপনারা? নিজের ভাই-বোনের রুটি-রুজি কেড়ে নিয়ে নিজের ভাগের সুবিধা বুঝে নেওয়া কোনো সুস্থ লড়াইয়ের লক্ষণ হতে পারে না। আমরা যদি শুধু নিজেদের বৃত্তটুকুর কথাই ভাবি, তবে শাসকের ‘ভাগ করো আর শাসন করো’ নীতির ফাঁদেই পা দেব।

পরিশেষে বলি, এই লেখাটা শুধু ক্ষোভ উগরে দেওয়ার জন্য নয়। এটা আমাদের ঘুমন্ত বিবেককে একটু ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা। কর্মচারী সংগঠনগুলোর এবার বোঝা উচিত, আমাদের লড়াইটা কিন্তু আলাদা নয়। শিক্ষা ব্যবস্থাটাই যদি লাটে ওঠে, শিক্ষকরাই যদি রাস্তায় বসে চোখের জল ফেলেন, তবে কোনো সরকারি দপ্তরের দেওয়াল বেশিদিন টিকে থাকবে না।

আসন্ন দিনে সরকারের সাথে যত বৈঠকই হোক না কেন, প্রথম এবং প্রধান দাবি হওয়া উচিত—‘যোগ্য শিক্ষকদের চাকরির নিশ্চয়তা দিতে হবে’। এটা কোনো দয়া বা ভিক্ষা নয়, এটা তাঁদের ন্যায্য অধিকার। যে সরকারই গদিতে থাকুক, তাকে মনে রাখতে হবে—ভোটাররা হয়তো ক্ষমতা তৈরি করে, কিন্তু শিক্ষকরাই সেই ক্ষমতার আসল দিশারি। শিক্ষকদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেলে সমাজটাই মুখ থুবড়ে পড়বে। তখন ডিএ-র টাকা দিয়েও কি সেই ভাঙন ঠেকানো যাবে?

অন্যান্য প্রতিবেদন.