মধ্যপ্রদেশের ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যের লীলাভূমি খাজুরহো সাক্ষী হলো এক যুগান্তকারী মুহূর্তের। ভারতের মানচিত্রে জন্ম নিল দেশের প্রথম উচ্চাভিলাষী ‘রিভার লিঙ্কেজ’ বা নদী সংযোগ প্রকল্প। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাত ধরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলো কেন-বেতোয়া লিঙ্ক প্রজেক্টের। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য—উদ্বৃত্ত জলকে নল ও খালের মাধ্যমে প্রবাহিত করে নিয়ে যাওয়া খরাগ্রস্ত বেতোয়া নদীর বুকে। দীর্ঘ ২৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক বিশাল খাল কেটে যুক্ত করা হবে এই দুই নদীকে। দাবি করা হচ্ছে, মধ্যপ্রদেশের দশটি এবং উত্তরপ্রদেশের চারটি জেলার লক্ষ লক্ষ মানুষ এই সংযোগের সুফল ভোগ করবেন। খরায় জর্জরিত বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে ফিরবে শস্যশ্যামলা সুদিন, ঘুচবে দীর্ঘদিনের পানীয় জলের হাহাকার।
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠেই রয়েছে এক দীর্ঘশ্বাস, যা উন্নয়নের কোলাহলে হারিয়ে যেতে বসেছে। এই প্রকল্পের মূল পরিকল্পনার অঙ্গ হিসেবে কেন নদীর ওপর নির্মিত হতে চলেছে ৭৪ মিটার উঁচু ‘দৌধন বাঁধ’। এই বিশাল বাঁধের পেটে তলিয়ে যাবে মধ্যপ্রদেশের ছতরপুর এবং পান্না জেলার ২২টি জনবসতিপূর্ণ গ্রাম। মানচিত্র থেকে মুছে যাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের গড়ে তোলা ঘরবাড়ি, সবুজ প্রান্তর আর স্মৃতির চারণভূমি।এই জলমগ্নতার শিকার হয়ে এখানকার প্রায় ৭২ শতাংশ পরিবার রাতারাতি পরিণত হবেন ভূমিহীনে। পান্না, ছতরপুর ও টিকামগড় জেলার প্রায় কুড়ি হাজারেরও বেশি মানুষ সরাসরি বাস্তুচ্যুত হবেন। এই বিপর্যয়ের আঁচ এসে পড়বে উত্তরপ্রদেশের হামিরপুর ও জালাউন জেলার জনজীবনেও।
বুন্দেলখণ্ডের রুক্ষ মাটিতে যাঁরা ঘাম ঝরিয়ে শস্য ফলান, তাঁদের কাছে জমি কেবল জীবিকা নয়, জমি হলো শেকড়, পরিচয় এবং অস্তিত্বের অন্য নাম। অথচ, উন্নয়নের অঙ্কে সেই শেকড়গুলোকে নির্মমভাবে উপড়ে ফেলাই যেন দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বুন্দেলখণ্ডের মাটি চিরকালই লড়াইয়ের, বুন্দেলখণ্ডের হাওয়া বয়ে বেড়িয়েছে বীরত্বের ইতিহাস। কিন্তু সেই মাটিতেই আজ নেমে এসেছে বিষাদের এক দীর্ঘ ছায়া। কেন নদীর জল যখন বাঁধের বেড়াজালে বন্দি হয়ে নতুন কোনো অভিমুখে ধেয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেবে, তখন সেই জলের ধারায় মিশে থাকবে উদ্বাস্তু মানুষের কান্নার নোনাজল।
যে নদী একসময় কথা বলত তার নিজের ছন্দে, আজ তাকে শৃঙ্খলিত করা হচ্ছে মানুষের প্রয়োজনের ফ্রেমে। প্রগতির রূপকারেরা বলছেন এটি নাকি প্রকৃতির খামখেয়ালিপনাকে জয় করার মহোৎসব। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই জয়ের মূল্য চুকোবে কে? খাজারহোর পাথরে খোদাই করা প্রাচীন ভাস্কর্যগুলো কি তবে আজ বোবা দর্শকের মতো চেয়ে দেখবে তাদেরই কোলঘেঁষে থাকা মানুষগুলোর ভিটেমাটি হারানোর বেদনা?
উন্নয়নের চাকায় পিষ্ট হতে বসা এই মানুষগুলোর কাছে কোনো তাত্ত্বিক সমীকরণ বা জিডিপি-র বৃদ্ধির হার পৌঁছায় না। তাঁদের কাছে শীতের রাতের খোলা আকাশ, বাস্তুভিটে হারানোর আতঙ্ক আর নিজের পৈতৃক ভিটে ছেড়ে অন্য কোথাও অচেনা ঠিকানায় পাড়ি জমানোর যন্ত্রণাটাই একমাত্র সত্য। খাজুরহোতে যে প্রকল্পের সূচনা হলো, তার আলোয় হয়তো ঝলমল করবে দূরে থাকা আধুনিক শহর, কিন্তু যে ঘরগুলো আজ অন্ধকার হয়ে গেল, তাদের সেই গাঢ় অন্ধকারের হিসাব রাখবে কে? উত্তর দেবে সময়, কিন্তু ততক্ষণে অনেকগুলো সবুজ গ্রাম হারিয়ে যাবে জলের গভীরে, আর হারিয়ে যাবে তাদের না বলা অসংখ্য বুন্দেলখণ্ডের গল্প। প্রগতির রূপকারেরা বলছেন এটি নাকি প্রকৃতির খামখেয়ালিপনাকে জয় করার মহোৎসব। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই জয়ের মূল্য চুকোবে কে?

